বন্যা মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি সমাজকেও সক্রিয় হতে হবে

ড. আতিউর রহমানঃ হাওর দুর্যোগের পর মনে হয় এবারের বন্যা আমাদের বেশ ভোগাবে। এরই মধ্যে পত্রপত্রিকায় তার অশনিসংকেত চোখে পড়ছে। ১০ জুলাই ২০১৭ তারিখের সহযোগী একটি দৈনিকের শেষ পৃষ্ঠায় একটি মানবিক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মিনা বেগম এখন ভিক্ষাও পায় না। ’ পত্রিকাটির সিলেটের বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি বানভাসি মিনা বেগমকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘ঘরতনে না বাড়াইলে খে ভিক্ষা দিব, ভিক্ষা না খরলে খাইমু কিতা? আইজ দুই দিন অইলো ফানি কমছে। ফানি কমলেও ভিক্ষা করতে বাড়ইতাম ফারিয়ার না। খেড়র চাল দিয় মেঘর ফানি পড়ে, ঘরর বিতরে আটিউনা পেখ (কাদা)। ইতা টিখ না খরলে রাইত ঘুমাইতাম খই? পেটর বিতরত জ্বালা। হেই যন্ত্রণা খারে খইতাম, কে মোর খতা হুনতো!’

সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় জনম দুঃখী একজন মিনা বেগম ওই অঞ্চলের হাজার হাজার বানভাসি মানুষের কষ্টের কথা এভাবেই প্রকাশ করেছেন। গুচ্ছগ্রামে বসবাসকারী এই দুঃখী মানুষরা বন্যায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে ভিক্ষা বা কাজ কোনোটাই জোগাড় করতে পারছে না। পানি আপাতত নেমে গেলেও তাদের দুর্ভোগ কমেনি। সর্বশেষ খবরে জানা যায়, সুরমা-কুশিয়ারার পানি ফের বাড়ছে। বৃষ্টির দাপটও কমছে না। কাঁচাঘরগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার যে বসে আছে তা-ও নয়। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও প্রশাসন বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এত বেশি বলে সবাইকে ত্রাণ দিয়ে সারতে পারছে না।
এ তো গেল একেবারে নিঃস্ব মানুষের দুরবস্থার কথা। কিন্তু যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খানিকটা ভালো, যারা কৃষি ও অকৃষি কর্মে নিয়োজিত তাদের বর্তমান অবস্থাও সুবিধার নয়। একই তারিখের আরেকটি দৈনিক পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, পাঁচটি জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বগুড়া, জামালপুর, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় যমুনা ও পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। তিস্তা নদীর ওপর দেওয়া বাঁধের ১১টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে বন্যাকবলিত অঞ্চলের পরিধি বেড়েছে। বন্যা পূর্বাভাসকেন্দ্র বলছে, বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। পত্রিকা থেকেই জানা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাশিয়া ইউনিয়নেই তিন হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। মানুষের ভরসা এখন শুকনা খাবার। বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় নদীভাঙনের হার বেড়ে গেছে।

নদীভাঙা ও বন্যার্ত মানুষের দুঃখের কথা যেন লিখে শেষ করা যাবে না। সে চেষ্টাও আমি করব না। মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে পাঠকদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে কী অবর্ণনীয় কষ্টেই না দিন কাটাচ্ছে এই দুঃখী মানুষরা। এসব অঞ্চলের মানুষের কাছে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তারা দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রশাসনিক দক্ষতাও বেড়েছে। ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ সক্রিয় রয়েছে। তবু কেন যেন মনে হচ্ছে, অনেক দিন বাদে আসা এই বন্যা অনেক মানুষেরই দুর্ভোগ বাড়াবে। এবার মনে হচ্ছে, বন্যার এই প্রকোপ খানিকটা দীর্ঘই হবে। সিলেটে এরই মধ্যে দ্বিতীয় দফা বন্যা আক্রমণ করল। আসামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার কারণে নিচের দেশ বাংলাদেশের ওপর দিয়েই ওই পানি প্রবাহিত হবে। সিলেটের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ও মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে লাখ লাখ মানুষ বেকায়দায় পড়েছে। ভাঙনপ্রবণ যমুনা ও পদ্মা পারের মানুষের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামান্য আশ্রয়ের খোঁজে তারা আজ দিশাহারা। এ অঞ্চলের চর এলাকার মানুষের দুঃখকষ্ট আরো তীব্র। তারা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে প্রয়োজনমতো ত্রাণ ও সহযোগিতাও পায় না।

চলমান এই দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে অসহায় মানুষকে রক্ষা করার মতো প্রয়োজনীয় অর্থ ও ত্রাণ সরকারের নিশ্চয় রয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক উদ্যোগ ও সমন্বয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দল, স্বজনপ্রীতি কিংবা সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতির আর অবনতি হতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে প্রশাসনের ওপর ভরসা না করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরো দৃশ্যমান হতে হবে। মানুষের দুর্যোগে তাঁরা যে সমানভাবে আক্রান্ত ও তাদের পাশে থেকেই মোকাবেলা করছেন—এ বার্তাটি আরো স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের পাশাপাশি সমাজকেও সক্রিয় করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। বর্তমানে মানুষের আয় বেড়েছে। বিত্তবানের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারের আকার ও সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে কোথাও বন্যাকবলিত মানুষ না খেয়ে আছে—এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমাদের স্মৃতিতে নিশ্চয় ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৮৮ সালের বন্যার কথা না হয় বাদই দিলাম। ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল প্রায় দেশব্যাপী। সে বন্যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি। খোদ ঢাকা শহরেও ঢুকে পড়েছিল বন্যার পানি। সেই বন্যা প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি পুরো সমাজ যেভাবে এগিয়ে এসেছিল, তা ছিল সত্যি দেখার মতো। এমন কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল না যাদের কর্মীরা এই দুর্যোগ মোকাবেলায় পিছিয়ে ছিল। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ তাদের সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিত্তবানরাও হাত খুলে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে তরুণসমাজের অবদান ভোলার নয়। শত শত স্বেচ্ছাসেবক সেই সময় বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ কেউ প্রাণও দিয়েছে। ঢাকার অদূরে আশ্রয় শিবিরে খাবার পরিবেশনার পাশাপাশি স্কুলের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাদানের কাজেও স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। সারা দেশের নানা সংগঠন (ক্লাব, নাট্যদল, প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রী সমিতি ইত্যাদি) সমাজের নানা উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বন্যার্ত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার মানবিক সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে একটি ঘটনা। হাতিরপুল বাজারের অদূরে একটি ত্রাণকেন্দ্রে রুটি ভাজা হচ্ছে। হঠাৎ দেখি এক ভ্যান ভরা আটার বস্তা। জিজ্ঞাসা করেও জানা গেল না কে পাঠিয়েছেন এই ত্রাণ; তিনি পর্দার আড়ালে থেকেই সাহায্য করেছিলেন বন্যার্তদের বাঁচিয়ে রাখার।

মিরপুর-সাভার সড়ক পানির নিচে। আমরা একটা নৌকায় করে ত্রাণ বিতরণে হেমায়েতপুর এলাকায় গিয়েছিলাম। শুরুতেই যে বাড়িতে ত্রাণ দিতে গেলাম তারা বলল, তাদের বাড়ি প্রথমে বলে অনেকেই ত্রাণ দেয়। কিন্তু দূরের বাড়িগুলোতে মানুষ সত্যি না খেয়ে খুব কষ্টে আছে। তাই তারা নিজেরা না নিয়ে আরেকটু দূরে গিয়ে ত্রাণ দিতে বলল। দেখলাম আসলেই কথাটি সত্যি। দূরের লোকজন একেবারে না খেয়েই রয়েছে। এই যে মানুষের জন্য মানুষের ভাবনা—সেটাই আসল। ১৯৯৮ সালে এই মানবপ্রীতির এক অসাধারণ সমাবেশ আমরা দেখেছি। দেখেছি সামাজিক পুঁজির অভাবনীয় উন্মেষ। দেখেছি দুর্যোগে-দুঃসময়ে কী করে জেগে ওঠে সাহসী মানুষ। আর এই মানুষের জয়গানই করেছেন এ দেশের অনেক কবি-সাহিত্যিক-রাজনীতিক। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে আমরা পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গার সময় বঙ্গবন্ধুর ত্রাণ তত্পরতার কথা জানতে পারি। মানুষ যে মানুষের জন্য সে বিষয়টি বুঝতে পারি। রবীন্দ্রনাথ সমাজের ভেতরকার শক্তির কথা খুব জোর দিয়ে বলতেন। তিনি মনে করতেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার প্রাণশক্তি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত। সাধারণের কল্যাণভার যেখানে স্থাপিত হয়, সেইখানেই দেশের মর্মস্থান। … আমাদের দেশে সমাজ যদি পঙ্গু হয়, তবেই যথার্থভাবে দেশের সংকটাবস্থা উপস্থিত হয়। ’ (রবীন্দ্র রচনাবলী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২৭)। আমাদের সৌভাগ্য আমাদের সমাজ বরাবরই সক্রিয় ছিল। রাষ্ট্র কি করল, না করল সেদিকে সমাজ তাকিয়ে থাকেনি। বরং বিদ্যা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতির বিকাশে সমাজের বিত্তবানরাই এগিয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজে পতিসর ও শিলাইদহে প্রজাদের চাঁদায় ও জমিদারি তহবিল থেকে অনুদান দিয়ে বিদ্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনার ব্যবস্থা করেছিলেন। শান্তিনিকেতনেও তিনি সমাজকেন্দ্রিক নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের সবাই মিলে ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে যে একক অভিব্যক্তি তৈরি হয় সেটিই জাতিসত্তার প্রাণশক্তি। যুগ যুগ ধরে এই ত্যাগ-তিতিক্ষার অভিমুখ অতীতে নয়, বরং বর্তমানের মধ্যেই প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। ‘অতীতের গৌরবময় স্মৃতি ও সেই স্মৃতির অনুরূপ ভবিষ্যতের আদর্শ—একত্রে দুঃখ পাওয়া, আনন্দ করা, আশ করা—এইগুলিই আসল জিনিস… একত্রে দুঃখ পাওয়ার কথা এই জন্য বলা হয়েছে যে আনন্দের চেয়ে দুঃখের বন্ধন দৃঢ়তর। ’ (নেশন কি?, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২১)।

১৯৭১ সালে আমরা এমন গভীর এক দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম। সে সময়টায় আমরা একে অপরের প্রতি তীব্র সহানুভূতি ও সহযোগিতার ভাব পোষণ করতাম। সেই সময় আমরা ‘সকলকে লইয়া’ বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনে একত্রে দুঃখের ও আনন্দের দিনগুলো পারি দিয়েছি।

সেই বাঙালি জাতি একইভাবে ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে পেরেছিল। ওই সময়টায় আজকের প্রধানমন্ত্রীই সরকারের কর্ণধার ছিলেন। দুর্যোগের ওই দিনগুলোতে তাঁর আন্তরিক, মানবিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল সদা দৃশ্যমান। সে সময় আমাদের অর্থনীতি এত বড় ছিল না। তবু কয়েকটি মাস ধরে সরকার ও সমাজ হাত ধরাধরি করে কোটি কোটি বন্যার্ত মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রেখেছিল তা-ই নয়, দ্রুত তাদের পুনর্বাসিতও করেছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, বিবিসি আমাদের দেশেরই একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞজনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল, দেশে দুর্ভিক্ষ হবে। কোটি মানুষ মারা যাবে। বাস্তবে একজন মানুষও প্রাণ দেয়নি। তাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার এক প্রাণপণ সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিনের ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিনের অর্থমন্ত্রী মরহুম শাহ কিবরিয়া তাঁকে দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। আজকের কৃষিমন্ত্রী তখনো কৃষিমন্ত্রী। আসাদুজ্জামান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃষি ও খাদ্য উপদেষ্টা। তাঁরা সবাই এমন আন্তরিকভাবে সেই সময় নীতি সমন্বয় ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে দেশে কোনো খাদ্য সংকট সৃষ্টি হতে পারেনি। কোনো মানুষ না খেয়ে মরেনি। বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের জন্য সুলভে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছিল তদানীন্তন সরকার। হাটে-বাজারে গিয়ে ক্যাম্প করে কৃষিঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বর্গাচাষিদের বিশেষ কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছিল তারা। কারা ঋণ পেল সেই তালিকা প্রকাশ্য স্থানে ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ ব্যাংকও সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে সক্রিয় করেছিল কৃষিঋণ দেওয়ার জন্য। কৃষকদের বীজতলা ডুবে গিয়েছিল। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী পাশের উপজেলায় বাড়তি বীজতলা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি হেলিকপ্টারেও ধানের চারা ফেরি করে বন্যার্ত কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে বন্যার্ত গরিব পরিবারকে বিনা মূল্যে চাল প্রদান করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। সে এক কর্মযজ্ঞ বটে।

আগেই বলেছি, সরকারের পাশাপাশি এ দেশের এনজিও, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের সামাজিক পুঁজি নিয়ে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিজেদের বেতন থেকে অর্থ দিয়ে ত্রাণকাজে সহায়তা দিয়েছেন। আমি একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলাম। আমরা তাঁদের দেওয়া অর্থ সাহায্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তুলে দিয়েই চুপ করে বসে ছিলাম না। আমাদের ব্যাংকারদের স্ব-স্ব কর্মস্থানেও বন্যার্ত মানুষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছিলাম। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা অত্যন্ত সফলভাবে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

সেই মূল্যবান অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন এই আঞ্চলিক বন্যার প্রতিরোধ কেন করতে পারব না? নিশ্চয় পারব। সরকার ত্রাণ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এ বছর বন্যার কারণে কৃষক বোরো ধান ঠিকমতো কাটতে পারেনি। ‘ব্লাস্ট’ আক্রান্ত বোরোর উৎপাদনও কম হয়েছে। আমন ধানের রোপণও ব্যাহত হয়েছে ও হচ্ছে। তাই চালের দাম বাড়ন্ত। তবে সরকার এ বিষয়ে অবহিত রয়েছে। ব্যবস্থাও নিচ্ছে। চালের দাম কমানোর জন্য শুল্ক হার কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি মার্জিন শূন্য করার নির্দেশ দিয়েছে। সংসদে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, বন্যার্ত কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ সরবরাহ করা হবে। আমার ধারণা, সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৯৮ সালের মতো বন্যার্ত দুস্থ মানুষগুলোকে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীও দেওয়া হবে। তবে এই ত্রাণ বিতরণে যেন কোনো অস্বচ্ছতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি না ঘটে সেদিকে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে কড়া নজর রাখতে হবে। মানুষের বাঁচা-মরা নির্ভর করে যে খাদ্য সাহায্যের ওপর তা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন কেউ না করতে পারে সেদিকে নিশ্চয় ১৯৯৮ সালের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেয়াল রাখবেন। তা ছাড়া ওই সময় কৃষির পুনর্বাসনে তাঁর সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, নিশ্চয় এবারে সেসবই নেওয়া হবে। বরং এখন সরকারের হাতে বাড়তি অভিজ্ঞতা ও সম্পদ দুই-ই রয়েছে। তাই এবারে আরো ভালোভাবে তা করা সম্ভব। সরকারের পাশাপাশি সমাজকে আরো সক্রিয় হতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এনজিও, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো এখনো নিষ্ক্রিয় কেন? আমাদের তরুণসমাজ কেন এখনো বসে আছে? সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তরুণরা সংঘবদ্ধ হতে পারে এবং বানভাসি মানুষের কল্যাণে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করতে পারে। ফেসবুকের কল্যাণে জানতে পারলাম ‘প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান রাত ২টার পর মাত্র ১৫ মিনিটে বেশ কিছু ‘সুপার-ভলান্টিয়ার’কে সজাগ করে একটি বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানের উদ্বৃত্ত খাবার কয়েক শ গরিব-দুঃখী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। এমন স্বেচ্ছাসেবী তরুণরাই ঢাকা ও ময়মনসিংহে মাত্র এক টাকায় পথশিশুদের পেটভরে খাবারের ব্যবস্থা করছে। তাহলে এই তরুণরা কেন ‘বন্যাকবলিত মিনা বেগম’দের জঠরজ্বালা নিবারণের মহতী উদ্যোগে অংশ নিতে এগিয়ে আসবে না? নিশ্চয় আসবে। প্রয়োজন সংগঠিত কোনো উদ্যোগের। ১৯৯৮ সালে ব্যাংকগুলোর সিএসআর কার্যক্রম সেভাবে চালু ছিল না। এখন তা পুরোদমে চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার টেকসই অর্থায়ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সব কটি ব্যাংককে সংগঠিত করতে পারে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার লক্ষ্যে। বিএবি ও এবিবিকে ডেকে বন্যা-উপদ্রুত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোকে তাদের সিএসআর তহবিলের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার জন্য তাদের উৎসাহিত করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এই তহবিল থেকে সহযোগিতা নিয়ে উৎসাহী তরুণদের যুক্ত করতে পারে বানভাসি মানুষদের বাঁচানোর সংগ্রামে।

একইভাবে এমআরএ তাদের অধীনস্থ এমএফআইগুলোকে এ কাজে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে বলতে পারে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এফবিসিসিআই ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি চেম্বার তাদের সদস্যদের সামাজিক দায়বদ্ধ কাজের অংশ হিসেবে বন্যা মোকাবেলায় পরিকল্পিত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে বলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে অবস্থানরত রেমিটারদের আহ্বান জানাতে পারে বন্যাকবলিত অঞ্চলে তাদের আত্মীয়স্বজনের জন্য বাড়তি রেমিট্যান্স পাঠাতে। সিলেট অঞ্চলের মানুষই বেশি বেশি বিদেশে রয়েছে। অথচ ওই অঞ্চলেই বন্যা তীব্র। তাদের এই অঞ্চলের মিনা বেগমদের জন্য কি বিদেশে বসবাসরত সিলেটবাসীদের কিছুই করার নেই? এ প্রশ্ন অন্যান্য অঞ্চলের বিদেশে কর্মরত মানুষদের কাছেও।

আশা করি আমাদের সবার প্রচেষ্টায় সমাজ আরো সক্রিয় হবে। আমাদের সমাজের মনোযোগটা ফের সমাজের ভেতরের দিকটায় পড়ুক সেই প্রত্যাশাই করছি। সামাজিক পুঁজির বিপুল সমাবেশের মাধ্যমে বন্যায় পর্যুদস্ত মানুষগুলো আবার মেরুদণ্ড খাড়া করে দাঁড়াক—সেই আশাই করছি।-লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। dratiur@gmail.com