বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ জয় নিশ্চিত করলো জিম্বাবুয়ে

ডেস্ক রিপোর্ট: পারলোনা বাংরার টাইগার বাহিনী। এক ম্যাচ হাতে রেখেই বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জয় নিশ্চিত করলো স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে।
আজ হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ে ৫ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশকে। রাজা অপরাজিত ১১৭ ও চাকাবভা ১০২ রান করেন। সিরিজ জয়ের সাথে ২-০ ব্যবধানে এগিয়েও গেল স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে। প্রথম ম্যাচেও ৫ উইকেটে জিতেছিলো জিম্বাবুয়ে। ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ নিলো জিম্বাবুয়ে। ঐবার ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছিলো জিম্বাবুয়ে। আর ২০২১ সালের মে থেকে টানা পাঁচটি সিরিজ জয়ের পর অবেশেষে হার বরণ করলো তামিমের দল।
প্রথম ম্যাচে হেরে যাওয়ায় সিরিজ বাঁচানোর সমীকরণ এসে পড়ে বাংলাদেশের সামনে। বাঁচা-মরার লড়াইয়ে একাদশ থেকে তিনটি পরিবর্তন আনে টাইগাররা। এরমধ্যে বাধ্য হয়ে দু’টি পরিবর্তন। ইনজুরির কারনে ছিটকে পড়া লিটন দাস-মুস্তাফিজুর রহমানের জায়গায় নাজমুল হোসেন শান্ত ও হাসান মাহমুদ। আর আগের ম্যাচে একজন বাঁ-হাতি স্পিনারের অভাব টের পাওযায় মোসাদ্দেক হোসেনের জায়গা একাদশে সুযোগ হয় তাইজুল ইসলামের।
হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে এ ম্যাচেও টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। আনামুল হককে নিয়ে ইনিংস শুরু করেন অধিনায়ক তামিম ইকবাল। আগের ম্যাচে দেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে ৮ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করা তামিম ইনিংসের প্রথম ওভারেই ২টি বাউন্ডারি আদায় করে নেন। পঞ্চম ওভারে ২টি চার ও ১টি ছক্কায় ১৪ রান নেন তামিম। বোলার ছিলেন অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা জিম্বাবুয়ের পেসার ব্রাড ইভান্স। মারমুখী ব্যাটিংয়ের সুবাদে ১০ম ওভারেই হাফ সেঞ্চুরির স্বাদ নেন তামিম। ১০টি বাউন্ডারিতে ৪৩ বলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫৫তম অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। তবে ১১তম ওভারে তামিমকে বিদায় করেন জিম্বাবুয়ের পেসার তানাকা চিভাঙ্গা। পুল শট খেলে মিস টাইমিংয়ে স্কয়ার লেগে কাইটানোকে ক্যাচ দেন তামিম। ১০টি চার ও ১টি ছক্কায় ৪৫ বলে ৫০ রান করেন টাইগার অধিনায়ক। তামিম ফেরার ৮ বল পওে রান আউটের ফাঁদে পড়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন সাবধানে খেলতে থাকা আনামুল। ৩টি চারে ২৫ বলে ২০ রান করেন তিনি। ফলে ৭১ রানে উদ্বোধনী ভাঙ্গার পর ৭৭ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
তৃতীয় উইকেটে শান্তকে নিয়ে বাংলাদেশের রানের চাকা সচল রাখেন মুশফিকুর রহিম। বড় জুটি গড়ার চেষ্টা করেছিলেন তারা। তবে জুটিতে হাফ সেঞ্চুরি হবার পর বিচ্ছিন্ন শান্ত ও মুশফিক। স্লগ সুইপ করতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ দেন মুশফিক। ১টি চারে ৩১ বল খেলে ২৫ রান করেন মুশফিক। মুশফিক ফিরলে রানের গতি কমে বাংলাদেশের। তারপরও মাহমুদুল্লাহকে নিয়ে জুটি গড়ার চেষ্টায় ছিলেন উইকেটে সেট থাকা শান্ত। উইকেটে সেট থাকলেও সাবলীল ছিলেন না একবার জীবন পাওয়া শান্ত। ৩০তম ওভারে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ব্যক্তিগত ৩৮ রান থামেন তিনি। তার ৫৫ বলের ইনিংসে ৫টি চার ছিলো। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১২তম ম্যাচে এসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস খেললেন শান্ত। চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে দলীয় ১৪৮ রানে শান্তর বিদায়ে ক্রিজে মাহমুুদুল্লাহ সঙ্গী হন আফিফ হোসেন। তখনও ইনিংসের ১২৩ বল বাকী ছিলো। তাই ঐ মুর্হূতে বড় জুটির খুব প্রয়োজন ছিলো বাংলাদেশের। জুটি গড়তে রানের গতি বাড়িয়েছেন আফিফ। পরপর দুই ওভারে চারটি চার মারেন আফিফ। তবে মাহমুদুল্লাহ ছিলেন সাবধানী। ৪০ ওভার শেষে ২০৬ রান বাংলাদেশের স্কোর বোর্ডে। পরের ৩ ওভারে ২৩ রান পায় বাংলাদেশ। তাতে বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে টাইগাররা। কিন্তু ৪৪তম ওভারের প্রথম বলে জিম্বাবুয়ের রাজার বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে শর্ট থার্ড ম্যানে ক্যাচ দিয়ে নিজের উইকেট বিলিয়ে দেন দারুন খেলতে থাকা আফিফ। ৪টি চারে ৪১ বলে ৪১ রান করেন আফিফ। মাহমুদুল্লাহ-আফিফ জুটি ৮২ বলে ৮১ রান তুলেন। আফিফ যখন ফিরেন, তখন দলের রান ২২৯। ইনিংসে বল বাকি ছিলো ৪১টি। এ অবস্থায় থেকে বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহ এনে দেয়ার দায়িত্ব ছিলো মাহমুদুল্লাহর। নিজের দায়িত্বটা ভালোভাবেই পালন করেছেন তিনি। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত ব্যাট করেছেন। পরের চার ব্যাটারকে নিয়ে ছোট-ছোট জুটি গড়ে বাংলাদেশের স্কোর ২৯০ রানে নিয়ে যান মাহমুদুল্লাহ। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২৬তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে ৮০ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ৮৪ বল খেলে সমান ৩টি করে চার-ছক্কা মারেন মাহমুদুল্লাহ। ইনিংসের শেষ চার ওভারে ৩টি ছক্কা মারেন মাহমুদুল্লাহ।
বল হাতে রাজা ৩টি ও মাধভেরে ২টি উইকেট নেন।
সিরিজ জয় নিশ্চিত করতে ২৯০ রানের টার্গেট পায় জিম্বাবুয়ে। আগের ম্যাচে ৩০৪ রানের টার্গেট স্পর্শ করেছিলো স্বাগতিকরা। ঐ ম্যাচের মত এবারও শুরুতেই বিপদে পড়ে জিম্বাবুয়ে। পেসার হাসান ও দুই স্পিনার মিরাজ-তাইজুলের বোলিং তোপে ৪৯ রানে ৪ ব্যাটারকে হারায় তারা। এরমধ্যে তাকুদজওয়ানাশে কাইতানোকে শুন্য ও আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান ইনোসেন্ট কাইয়াকে ৭ রানে শিকার করেন ডান-হাতি পেসার হাসান। ওপেনার তদিওয়ানাশে মারুমানিকে ২৫ রানে তাইজুল ও ওয়েসলি মাধভেরেকে ২ রানে থামান মিরাজ।
৪৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে চলে যায় জিম্বাবুয়ে। আগের ম্যাচে ৬২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতেছিলো তারা। এবারও ঘুড়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিলো জিম্বাবুয়ের। কারন ক্রিজে ছিলেন রাজা। ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন তিনি। বাংলাদেশকে হারানো টি-টোয়েন্টি সিরিজে সেরা খেলোয়াড়ের হবার পর প্রথম ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেন রাজা। অধিনায়ক রেগিস চাকাবভাকে নিয়ে লড়াই শুরু করেন রাজা। দেখেশুনেই পথচলা শুরু করেন তারা। ২৫তম ওভারে ১শতে পৌঁছায় জিম্বাবুয়ের স্কোর। দলের স্কোর ১শতে যাবারই পরই ফিরতে পারতেন রাজা। মিরাজের ভুলে রান আউটের হাত থেকে বাঁচেন রাজা। তখন তার রান ছিলো ৪২ রানে। ২৮তম ওভারে মিরাজকে ছক্কা মেরে ৬৭ বলে হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন রাজা। তাসকিনের করা ৩০ম ওভারে ৪টি চারে ১৮ রান নেন চাকাবভা। ঐ ওভারেই ৩৬ বলে হাফ-সেঞ্চুরি করেন তিনি। বাংলাদেশ বোলারদের দাপটের সাথে সামলে ৩৮তম ওভারে জিম্বাবুয়ের রান ২শতে নিয়ে যান রাজা ও চাকাবভা। শেষ ১০ ওভারে ৭১ রান দরকার পড়ে জিম্বাবুয়ের। ৪২তম ওভার শেষে নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছে যান রাজা ও চাকাবভা। পরের ওভারটি হয় রাজা ও চাকাবভার জন্য বড় আনন্দের। হাসানের করা ৪৩তম ওভারের প্রথম বলে ২ রান করে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের পঞ্চম ও টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন রাজা। আর ঐ ওভারের চতুর্থ বলে মিড উইকেট দিয়ে ছক্কা মেরে ৫৫ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান চাকাবভা। রাজা ১১৫ বলে ও চাকাবভা ৭২ বলে সেঞ্চুরির পান। সেঞ্চুরি করার পরপরই প্যাভিলিয়নে ফিরেন চাকাবভা। মিরাজের বলে তামিমকে ক্যাচ দেন তিনি। ৭৫ বলে ১০টি চার ও ২টি ছক্কায় ১০২ রান করেন চাকাবভা। চাকাবভার আউটে ভাঙ্গে জুটি। ১৬৯ বলে ২০১ রান যোগ করেন রাজা ও চাকাবভা। ফলে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসে পঞ্চম উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটির নয়া রেকর্ড গড়েন রাজা ও চাকাবভা। আর যেকোন উইকেটে তৃতীয় সর্বোচ্চ জুটির রান জিম্বাবুয়ের।
চাকাবভা যখন ফিরেন তখন জয় থেকে ৪১ রান দূরে জিম্বাবুয়ে। বল ছিলো ৪১টি। অধিনায়ক ফেরার পর ১৭ বল কোন বাউন্ডারি বা ওভার বাউন্ডারি পায়নি জিম্বাবুয়ে। তবে এক-দুই-তিন করে রান ঠিকই ছিলো তাদের। শেষ ৪ ওভারে জয়ের জন্য সমীকরন দাঁড়ায় ২৫ রান। ৪৭তম ওভারে জিম্বাবুয়ের পথটা পানির মত সহজ করে ফেলেন অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা টনি মুনওঙ্গা। শরিফুলের করা ঐ ওভার থেকে ১৯ রান নেন মুনওঙ্গা। তাতে ২টি ছয় ও ১টি চার ছিলো। তাই জয়ের জন্য শেষ ৩ ওভারে ৬ রান দরকার পড়ে জিম্বাবুয়ের। ৪৮তম ওভারের প্রথম দুই বলে ২ রান। আর তৃতীয় ওভারে চার মেরে জিম্বাবুয়েকে ম্যাচ ও সিরিজ জয়ের স্বাদ দেন মুনওঙ্গা। ১৬ বলে ২টি করে চার-ছক্কায় অপরাজিত ৩০ রান করেন মুনওঙ্গা। অন্য প্রান্তে ১২৭ বলে অপরাজিত ১১৭ রান করেন রাজা। তার ইনিংসে ৮টি চার ও ৪টি ছক্কা ছিলো। বাংলাদেশের হাসান-মিরাজ ২টি করে উইকেট নেন। ম্যাচ সেরা হন রাজা।
আগামী ১০ আগস্ট সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে।