বাজেট ও জ্বালানির প্রভাবে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

15

দেলোয়ার হুসেন ও মনির হোসেনঃ নতুন অর্থবছরে বাজেট, ভ্যাট ও জ্বালানির প্রভাবে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বছরে বাজেটের আকার বড় করা হয়েছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন করতে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হবে।

বাজেটে ব্যাংক থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণে ঋণের বড় অংশই নিতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। ভ্যাটের ব্যাপক বিস্তারের কারণে বাড়বে পণ্য ও সেবার মূল্য। অর্থবছরের

প্রথমদিন থেকেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাবে গণপরিবহন ভাড়াসহ পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে বাড়বে বিভিন্ন সেবার খরচ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া কিছু ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়ছে। এসব কারণে আমদানির নামে বিদেশ থেকে মূল্যস্ফীতি আমদানি হবে। সব মিলে দেশের ভেতরেও মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। মে পর্যন্ত পয়েন্ট টু পয়েন্ট (গত বছরের মে মাসের তুলনায় চলতি বছরের মে’তে) ভিত্তিতে এ হার রয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশের ওপরে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, যেভাবে বাজেট করা হয়েছে, সেভাবে অন্য অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো হয়নি। অর্থবছরের শুরু থেকে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে অবকাঠামো সমস্যা আরও বাড়ানো হয়েছে। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। আর বিনিয়োগ না হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে না। তখন সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজেটে বিভিন্ন কর আরোপ, মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়বে।

এর মধ্যে একদিকে পণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে, অন্যদিকে খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে না। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যেতে পারে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় ব্যাংক থেকে নতুন বছরে ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

অনেকেই মনে করছেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের যে অবস্থা তাতে সরকারকে ওই পরিমাণে ঋণের জোগান দেয়া কঠিন হবে। ফলে সরকারকে ঋণের জোগান দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থকে বলা হয় হাই পাওয়ার্ড বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ, যা বাজারে এসে দ্বিগুণ টাকার সৃষ্টি করে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যায়। অর্থবছরের শুরু থেকেই এ ঝুঁকিতে পড়েছে অর্থনীতি।

বিদায়ী বছরে রাজস্ব আদায় ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। অর্থবছরের শুরুর দিকে এমনিতেই এ হার কম থাকে। ফলে অর্থবছরের প্রথমদিনেই সরকারকে ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি ঋণ নিতে হয়েছে। দ্বিতীয় দিনে ঋণ নিয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। দুই দিনে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এ ঋণ নিয়ে চলতি ব্যয় নির্বাহ করেছে।

এদিকে বাজেটের আকার বাড়ানোর কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হবে। বিদায়ী অর্থবছরে টাকার প্রবাহ ১২ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এপ্রিল পর্যন্ত টাকার প্রবাহ না বেড়ে বরং কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরে টাকার প্রবাহ সাড়ে ১২ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে ওই হারে টাকার প্রবাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।

বাজেটে ভ্যাটের আওতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ভ্যাট আদায়ের কাঠামো তৈরি হয়নি। এদিকে ভ্যাটের অজুহাতে পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে বাজারে।

ফলে ভোক্তাদের দেয়া ভ্যাটের অর্থ সরকারের কোষাগারে আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এদিকে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে না আসায় উন্নয়ন খাতে অর্থের জোগান কমবে। এতে একদিকে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমবে। ফলে মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়বে।

১ জুলাই থেকে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে শিল্প ও সেবাসহ সব খাতে বাড়তি খরচ করতে হবে ভোক্তাদের। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও পানিকে বলা হয় অর্থনীতির লাইফ লাইন। শিল্প খাতে এগুলোর সমন্বিত প্রভাব পড়ে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ। একই সঙ্গে একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে গ্যাসের দামের প্রভাব সব খাতে পড়বে।

মোট গ্যাসের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, অর্থাৎ ৪১ শতাংশ। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে সরকারকে হয় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো ভর্তুতি দিতে হবে। যেটাই করুক, সেটিই ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াবে। সারে ব্যবহৃত হয় ৭ শতাংশ গ্যাস। ফলে সারের উৎপাদন খরচ বাড়বে। শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয় ১৮ শতাংশ গ্যাস।

ফলে শিল্পপণ্যের দাম বাড়বে। এর বেশির ভাগই ব্যবহার করে বেসরকারি খাত। ফলে তারা পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে পণ্যের দামও বাড়িয়ে দেবে। গণপরিবহনে ব্যবহৃত হয় ১৭ শতাংশ। ফলে এ খাতেও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে।

গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ ও পানির দামেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ঋণের সুদের হারও কমছে না। এসব মিলে বিনিয়োগের মন্দার আভাস মিলছে।

চলতি বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মোট জিডিপির ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে ধরা হয়েছিল ৩৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ওই হারে বিনিয়োগ না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফলে বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। ফলে আয়-ব্যয়ে ঘাটতি দেখা দেবে। এতেও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এসব পণ্য আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি আমদানি করবে। ফলে দেশের মূল্যস্ফীতিকে চাপে ফেলবে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সদ্যবিদায়ী সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বাজেটে একদিকে কর আরোপ করা হয়েছে, অন্যদিকে অর্থবছরের শুরুতেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হল। এতে ব্যবসার খরচ বাড়বে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুদের হার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু সুদের হার তো কমেনি। এর মানে হল, পুঁজির খরচ বেশি। এ ছাড়াও বাংলাদেশে জমির দাম বেশি। এরপর ব্যবস্থাপনা ব্যয়, শ্রমিকের খরচ বেড়েছে। ফলে কীসের ওপর র্ভিত্তি করে শিল্পায়ন হবে, তা বুঝে আসে না।-যুগান্তর