বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র বনাম গণতন্ত্রের রাজনীতি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : সম্প্রতি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘বাংলাদেশ যাতে স্বাধীন থাকতে না পারে সে জন্য সব সময় বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। এ ষড়যন্ত্র সব সময় চলেছে। সব সময় আমাদের একটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ আইনমন্ত্রী একটি পুরনো সত্যকে আবার নতুন করে বললেন। প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু কনস্পিরেসি থিওরির কথা আওড়ালে চলবে না; গণতান্ত্রিক রাজনীতির শাণিত অস্ত্র দ্বারা কিভাবে এ ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে চিরদিনের জন্য কবর দেওয়া যায় তার কোনো নির্দিষ্ট পন্থার কথা তিনি বলতে পারেননি। কেবল উপস্থিত আইন কর্মকর্তাদের একটা ছেলেমিপূর্ণ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই বলে যে ‘বাংলাদেশ যদি স্বাধীন দেশ না থাকে, তাহলে আপনারাও সরকারের আইন কর্মকর্তা থাকতে পারবেন না। সুতরাং সেই ষড়যন্ত্র আপনাদের নস্যাৎ করতে হবে।’ এ বক্তব্যটি আইনমন্ত্রীর প্রাজ্ঞতার পরিচয় বহন করে না।
বাংলাদেশে শুধু আজ নয়, সেই ইংরেজ আমল থেকে বাঙালির স্বার্থ, অধিকার, ভাষা-সাহিত্য সব কিছুর বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি কায়েমি স্বার্থের ষড়যন্ত্র চলেছে। আজ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। অতীতে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ বাঙালি নেতা—যাঁরাই বাঙালির স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য অবস্থান গ্রহণ করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে একটার পর একটা ষড়যন্ত্র হয়েছে। ক্ষমতা থেকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁদের উচ্ছেদ অথবা তাঁদের প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে।
চল্লিশের দশকের গোড়ায় (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে) অবিভক্ত বাংলা যখন জাপানের দ্বারা আক্রান্ত তখন বাংলাদেশকে রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ভাইসরয়ের ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া কমিটিতে যোগ দেন। মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ এই অজুহাতে হক সাহেবকে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করেন। কন্তিু হক সাহেবকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য করতে পারেননি। ফজলুল হক প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি নামে নতুন দল গঠনপূর্বক বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে যান।
নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ফজলুল হককে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করতে না পেরে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চাতুর্যের (ষড়যন্ত্রের) আশ্রয় নেন। কংগ্রেস যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতা দেবে না বলে ঘোষণা করায় জিন্নাহ পরিস্থিতির সুযোগ নেন। তিনি যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতাদানের আশ্বাস দিয়ে শর্ত হিসেবে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ফজলুল হকের অপসারণ দাবি করেন। আইন পরিষদে হক সাহেবকে অনাস্থা ভোটে পরাজিত করা সম্ভব না হওয়ায় মুসলিম লীগকে খুশি করার জন্য বাংলার তৎকালীন গভর্নর স্যার জন হার্বার্ট বে আইনিভাবে হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন এবং পরিষদে সংখ্যালঘু সদস্যদের নেতা খাজা নাজিমুদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসান।
জিন্নাহর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এবং ইংরেজ লাট বাহাদুরের তাতে সর্বপ্রকার সহযোগিতা সত্ত্বেও নাজিমুদ্দীনকে বেশি দিন বাংলার প্রধানমন্ত্রী পদে রাখা হয়নি। তিনি পরিষদে স্নাপ ভোটে (ঝহধঢ় ঠড়ঃরহম) পরাজিত হন এবং ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু যে কদিন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন সে কদিন জাপানের আক্রমণের মুখে বাংলাদেশে সব খাদ্য গুদামে লুকিয়ে ফেলার সর্বনাশা ব্রিটিশ নীতিতে কোনো বাধা প্রদান করেননি। ফলে তাঁর সরকারের আমলে ব্রিটিশ রাজসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে অবিভক্ত বাংলাদেশে ৫০ লাখ নর-নারী কর“ণ মৃত্যুবরণ করে। এ সময় হক মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় থাকলে খাদ্যাভাব ও অনাহার দ্বারা ৫০ লাখ বাঙালি হত্যা ব্রিটিশ রাজের পক্ষে সম্ভব হতো না। ক্ষমতায় থাকার শেষ দিকে হক সাহেব ব্রিটিশ রাজের ফুড পলিসিকে প্রকাশ্যে বাধাদানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ দলেরই শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতাদানের জন্য ভারত ভাগের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশকেও বিভক্ত করার কথা ওঠে। অবাঙালি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ তৎকালীন বাঙালি নেতা ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম প্রমুখকে কোনো প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ না করেই বাংলাদেশের অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম বিভাগ মেনে নিয়ে একটি খন্ডিত পূর্ব পাকিস্তান গঠনের ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ ও অধিকারবিরোধী এই ব্যবস্থা মানতে চাননি আবুল হাশিম, সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বসু প্রমুখ নেতা।
ফলে মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতা (জিন্নাহ-লিয়াকত আলী কোটারি) শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর রুষ্ট হন। শহীদ সাহেবেরই নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার চেষ্টা করবেন, এটা ছিল জানা কথা। মূলত এই ভয় থেকেই তাঁকে মুসলিম লীগের প্রাদেশিক পার্লামেন্টারি পার্টির নেতার পদ থেকে অপসারণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। রাতের অন্ধকারে ষড়যন্ত্রের খেলা চলে। নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের একটি জেলা থেকেই ছয়জনের মতো মন্ত্রী প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় গ্রহণের প্রলোভন দেখিয়ে ওই জেলার সব পরিষদ সদস্যের ভোট নাজিমুদ্দীনের পক্ষে আনা হয় এবং তাঁকে নেতা নির্বাচিত করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রদেশের একটি মাত্র জেলা থেকে ছয়জন মন্ত্রী গ্রহণে রাজি হননি। তাতে তিনি নেতা নির্বাচনে হেরে যেতে পারেন জেনেও রাজি হননি। ফলে জিন্নাহ-লিয়াকত আলী কোটারির ষড়যন্ত্র সফল হয়।
বাংলাদেশ অবিভক্ত থাকার সময় থেকেই মুসলিম লীগ-রাজনীতি অধিকাংশ সময় ছিল ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা তাঁরা কখনো করেননি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আবরণে তাঁরা পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক একনায়কত্বমূলক শাসন প্রবর্তন করেছিলেন এবং বাঙালিসহ প্রতিটি জাতিসত্তার অধিকার ও অস্তিত্ব হরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে দেননি। শহীদ সাহেব কলকাতায় থাকতে বাধ্য হন। এই সময় উত্তপ্ত সাম্প্রদায়িক পরিস্থিখতির সুযোগ নিয়ে তাঁর জীবননাশেরও চেষ্টা করা হয়। তখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি সোহরাওয়ার্দীর জীবন রক্ষার উদ্যোগ নেন।
১৯৫৪ সালে ফজলুল হক প্রাদেশিক নির্বাচনে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেন এবং যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার তাঁকে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে সরাতে না পেরে ষড়যন্ত্রপূর্বক আদমজী পাটকল ও চন্দ্রঘোনা কাগজের কলে বাঙালি-বিহারি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধায় এবং তাতে উভয় সম্প্রদায়ের কয়েক শ মানুষ নির্মম মৃত্যুবরণ করে। নিজেদের সৃষ্ট এবং দাঙ্গাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করা হয় এবং বৃদ্ধ জননেতাকে গৃহবন্দি করা হয়। মওলানা ভাসানী এই সময় বিদেশে থাকায় গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন। তখনকার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) ইসকান্দার মির্জা হুমকি দেন, ‘ভাসানী দেশে ফিরলে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হবে।’
গোটা পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ রাজনীতিই ছিল ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। মুসলিম লীগ পাকিস্তানে কখনো গণতন্ত্রের চর্চা করেছে এই অপবাদ তাদের কেউ দিতে পারবে না। জিন্নাহ থেকে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রত্যেক অবাঙালি শাসক বাংলাদেশকে তাঁদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কলোনি হিসেবে ট্রিট করেছেন এবং বাঙালির স্বার্থ ও অধিকার কঠোর দমননীতি দ্বারা নস্যাৎ করতে চেয়েছেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ এই আট বছরে মুসলিম লীগ দলীয় শাসনে পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারের বিনা বিচারে আটক রাজবন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪২ হাজার।
মুসলিম লীগের এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধেই সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্ব ও স্বাধিকার রক্ষার আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাঁর এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ ও সামরিক সরকারগুলো চেয়েছে নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দ্বারা প্রতিহত করতে। না পেরে তাঁর প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র হয়েছে। এটা এখন ওপেনসিক্রেট ক্যান্টনমেন্টে শেখ মুজিবকে হত্যা করতে গিয়েই ভ্রমক্রমে সার্জেন্ট জহুর“ল হককে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে জুডিশিয়াল মার্ডারেরও ষড়যন্ত্র করেছিলেন পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকরা। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রেও তাঁরা শরিক হন।
পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার পর স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম লীগ-ষড়যন্ত্রের রাজনীতিরই উত্তরাধিকার গ্রহণ করে বিএনপি। অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক শাসনেরও উত্তরাধিকার ছিল তাদের। কারণ বিএনপির জন্ম সামরিক ছাউনিতে এবং একজন সামরিক নেতার ক্ষমতা দখলের উ”চাভিলাষ পূর্ণ করার জন্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের উত্তরাধিকার বর্তেছে শেখ হাসিনার ওপর। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে শুধু বড় বড় ষড়যন্ত্রই হচ্ছে না, তাঁর প্রাণনাশেরও একটার পর একটা চেষ্টা চলেছে।
এই চেষ্টা বা চক্রান্তের বিরতি এখনো হয়নি। বরং বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এখন একই খাতে বইছে এবং তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের যোগসূত্র ঘটেছে। বাংলাদেশের আগের যেকোনো প্রধান নেতার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে, সেই ষড়যন্ত্রের চেয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চক্রান্ত অনেক বেশি ব্যাপক ও ভয়াবহ। এ কথা এখন শেখ হাসিনার সমালোচকরাও স্বীকার করেন, এই মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ষড়যন্ত্র সফল হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র বিপন্ন হবে।
এদিক থেকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক চট্টগ্রামে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের সভায় একটি সঠিক কথাই বলেছেন, বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখন যুগপৎ ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতি দ্বারা এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি কিভাবে ব্যর্থ করা যাবে, সেই পন্থাটির কথা তিনি বলেননি। আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীদের উচিত এই পন্থাটির কথা চিন্তাভাবনা করা এবং জনসাধারণকে জানানো। কেবল ষড়যন্ত্র হচ্ছে, ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলা হলে তা আপ্তবাক্যের মতো শোনায়। রূপকথার রাখাল বালকও তো বাঘ আসছে, বাঘ আসছে বলে অসার চিৎকার জুড়েছিল। তাতে বাঘ আসা কি বন্ধ হয়েছিল? কালেরকণ্ঠ