বিএনপির বিকল্প হতে চায় জাতীয় পার্টি

যুগবার্তা ডেস্কঃ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা না-করার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।

বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অবস্থান কী হবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিচিত্র হিসাব-নিকাশ। আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি একক দল হিসেবে নির্বাচন করার কথা এরই মধ্যে বহুবার বলেছে। এসব কথা থেকে এটি পরিষ্কার, আগামী নির্বাচনে বিএনপির পরিবর্তে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হয়ে ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও তেমনটাই চাইছে। জাতীয় পার্টি গতকাল শনিবার ঢাকায় মহাসমাবেশ করে সেই বার্তাই দিয়েছে যেন। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশে দলটির নেতাকর্মী ও জনতার উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। নিকট অতীতে জাতীয় পার্টির এত বড় সমাবেশ আর দেখা যায়নি।
মহাসমাবেশে জাপার কো-চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ বলেছেন, ‘আমরা আর কারো ক্ষমতার সিঁড়ি হব না।

জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতায় যাব এবং জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করব। ’ এর আগে বিদেশি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ বলেছিলেন, সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর দলের সদস্যদের বের করে এনে তিনি জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চান।

সেই লক্ষ্যে এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলোকে নিয়ে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ গঠন করেছেন এইচ এম এরশাদ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে (আওয়ামী লীগের বাইরে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বেশ কিছুদিন ধরে এইচ এম এরশাদ সারা দেশ সফর করছেন। কিছু এলাকায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীর নামও ঘোষণা করেছেন।

জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ গতকাল বলেন, ‘বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে, তাহলে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের বিরোধী দলে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন নাও করতে পারে। ’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল বলেন, “শুধু জাতীয় পার্টি নয়, ‘অনেকেই’ চাচ্ছে জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে। ” অনেকে বলতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বোঝাচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, সরকার চাচ্ছে জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে। জোর করে এটা করা হতে পারে। ’ তবে বাস্তবে তা কতটুকু সম্ভব হবে এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

রাজনৈতিক কূটকৌশলে পড়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমানে মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির এক মামলায় বর্তমানে কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। শিগগিরই তাঁর মুক্তির সম্ভাবনা নেই। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তিনি দেশের বাইরে চলে যান। এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি। একটির পর একটি মামলায় তাঁর সাজা হয়েছে। বর্তমানে সপরিবারে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নেতৃত্ব গভীর সংকটে পড়েছে। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে তেমন কোনো কর্মসূচি আসেনি, যা নিয়ে সরকার চিন্তিত হতে পারত।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, জাতীয় পার্টি যতই চেষ্টা করুক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না। তাদের সেই সাংগঠনিক অবস্থা ও জনভিত্তি নেই। রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পড়ে ৫ জানুয়ারির মতো বিএনপি আবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকলে সেই ক্ষেত্রে এখনকার মতো বিরোধী দলে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে জাতীয় পার্টির। আওয়ামী লীগ সরকারও চাচ্ছে, বিএনপি আবার তাদের পাতানো ফাঁদে পা দিক। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকুক। সে ক্ষেত্রে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় যাওয়া তাদের জন্য নিষ্কণ্টক হবে। আর এই পরিকল্পনা ও কৌশলের অংশ হিসেবেই বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার কারা মুক্তি দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে পারে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার গতকাল বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে তুলনা নয়। আমরা আমাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে জাতীয় পার্টিকে সমৃদ্ধ করব। তার অংশ হিসেবে আজ (গতকাল) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাসমাবেশ করেছে জাতীয় পার্টি। ’ তিনি বলেন, ‘দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার নেওয়ার জন্য দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছি। আমরা একটা নতুন বার্তা নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছি। ’ অভিযোগ উঠেছে, সরকার এই মহাসমাবেশ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে, এর জবাবে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘সরকার আমাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নেয়নি। ’

আগামী নির্বাচন এবং ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। গত ১৬ মার্চ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আগামী নির্বাচনে দলের (আওয়ামী লীগ) জয় নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার উন্নয়নে, অর্জনে জনগণ খুশি। নির্বাচনে বিজয় একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ’ ইট ডিসাইডেড, ডান। তাঁর এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি নির্বাচনে বিএনপি আসছে না? বিরোধী দলের ভূমিকায় কি আবারও এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি থাকছে?

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গতকাল বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ভয় পেয়েছে বলেই জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চাচ্ছে। তারা (সরকার) সর্বোতভাবে চেষ্টা করছে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না আসুক। কিন্তু বিএনপি নির্বাচন করবে এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন সুষ্ঠু হলে দলটি ক্ষমতায় যাবে।

কেন মনে করছেন সরকার জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টিকে মহাসমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বিএনপিকে রাস্তায় দাঁড়াতেই দেওয়া হচ্ছে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল শনিবার বলেন, এক দেশে দুই নিয়ম। সরকার সহযোগিতা, আনুকূল্য ও প্রটেকশন দিয়ে জাতীয় পার্টিকে মহাসমাবেশ করতে দিচ্ছে। আর বিএনপিকে মিটিংয়ের অনুমতিই দিচ্ছে না। তার পরও জাতীয় পার্টি বিএনপির বিকল্প হতে পারবে না। তিনি বলেন, দালাল দালালই, তারা সরকারের অংশীদার।-কালেরকন্ঠ