বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় করণীয়

2

ডা. মো. শাহাদাত হোসেন শুভঃ বাংলাদেশ ও ভারত সীমানায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ বনের ষাট ভাগ অংশ বাংলাদেশের। শুধু সুন্দরবনেই বাস করে আমাদের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বন বিভাগের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০০৪ সালে সুন্দরবনে মোট বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি; আর সর্বশেষ ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে আরও কমে হয়েছিল ১০৬টি। অন্যদিকে সুন্দরবনের ভারত অংশের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৬ সালে সেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল ৮১টি, ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮৭টি, আর সর্বশেষ ২০১৯ সালের জরিপ অনুসারে সেখানে বাঘের সংখ্যা ৯৬টি। অর্থাৎ বাঘ বৃদ্ধির হার ভারতের অংশে বেশি যদিও সুন্দরবনে দেশটির অংশ কম। ভারত সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বনের অভ্যন্তরে বসবাসকারীদের বাইরে নিয়ে পুনর্বাসন করেছে। ফলে সেখানে বাঘ আর মানুষের দ্বন্দ্ব প্রায় বন্ধ হয়েছে। এর বাইরে সুন্দরবনের ভারত অংশের যেসব জায়গায় বাঘের বিচরণ বেশি, সেখানে সিসিটিভির মাধ্যমে জনগণের বিচরণ পর্যবেক্ষণ করে তা রোধ করা হচ্ছে। ফলে ভারতে যেমন বাঘ বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বেড়েছে সুন্দরবনের আয়তনও।
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে কিছুদিন আগেও নিয়মিত বন্দুকযুদ্ধ ও অপহরণের ঘটনা ঘটত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তা অনেকটা কমে এলেও এখনও অনেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। এ ছাড়াও কাঠ, মধু, গোলপাতা সংগ্রহ ও মাছ শিকারের জন্য মানুষজন বনে প্রবেশ করছে। ফলে মানুষ ও বাঘের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় বাঘ মারা পড়ছে। এ ছাড়া প্রচুর হরিণ শিকার ও অন্য বন্যপ্রাণী হত্যার কারণে বাঘের খাদ্যাভাব দেখা দিচ্ছে। ফলে অনেক সময় সুন্দরবনের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে প্রবেশ করে গৃহপালিত পশুর ওপর হামলা করছে বাঘ। এভাবে গ্রামে আসায় গত ২০ বছরে প্রায় ৩৮টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের ইনব্রিডিং হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার এবং মরণ জিন প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। এর ফলে শাবক মৃত্যুহার বাড়বে। বাঘ রি-ইনট্রোডাকশন করে বাঘের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি করা যায়, তেমনি জিনগত বৈচিত্র্যও আনয়ন সম্ভব হয়। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সাফারি ও চিড়িয়াখানাগুলোর মধ্যে বাঘ বিনিময়। এতে প্রজননের মাধ্যমে বিভিন্ন চিড়িয়াখানা-সাফারিতে বাঘের জিনগত বৈচিত্র্য আসবে। সেখান থেকে বাছাই করা ছয় মাস বয়সী কিছু বাঘ শাবক দিয়ে রি-ইনট্রডাকশন প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। এরপর সুন্দরবনের আশপাশে বাঘের ব্রিডিং সেন্টারও তৈরি করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ওই বাঘ শাবকগুলোকে সুন্দরবনের উপযোগী হিসেবে তৈরি করবেন। ওই শাবকগুলো বড় হয়ে প্রজননের মাধ্যমে যে বাচ্চা দেবে সেগুলোকে পরে বনে ছাড়া হবে। এর মাধ্যমে পাঁচ বছরে অনেক বাঘ সুন্দরবনে ছাড়া সম্ভব।
বাঘ রক্ষায় আমাদের আর যা করণীয় :প্রথমেই সুন্দরবনে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে এবং সুন্দরবন রক্ষায় আলাদা বাহিনী গঠন করতে হবে। এতে দস্যুতা ও পাচারকারীর সংখ্যা কমবে। সুন্দরবনের অভ্যন্তর ও আশপাশের লোকজনকে সরিয়ে পুনর্বাসন করতে হবে। এতে মানুষ ও বাঘের সংঘর্ষ কমে আসবে। বনের ওপর নির্ভরশীল জনগণের জন্য সহজ ঋণের ব্যবস্থা করে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে। সুন্দরবনের যেসব জায়গা অপরাধপ্রবণ, সেসব জায়গায় সিসিটিভি বসিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাঘের পর্যাপ্ত খাদ্যের জন্য বনের আশপাশে হরিণ ও শূকরের খামার তৈরি করে রি-ইনট্রডাকশনের মাধ্যমে বনে ছাড়লে বাঘের খাবারের সংকট কমে যাবে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল অংশ টিকে আছে সুন্দরবনের জন্য। আর সুন্দরবন টিকে আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য। বাঘ বিলুপ্ত হলে বাস্তুসংস্থান নষ্ট হয়ে বন উজাড় হয়ে যাবে। এতে অতিরিক্ত জোয়ার-ভাটার প্রভাবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। যাতে ফসল উৎপাদন কমে যাবে এবং এই অঞ্চলের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে।-লেখকঃ ডেপুটি কিউরেটর, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা (সূত্র : সমকাল)