বালু ব্যবসা ও অবৈধ দখলে ধুঁকছে তুরাগ

যুগবার্তা ডেস্কঃ তুরাগ নদ দখলের মহোত্সব থামছেই না। রাজধানীর মিরপুর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত নদীর দুইপাশ জুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। নদের পাড়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে প্রভাবশালীরা। দখল-ভরাট আর দূষণে তুরাগ নদের প্রস্থ কমছে। এককালের প্রমত্তা তুরাগ কোথাও কোথাও খালে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে নদী রক্ষা করা যাবে না। এ জন্য সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করা না গেলে কালের পরিক্রমায় তুরাগ বিলীন হয়ে যাবে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মিরপুর বেড়িবাঁধের চটবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদের পাড়ে গড়ে উঠেছে নেবারল্যান্ড পার্ক। নদের সীমানা পিলারও পড়েছে ওই পার্কের ভেতরে। এরই পাশ দিয়ে কোনো রকমে বয়ে যাচ্ছে মৃতপ্রায় তুরাগের পানি। এরপাশে একইভাবে গড়ে উঠেছে তামান্না ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড নামের আরেকটি পার্ক। নকশা অনুযায়ী সেটারও পুরোটাই নদের ভেতরে পড়েছে। এর পাশেই রয়েছে রফিকের ভাত-ভর্তা হোটেল। এগুলোও মূল সড়ক থেকে নদের দিকে এগিয়ে করা হয়েছে। এ সব জায়গা আগে জলাশয় ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর এলাকায় বেড়িবাঁধের সিন্নিরটেক থেকে শুরু করে আশুলিয়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে তুরাগের পাড়ে কয়েকশ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দিয়াবাড়ী এলাকায় তুরাগের পাড় ঘেঁষে রাখা হয়েছে বালু। নদীতে ভেড়ানো কার্গো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বালু এনে পাড়ে ফেলা হচ্ছে। সেই বালু এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে ট্রাকে তুলে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, যেসব স্থানে বালু ফেলা হচ্ছে, সেগুলো ছিল নিচু জলাশয়। কিছু স্থানের জমি নদীর। এভাবে বালু ব্যবসার কারণেও নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। দিয়াবাড়ী এলাকার বালু ব্যবসায়ী পিয়ার মিয়া বলেন, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু আমরা কী করব? এ ব্যবসার উপর পরিবার চলে। বিকল্প কোনো উপায় নেই। তার মতো অনেকেই বালুর ব্যবসা করে ক্ষতি করছেন নদীর।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্য বলছে, তুরাগে ১৫২টি সীমানা পিলারের মধ্যে ৯০টিই অবৈধ দখলের কারণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বাপা ও নদী রক্ষা আন্দোলনের করা যৌথ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তুরাগের দখল হওয়া জমির পরিমাণ এক হাজার ৩৯৮ একর। অথচ সরেজমিন তুরাগ তীরে গিয়ে দখলদারদের সঙ্গে আলাপের সময় বেশিরভাগই দাবি করেন, এগুলো তাদের কেনা সম্পত্তি।

ড্যাপ অনুযায়ী প্লাবনভূমি সংরক্ষণের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা অনুসরণ করা হলে তুরাগ তীরে কারো পৈতৃক কিংবা ক্রয়সূত্রে জমি থাকলেও সেখানে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার দু’পাশেই রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমি। পাউবোর জমি ছাড়াও এক সময় তুরাগ তীরে কৃষকদের কিছু জমিজমা ছিল, যেসব জমিতে ধানসহ অন্য ফসলের চাষও হতো। ফসলি ওইসব জমি কিনে নিয়ে এবং কেনা অংশের পাশ থেকে পাউবোর জমি ইজারা নিয়ে বা দখল করে শিল্প-কারখানা ও পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলছেন, একটি কংক্রিট মিক্সপ্ল্যান্ট কোম্পানিকে কিছু জমি লিজ দেওয়া আছে। এ ছাড়া ওই স্থানে কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিও আছে, ওই জমিতে যাতায়াতের অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য কিছু জায়গা লিজ দেওয়া রয়েছে। বাকিরা হয়তো অবৈধভাবে দখল করেছে।

দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা প্রশাসনের আশুলিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মাজহারুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, দখলদারদের তালিকা করে জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে।-ইত্তেফাক