বাঁশের খুঁটিতে ২০ হাজার বিদ্যুৎ সংযোগ

যুগবার্তা ডেস্ক: আশপাশে বিদ্যুৎ নেই। অথচ বিদ্যুৎ লাগবেই। তাই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাঁশের খুঁটি পুঁতে বহুদূর থেকে বিদ্যুতের সংযোগ টেনে নেওয়া হয়েছে। একটি-দুটিতে নয়, আবাসিক ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এভাবে নেওয়া হয়েছে হাজারবিশেক বিদ্যুৎ সংযোগ। এ দৃশ্য খোদ রাজধানীর খিলগাঁও থানার নাসিরাবাদ এলাকার। যে দৃশ্য দেখলে পিলে চমকে ওঠে।
রাজধানীর রামপুরা থেকে বনশ্রী আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে চলে গেছে রামপুরা-ডেমরা সংযোগ সড়ক। রামপুরা থেকে এ সড়ক ধরে এগোলে বনশ্রীর শেষ প্রান্তে শুরু হয়েছে খিলগাঁওয়ের নাসিরাবাদ ইউনিয়ন। সেখান থেকেই শুর“ বাঁশের খুঁটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার এ মহোৎসব। রাস্তার দু’পাশ, ফাঁকা মাঠ, বাসাবাড়ির আশপাশে অসংখ্য বাঁশের খুঁটি আর তারের ছড়াছড়ি। কোনোটি মোটা, কোনোটি চিকন বাঁশ। তাতে পেঁচানো তারের সমারোহ দেখে যে কারও হকচকিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, এভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু লোকজনের প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে সেটা রোধ করা যায়নি। অনেকে গায়ের জোরেও বিদ্যুৎ নিয়ে নেন। শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যেভাবে সংযোগ নেওয়া শুরু :স্থানীয় বাসিন্দা ও রামপুরা স্টাফ কোয়ার্টার

লিংক রোডের মেসার্স মুবিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সারোয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, বছর পাঁচেক আগেও এখানে কাঁচামাটির পথ ছিল। বছর দুয়েক হলো রামপুরা থেকে ডেমরা পর্যন্ত পাকা সড়ক হয়েছে। সে সঙ্গে দু’পাশে শুরু হয় নির্মাণ উৎসব। একের পর এক গড়ে উঠতে থাকে নতুন নতুন ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি অবকাঠামো। দ্রুত দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎ আনার ব্যবস্থা না থাকায় মালিক ও উদ্যোক্তারা বাঁশের খুঁটি পুঁতে ত্রিমোহনী থেকে তার টেনে বিদ্যুৎ নিয়ে আসতে থাকেন। সারোয়ার হোসেন জানান, তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ এনেছেন নামা এলাকা থেকে। বিদ্যুতের সংযোগের জন্য জমা দিয়েছিলেন চার হাজার টাকার মতো। এর বাইরেও খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। অতিরিক্ত এই অর্থ গুনতে হয়েছে বিদ্যুতের তার, বাঁশ ও ঘুষ বাবদ। তার বাঁশ লেগেছে ৫০টি। প্রতিটি বাঁশ কিনেছেন ২০০ টাকা দরে।
বাঁশের ব্যবসা জমজমাট :নাসিরাবাদের রাস্তার পাশ দিয়ে গড়ে উঠেছে অনেক বাঁশের দোকান। স্থানীয় বাসিন্দা পল্লব জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো সড়কে গভীর অন্ধকার নেমে আসে। পথে সাধারণ মানুষের চলাচল অসাধ্য হয়ে পড়ে। আর রাত ৯টার পর এ সড়কে শুর“ হয় দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাকের দৌরাত্ম্য। তিনি জানান, এখানে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য অনেক দেনদরবার করেছেন তারা। অবশেষে বিদ্যুৎ বিভাগ ১০টি খুঁটি বরাদ্দ দিয়েছে। সেগুলো এখনও পৌঁছায়নি। কাজেই বাঁশই ভরসা। ফলে এ এলাকায় বাঁশের ব্যবসাও জমে উঠেছে। তিনি জানান, এ এলাকায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে অন্তত ২০ হাজার বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া হয়েছে।
বাঁশ বিক্রেতা ও বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের বাসিন্দা মিন্নত আলী বলেন, অনেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্যই বাঁশ নেয়। আবার নতুন ঘরবাড়ি তুলতে, বাড়ির ছাদ দেওয়ার সময়েও বাঁশ লাগে। কেবল বিদ্যুতের খুঁটির চিন্তা করে তিনি বাঁশের ব্যবসা শুরু করেননি।
স্থানীয়রা জানান, দূর থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ায় প্রয়োজনীয় ভোল্টেজ পাওয়া যায় না। প্রায় প্রতিদিনই নষ্ট হয় তাদের টিভি, ফ্রিজসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি।
ওই এলাকার মাদ্রাসা রোডের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, তিনি নতুন বাড়ি করছেন। তারও বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই অর্থের বেশির ভাগ গেছে বাঁশের পেছনে। ওই এলাকা দিয়ে বিদ্যুতের ৩৩০০ কিলোভোল্টের প্রধান সঞ্চালন লাইন গেলেও স্থানীয় মানুষজন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। তিনি জানান, এ কারণে কেউ কেউ অবৈধ সংযোগও নিয়েছেন।
জনপ্রতিনিধির ভাষ্য :নাসিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকবর হোসেন সমকালকে বলেন, এ এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি বসানোর জন্য এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা-তদবির করছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের এক শ্রেণীর কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা-পয়সাও দেওয়া হয়েছে। তার পরও কাজ হচ্ছে না। তিনি জানান, এ এলাকায় অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অথচ গ্যাস নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, ড্রেন নেই। সরকারের এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য :ওই এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালনকারী ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, ওই রাস্তা হওয়ার পর পুরো এলাকা নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে। এনজেলিক নামের একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান জরিপ করে গেছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হবে। তখন প্রধান সংযোগ সড়ক ছাড়াও দু’পাশের সব গলি-উপগলিতেও বিদ্যুতের খুঁটি বসবে। পাঁচটি ট্রান্সফরমার বসানো হবে। তখন আর কাউকে বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করে বিদ্যুত সংযোগ নেওয়ার দরকার হবে না। সমকাল