বামপন্থি বলে এখন আর কিছু নেই

সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত : একে একে নিভিছে দেউটি। বামপন্থি আন্দোলন বলে এখন আর কিছু নেই।
যে বামপন্থিরা একদিন দুর্বার গতিতে আন্দোলন করে দক্ষিণপন্থিদের পশ্চিমবঙ্গে ঢোকা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেই আন্দোলনের ফলেই তারা পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর রাজত্ব করেছে। এবার সেই দলটির কী হাল আর পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থি আন্দোলনই বা কোন পথে তা একবার দেখে নেওয়া যাক। যখন দক্ষিণপন্থিরা গোটা দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে, ১৩০ বছরের কংগ্রেস দল এই ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সঙ্গে পেরে উঠছে না, তখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দাবি ছিল কংগ্রেসের সমাজবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকারের পাশে বামপন্থিরা হাতে হাত মিলিয়ে দক্ষিণ পন্থাকে আঘাত করুক। সেই পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন সিপিএমের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত।
জ্যোতিবসু যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পাঞ্জাবের হরকিষেন সিং সুরজিত। এ দুই নেতা মিলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে জোরদার করার জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেছেন। বার বার দল ভেঙেছেন। কখনো মস্কো, কখনো বেইজিংয়ের দিকে তাকিয়ে। ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তি যেভাবে গোটা দেশকে ব্ল্যাকমেইল করে হিন্দুত্ববাদ কায়েম করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তার ভবিষ্যৎ ভেবে অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদরা উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানিতে সোশ্যাসিস্টরা এক হতে না পারায় হিটলারের আবির্ভাব ঘটেছিল। তার পরিণাম যে কী হয়েছিল তা বিশ্ববাসী জানেন। ফ্যাসিবাদ জন্ম নেওয়ার পর থেকেই গোটা বিশ্বে যে অরাজকতা দেখা দিয়েছিল, যার ইতি টেনে দিয়ে গেছেন আটের দশকে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ। বর্তমান বামপন্থি আন্দোলনের হাল নিয়ে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী গৌতম দেব প্রকাশ্যেই বলেছেন, প্রয়োজনে পার্টি আবার ভাঙা হবে কিন্তু প্রকাশ কারাতের খামখেয়ালিপনা মানা হবে না। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যা বলার তো গৌতম দেবই বলে দিয়েছে। কিন্তু অশীতিপর বৃদ্ধ বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু কারাতের খামখেয়ালিতে গা ভাসাবেন এমনটিই স্বাভাবিক। কারণ তিনি বরাবরই জ্যোতিবসুর বিরোধিতায় রাজনীতি করেছেন।
শুধু তাই নয়, বুর্জোয়া কাগজে জ্যোতিবসুর দুর্নীতি নিয়ে একদা খবর খাওয়াতেন এই বিমান বসু। তার ফল এখন তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। এখনো আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএমের সদর দফতরে গেলে দেখা যাবে স্ট্যালিনের ছবি আঁকড়ে ধরে আছেন বিমান বসু। কিন্তু কেন নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারছেন? কর্মীরা সে প্রশ্ন তুলে বিমান বসুকে জেরবার করছেন। আর তিনি বলেছেন, দেখতে হবেৃ বসতে হবেৃ আলোচনা করতে হবে। কমিউনিস্টদের ভুলের তালিকায় একবার চোখ বোলানো যাক। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় সেই পার্টি ভাগ হয়। একদল বলেছিল চীন ভারত আক্রমণ করেনি, ভারতই চীনকে আক্রমণ করেছে। এই মতাদর্শগত বিরোধেই পার্টি দুই ভাগ হয়ে যায়। তখন খবরের কাগজে লেখা হতো বামপন্থি কমিউনিস্ট আর ডানপন্থি কমিউনিস্ট। আবার এ দুই কমিউনিস্ট পার্টিই ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের শরিক হয়। এই ’৬৭ সালেই আবার সিপিএম ভেঙে বেরিয়ে আসে নকশালরা। সেই নকশাল আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শিলিগুড়ির চারু মজুমদার। চারু মজুমদারদের কৃষক আন্দোলন সেদিন গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছিল।
সে সময় শিলিগুড়িতে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা ভিড় করতেন চারু মজুমদারের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। চারু মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন, তৎকালীন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত এবং মন্ত্রী হরেকৃষ্ণ কোঙার আমাদের ডেকে বলেছিলেন, এখন আমরা ক্ষমতায় এসেছি। উত্তরবঙ্গে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলো। সেই আন্দোলন দমন করার জন্য যুক্তফ্রন্ট সরকার বহু লোককে গুলি করে মেরেছে। তখন এই নকশালরা স্লোগান দিয়েছিল— চীনের চেয়ারম্যান আমার চেয়ারম্যান। চারুবাবু ওই সাক্ষাৎকারে আরও বলেছিলেন, আমাদের এই আন্দোলনকে কোন মুখে সিপিএম নেতারা বিরোধিতা করেন। সে সময় চার সদস্যকে চীনে পাঠিয়েছিলেন চারু মজুমদার। তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বলেছিলেন, আপনারা ফিরে যান। আপনাদের কোনো সাহায্য আমরা করতে পারব না। চারুবাবুর সঙ্গে আদর্শগত মতবিরোধের জেরে এরপর নকশাল সংগঠনও ভাঙতে শুরু করে। সারা পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থিরা গৌতম দেবের বক্তব্যকেই সমর্থন করছেন। তারা প্রকাশ্যেই বলছেন জ্যোতিবসুর নামে একটি কমিউনিস্ট পার্টি করে তার নেতৃত্ব দিন গৌতম দেব। ওদিকে প্রকাশ কারাতও তার কেরল সিপিএমকে নিয়ে বেঙ্গল সিপিএম ও ত্রিপুরা সিপিএমের বিরুদ্ধে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি রাজ্যসভা নির্বাচনে সিপিএমের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাঠানোর প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু প্রকাশ কারাত লবি তার নাম নাকচ করে দিয়েছে। ফলে সিপিএমকে ভিন্ন এক প্রার্থীকে (কলকাতার সাবেক মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য) দাঁড় করাতে হয়েছে। আর তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গে এ দলটিকে তখন কংগ্রেসের বিরোধিতা করতে হচ্ছে প্রকাশ্যে। অথচ পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতা ব্যানার্জি এবং দিল্লি থেকে নরেন্দ্র মোদির সরকারকে হটাতে সিপিএম ও কংগ্রেস একযোগে আন্দোলন করছিল। সিপিএমের ভুলের কোনো অন্ত নেই। একটা সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বুর্জোয়া কবি বলে কটাক্ষ করতেন কট্টরপন্থি মার্কসবাদীরা। পরে তীব্র চাপের মুখে পড়ে সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সরকারকে গোপনে খবর দিয়ে সাহায্য করারও অভিযোগ রয়েছে একশ্রেণির কমিউনিস্ট নেতার বিরুদ্ধে। স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা অন্যতম জনপ্রিয় সিপিএম নেতা জ্যোতিবসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি তার নিজের দলই। এর পরের ধাপে আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তথা লোকসভার অধ্যক্ষ সোমনাথ চ্যাটার্জিকে রাষ্ট্রপতি হতে দেয়নি এই সিপিএমই। যদি সোমনাথ বাবুকে সেদিন আটকানো না হতো, তাহলে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আগে আরও একজন বাঙালি রাষ্ট্রপতি পাওয়া যেত। একের পর এক হঠকারিতা করে গিয়েছে প্রকাশ কারাতদের দলটি। ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এই প্রকাশ কারাতই। আর তাতে কংগ্রেসের তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও সিপিএম সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ক্রমে কোণঠাসা হতে শুরু করে। সবচেয়ে হাস্যকর এবং বিচিত্র ব্যাপার হলো, কমিউনিস্ট পার্টির কিছু নেতা এখনো বিশ্বাস করেন যে, বিপ্লবের মাধ্যমেই একদিন সমাজ পরিবর্তন হবে। অথচ সিপিএমের সবচেয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা জ্যোতিবসু প্রায়ই রিপোর্টারদের বলতেন, ওসব বিপ্লব-টিপ্লব হবে না। সংসদীয় গণতন্ত্রই হলো আসল। যা করার সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই করতে হবে। একদা সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক ভি এস নাম্বুদ্রিপাদের স্টেনোগ্রাফারের হাতে পড়ে ভারতের সিপিএমের এমন হাল হয়েছে যে তারা জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গণ-আন্দোলন বলে কিছুই নেই। সব থেকে বড় কথা হলো দলটির কোমর এমনভাবে ভেঙে গেছে যে সাম্প্রদায়িক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতাটাও চলে গেছে।
কিন্তু সেই লড়াই একমাত্র শুরু করতে পারতেন পশ্চিমবঙ্গের কমরেডরাই। সেই কমরেডদের মাজা ভেঙে দিয়েছেন প্রকাশ কারাত। বিভিন্ন গণসংগঠনকে কার্যত তুলেই দিয়েছেন, যারা আন্দোলন শুরু করতে পারত। তাই প্রবীণ বাম নেতারা বলছেন, ‘প্রকাশ তো সিপিএমকে ডোবালই, সেই সঙ্গে আমাদেরও ডোবাল। ওর উদ্দেশ্যটা কী?’ আরএসপি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য ও ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা দেবব্রত বিশ্বাসরা অভিযোগ করেন, বাম-আন্দোলন তুলে দেওয়ার পেছনে প্রকাশ কারাত কোনো বিদেশি শক্তি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন। যে শক্তি কমিউনিস্টবিরোধী, তারাই কলকাঠি নাড়ছে।
জ্যোতিবসু শেষ দিকে এই প্রকাশ কারাতের তীব্র বিরোধিতা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের তিনি বলতেন এই কারাত সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়বে। ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার সময়ও পই পই করে নিষেধ করেছিলেন জ্যোতিবসু। তিনি প্রকাশ কারাত অ্যান্ড কোম্পানিকে বলেছিলেন, ওই বিলের বিরোধিতা করে তোমরা সংসদের ভিতরে ও বাইরে আন্দোলন কর। কিন্তু ইউপিএ সরকারের থেকে সমর্থন তুলো না। সেদিন প্রবীণ নেতার কথায় কান দেননি কারাত। আর তার ফলেই এখন ডুবতে হচ্ছে সিপিএমকে।-লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক।