বিএনপির বৃহত্তর ঐক্য অনিশ্চিত

যুগবার্তা ডেস্কঃ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে বিএনপির বৃহত্তর ঐক্যের ডাক অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ ঐক্যের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না ।বিশেষ করে জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে আলাদা জোট গঠনের প্রস্তুতি শুরু করায় ঐক্যের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে- আশংকা সংশ্লিষ্টদের।
তাদের মতে, স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগে অদ্যাবধি বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসার কারণেই মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার দু’দিনের মাথায় উগ্র ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে এ ঐক্য গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি।
এর অংশ হিসেবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ছাড়া অন্য দলগুলো তেমন সাড়া দেয়নি। বরং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানায় তারা।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী চায়ের দাওয়াত কবুল করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করলেও পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জোট করতে নয়, কিছু দাবি জানাতে গিয়েছিলাম।’ এ অবস্থায় বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও জাতীয় ঐক্য নিয়ে অনেকটাই সন্দিহান।
১ জুলাই গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলার দু’দিন পর ৩ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন।
এ সময় তিনি তার দলের অবস্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি উগ্র ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী জাতীয় (বৃহত্তর) ঐক্য গড়ে তোলার আহবান জানান। খালেদা জিয়া বিষয়টি কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, এজন্য তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য দলের তিন শীর্ষ নেতা এবং দু’জন বুদ্ধিজীবীকে দায়িত্ব দেন।
সূত্র জানায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন নেতা হচ্ছেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। আর দুই বুদ্ধিজীবী হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
খালেদা জিয়া নিজেও ব্যক্তিগতভাবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে এ ইস্যুতে টেলিফোনে কথা বলেন এবং তাকে চায়ের দাওয়াত দেন। এই দাওয়াত কবুল করে ৪ আগস্ট রাতে খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসায় যান তিনি।
এ সময় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করার পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে চারটি শর্ত দেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘আমি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বেহেশতেও যেতে রাজি নই।’
জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনে জন্মদিন পালন না করা, বঙ্গবন্ধুকে গালিগালাজ না করাসহ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যখন আরও বেশকিছু শর্ত তুলে ধরেন, তখন চুপচাপ ছিলেন খালেদা জিয়া। পাশে বসা দলটির সিনিয়র নেতারাও ছিলেন নিশ্চুপ।
সূত্র জানায়, বৃহত্তর ঐক্য গড়ার বড় আশা নিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে প্রথম দফায় বৈঠক করেন খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা। কিন্তু এসব কথাবার্তা শুনে তারা অনেকটাই হতাশ। বৃহত্তর ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
জানা গেছে, গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) একাংশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বিকল্পধারা বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা নিয়ে কথা বলেন বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। কিন্তু কারও কাছ থেকেই ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় হিসাব মেলাতে পারছে না দলটি।
বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ মুহূর্তে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। যে কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বিএনপি।
তবে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের সঙ্গে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের কেউই এ বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রহ দেখাননি। বরং নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে পাশ কাটিয়ে গেছেন তারা।
সিপিবি, বাসদ এবং জেএসডির শীর্ষ নেতারা বিএনপি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগকে ‘ইঁদুর বিড়ালের খেলা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বিএনপিকে সবার আগে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে বলেছেন। তিন দলই বিএনপির সঙ্গে তাদের ঐক্যের কোনো ধরনের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে।
জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বৃহত্তর ঐক্য গড়ার আগে খালেদা জিয়ার উচিত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া। পাশাপাশি তার দলের নেতাকর্মীদের জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনে মাঠে নামানো উচিত। তা না করে ঘরে বসে কেবলমাত্র স্লোগান দিয়ে, ঐক্যের আওয়াজ দিয়ে জঙ্গি দমন করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন আন্তরিক উদ্যোগ। সেই আন্তরিক উদ্যোগ বিএনপির মধ্যে নেই। থাকলে তারা এতদিন ঘরে বসে না থেকে মাঠে নামত।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার নামে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। সিপিবি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কারও সঙ্গেই জোট করবে না। বিএনপি চায়ের দাওয়াতের নাম করে যে ঐক্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে তা সফল হবে না। এ রকম চায়ের দাওয়াত দিয়ে ঐক্য হয় না।
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, বিএনপি একেক সময় একেক ধরনের কথা বলছে। তাদের কথায় তাই আস্থা স্থাপন করা যায় না। তিনি বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক দল ও পেশাজীবীদের নিয়ে পৃথক প্লাটফর্ম করার চিন্তা-ভাবনা করছি। কারণ, আমরা বুঝতে পারছি, মানুষ আর দুই দলকে চায় না। তারা তৃতীয় ও বিকল্প শক্তিকে মাঠে দেখতে চায়।’
আবদুল মালেক রতন আরও বলেন, ‘জামায়াতকে নিয়ে ইঁদুর বেড়ালের খেলায় লিপ্ত হয়েছে বিএনপি। এই খেলায় জেএসডি শরিক হবে না।’
গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, ‘দেশে একটি দুর্যোগ চলছে। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতীয় বা বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। তবে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে কোনো ঐক্যে গণফোরাম নেই।’
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যে কোনো ঐক্য হতে পারে। এ রকম ঐক্যে গণফোরাম থাকবে।
তবে এতসব নেতিবাচক কথাবার্তার মধ্যেও জাতীয় ঐক্য গড়া নিয়ে বেশ আশাবাদী বিএনপিপন্থী শীর্ষ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, উগ্র ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য এখন সময়ের দাবি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই এ উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী, যে যাই বলুক এ উদ্যোগ সফল হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব দুই জোটের বাইরে পৃথক একটি জোট গড়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকেও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। দুই নেতা দেশে ফিরলে তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন আসম আবদুর রব। সিপিবি ও বাসদ দীর্ঘদিন ধরেই বাম বিকল্প শক্তির একটি বলয় সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এর আগে ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে একটি জোটে ছিলেন। ভবিষ্যতেও তাদের সবাইকে আবার একসঙ্গে দেখা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অবস্থায় খালেদা জিয়াকে তার দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের শরিকদের নিয়েই আগামী দিনে পথ চলতে হবে। তবে চাপের মুখে জামায়াতকে ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে। যদিও এ কাজটি বিএনপির জন্য খুব কঠিন বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।