বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল তাহের: পর্ব ৯

82

জিয়াউল হক মুক্তা

[জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম এর সম্পর্ক নিয়ে গত সাত বছর ধরে এক কলুষিত অপপ্রচার চলছে দৈনিক প্রথম আলো ও এর সিস্টার কনসার্ন প্রথমা’র কথিত ‘লেখক ও গবেষক’ মহিউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে। গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ক চরম অজ্ঞতা আর নিকৃষ্ট রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির সাথে লেলিহান বাণিজ্যিক স্বার্থের মিশেলে গড়ে ওঠা এ কলুষিত অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে অনেকে চলমান বিএনপি-জামাত-জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনের মঞ্চ ১৪ দলের অংশীদার আওয়ামী লীগ ও জাসদ এর রাজনৈতিক ঐকমত্যকে বানচাল করতে চান। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির ‘প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক’ জিয়াউল হক মুক্তা তৈরি করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল তাহের’ শিরোনামের এ ধারাবাহিক রচনা। আজ প্রকাশিত হলো ১৪ পর্বের এ রচনার পর্ব ৯।]

[গতকালের পর]

বাইশ. কর্নেল তাহেরের পরামর্শে ডালিম সশস্ত্র বাহিনী প্রধানদের বেতারে নিয়ে আসেন?
কর্নেল তাহেরের বেতার ও বঙ্গভবনে যাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করে ইঙ্গিত করা হয় যে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যায় যুক্ত ছিলেন।লরেন্স লিফস্যুলৎসকে তথ্যসূত্র করে প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখছেন, “তাঁর [কর্নেল তাহেরের] পরামর্শে ডালিমরা সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানকে বেতার ভবনে নিয়ে আসেন অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ার জন্য।” প্রিপেইড মহিউদ্দিন আরও লিখেছেন, “১৫ আগস্ট সকালেই তাহের ‘সফল বিপ্লবকে অভিনন্দন জানাতে’ ঢাকা বেতার কেন্দ্রে গিয়েছিলেন।” লিফস্যুলৎসের বইয়ের ৮৬ থেকে ৮৮ পৃষ্ঠায় এসব আছে বলে দাবি করেছেন মিথ্যাবাদী প্রিপেইড। না, তা সেখানে নেই।

শেষের বিষয়টি দিয়ে শুরু করি। অনেকের অনুরোধে কর্নেল তাহের বেতারে যান; কিন্তু বেতারে যাওয়া মানেই ক্যু’র সাথে বা বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে যুক্ত থাকা নয়। হাসানুল হক ইনু আমাকে জানিয়েছেন যে সেদিন আরও অনেকেই বেতারে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি বুঝতে, যারা ক্যু বা হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত নন। সামরিক কর্মকর্তাদের অল্প কয়েকজন বঙ্গবন্ধু হত্যায় যুক্ত ছিলেন, অধিকাংশজন তা জানতেন, কতিপয় তাতে সম্মতি দিয়েছেন, আর সেনাপ্রধান ও আরো দু’একজনের অযোগ্যতায় সে ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। শেষের ধরনের মধ্যে পড়েন কেএম শফিউল্লাহ ও একে খন্দকার; বেতারে ও বঙ্গভবনে অপরাপর সামরিক কর্মকর্তাদের মতো এ দু’জনও উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু তার মানে তো এ নয় যে এরা বঙ্গবন্ধু হত্যায় যুক্ত ছিলেন। তাই যৌক্তিক বিশ্লেষণে তাহেরও নন।কর্নেল তাহেরের বেতার ভবনে যাওয়া নিয়ে এমনকি আগস্ট-খুনিরাও দাবি করেননি যে তিনি তাদের অভিনন্দন জানাতে সেখানে গিয়েছিলেন। অতএব তাহেরের বেতারে বা বঙ্গভবনে যাওয়া দিয়ে এ সিদ্ধান্তে আসা যায়না যে তিনি ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন।

এটা মনে রাখতে হবে যে কর্নেল তাহের বেতারে পৌঁছান সকাল ন’টার দিকে। কিন্তু সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে ডালিম সেনানিবাস থেকে কেএম শফিউল্লাহ, একে খন্দকার, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ প্রমুখদের নিয়ে বেতারের দিকে রওনা হয়ে যান– সে সময়ের সেনা কর্মকর্তাদের লেখাগুলো থেকে এটা নিখুঁতভাবে জানা যায়। উপরন্তু, এমনকি প্রিপেইড মহিউদ্দিনও তার অপর এক রচনায় বলেন, “বেতার কেন্দ্রে আসার পর মেজর ডালিম ছুটে এসে তাঁকে সালাম করেন এবং বেতারে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করেন।” তাই ভিন্ন ভিন্ন ও এমনকি একই রচনায় পরষ্পরবিরোধী তথ্য ব্যবহারকারী প্রিপেইড মহিউদ্দিনের মতো করে যারা বলেন যে তাহেরের পরামর্শে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের বেতারে আনা হয়েছিল ক্যু’র পক্ষে তাদের বিবৃতি আদায়ের জন্য– তারা ইতিহাসের অযোগ্য পাঠক– ঘটনার সাথে স্থান-কাল-পাত্র মিলিয়ে ইতিহাস পাঠের যোগ্যতা বা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এদের নেই। অথচ ব্যাপারটি ঘটেছে ঠিক উল্টো। বেতারে খুনি রশিদ কর্নেল তাহেরকে আলাদা কক্ষে ডেকে নিয়ে কর্নেল তাহের ও জিয়াউদ্দিনের সহযোগিতা চাইলে কর্নেল তাহের বলেন যে তারা সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিক; এর অর্থ হলো– বিবৃতি আদায় তো নয়ই, বরং উল্টো কর্নেল তাহের তাদেরকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের পরামর্শ শোনার জন্য বলেন।

লরেন্স লিফস্যুলৎসকে তথ্যসূত্র করে প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখছেন, “তাঁর [কর্নেল তাহেরের] পরামর্শে ডালিমরা সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানকে বেতার ভবনে নিয়ে আসেন অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ার জন্য।” মিথ্যাবাদী প্রিপেইড মহিউদ্দিনকে যেহেতু একদম বিশ্বাস করা যায়না, সেজন্য দেখা যাক লিফস্যুলৎস আসলে কী বলেছেন। লিফস্যুলৎসের বইটির বাংলা সংস্করণ পাওয়া যায়, কিন্তু মহিউদ্দিন যেহেতু ইংরেজি সংস্করণটির দোহাই দিয়ে দাবিটি করছেন, সেহেতু এখানে ইংরেজি সংস্করণটি থেকেই মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। লিফসু্যুলৎস কর্নেল তাহেরকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “আই ওয়াজ টেকেন টু অ্যানাদার রুম বাই মেজর রশিদ হোয়্যার হি আস্কড মি হোয়েদার আই উড লাইক টু জয়েন দি কেবিনেট। আই টোল্ড হিম টু গেট হোল্ড অফ অল দি চিফস অ্যান্ড দি ডিফেন্স ফোর্সেস, ডিসকাস দি প্রবলেমস উইথ দেম, অ্যান্ড টু রিচ এ সুইটেবল সলিউশন। মেজর রশিদ ইনসিস্টেড আই, টুগেদার উইথ লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন, কুড সেভ দি সিচুয়েশন অ্যান্ড দ্যাট হি হ্যাড নো ফেইথ ইন এনি সার্ভিস চিফ অর এনি পলিটিশিয়ান।” [মেজর রশিদ আমাকে আরেকটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন যে আমি মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে ইচ্ছুক কীনা। আমি তাকে বললাম সশস্ত্র ও প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর প্রধানদের সাথে সমস্যাগুলো আলোচনা করতে এবং একটি যথাযথ সমাধানে পৌঁছতে। মেজর রশিদ প্ররোচিত করলেন যে আমি ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন একসাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম আর চাকুরিরত কোনো বাহিনী প্রধানের প্রতি বা কোনো রাজনীতিকের প্রতি তার কোন আস্থা নেই।] পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে লরেন্স লিফস্যুলৎসের নাম ব্যবহার করেপ্রিপেইড মহিউদ্দিন যা বাজারজাত করতে চাইছেন, লিফস্যুলৎস মোটেই তা বলেননি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে কর্নেল তাহের বেতারে পৌঁছার আগেই ডালিম সেনানিবাস থেকে তিনবাহিনীর প্রধানকে সেখানে নিয়ে আসেন; আর রশিদকে তিনি বলেন তাদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে, বিবৃতি আদায় করতে নয়।

প্রিপেইড মহিউদ্দিন নিশ্চয়ই এখন বলবেন না যে তিনি ইংরেজি জানেন না আরতা না জানার কারণে লিফস্যুলৎসের বাক্যটির ভুল অনুবাদ করে ফেলেছেন আর নিজ বইয়ে তার স্থান দিয়েছেন। প্রিপেইড মহিউদ্দিন ইংরেজি যদি নাই জানেন, এতে লজ্জার কিছু নেই, ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয়, এটা জানা আবশ্যক নয়; কিন্তু চাইলে অনুবাদের জন্য তিনি তো তার নিয়োগদাতা মতিউর রহমানের সাহায্যও নিতে পারতেন, তিনি তার পত্রিকার কোনো স্টাফ দিয়ে তা অনুবাদ করিয়ে দিতে পারতেন। তবে আমার ধারণা মহিউদ্দিন ইংরেজি জানেন, আর বেশ ভালো ইংরেজি জানেন। কিন্তু তিনি আসলে জেনেশুনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে লিফস্যুলৎসের তথ্য বিকৃত করছেন। মিথ্যাবাদি বদমাশ কোথাকার!

তেইশ. তাহেরের ম্যান্ডেট ও পাঁচ দফা প্রস্তাব
সকাল নটার পর বেতার ভবনে কর্নেল তাহের মোশতাক-রশীদকে বলেন যে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা তখনকার জরুরি বিষয়। পাশাপাশি তিনি চতুর্থ সংশোধনী-পরবর্তী সংবিধান স্থগিত করা, সামরিক শাসন জারি করা, সকল রাজবন্দীর মুক্তিদান, বাকশালকে বাদ দিয়ে একটি সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন ও অবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেয়া– এপাঁচটি প্রস্তাব রাখেন। মহিউদ্দিন তার বইয়ে দাবি করেন যে ‘এসব প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য পার্টি তাকে কোনো ম্যান্ডেট দেয়নি’।

এখানে রাজনীতি ও সংগঠন বিষয়ে মহিউদ্দিনের উৎকট জ্ঞান প্রকাশিত হয়; পত্রিকায় কাজ করেও তার শিক্ষা হয়নি কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলো দৈনন্দিনতার চর্চা করে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের প্রতিদিনের প্রতিটি বক্তব্যের জন্য কি আলাদা আলাদা সভা করে দল থেকে ম্যান্ডেট নেন? না। কিন্তু মহিউদ্দিন জানেন না যে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সর্বশেষ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্য-বিবৃতি-সাক্ষাৎকার প্রদানের অধিকার ভোগ করেন; সুতরাং বলা যাবেনা যে কর্নেল তাহেরের ম্যান্ডেট ছিলনা।তাঁর উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো ছিল সংকট থেকে উত্তরণের প্রস্তাব; এগুলোর একটি [দ্বিতীয়টি] বাদে বাকিগুলো দলের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধী ছিল না।হ্যাঁ, মহিউদ্দিন সঠিক বলেছেন যে জাসদ সামরিক শাসনকে সমর্থন করেনা। বিষয়টিতে আরও দু’দিক থেকে আলোকপাত করা যাক।

প্রথমত, খুনিরা ভোর বেলায় সামরিক শাসন জারি করে ফেলেছে। ১৫ আগস্ট সকালে ডালিম বেতার ঘোষণায় বলেন, “মেজর ডালিম বলছি। অদ্য সকাল হইতে খোন্দকার মোশতাক আহমদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে। শেখ মুজিব ও তাঁর খুনি দুর্নীতিবাজ সরকারকে উৎখাত করা হইয়াছে। এখন হতে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করা হল। আপনারা সবাই আমাদের সাথে সহযোগিতা করুন। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন কোনো অসুবিধা আপনাদের হইবে না। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।”ডালিমের তার এ বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশ, বিডিআর ও রক্ষীবাহিনীর সিপাহী ভাইগণ, আপনারা সবাই সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগদান ও সহযোগিতা করুন। যাহারা অসহযোগিতা করিবেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে তাহাদের চরম দণ্ড দেওয়া হইবে।”

উল্লেখ্য, প্রিপেইড মহিউদ্দিন তার অপরাপর বই/রচনাতেও ডালিমের পুরো বক্তব্যটি কখনও প্রকাশ করেন না; বিকৃতভাষ্যটিই প্রকাশ করেন। ডালিমের প্রতি তার প্রেম কেন এত উথলে ওঠে তা ভাবার বিষয় বটে। শুধু তাই নয়, প্রিপেইড মহিউদ্দিন ডালিমের অপরাধকে যেমন লঘু করে দেখাতে চান, তেমনি খন্দকার মোশতাকের অপরাধকেও লঘু করে দেখাতে চান। ২০১৭-র জুনে প্রকাশিত প্রথম আলো’র ঈদ সংখ্যায় এক রচনায় বঙ্গবন্ধু হত্যায় মোশতাকের সুনির্দিষ্ট অংশগ্রহণকে অস্পষ্ট করতে মহিউদ্দিন দাবি করেন, “১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে খন্দকার মোশতাকের যোগাযোগের মাত্রা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গিয়েছে। তিনি কি আগে থেকেই সব জানতেন? তিনি কি এই পরিকল্পনার অংশ ছিলেন?” এ রচনার অন্যত্র বলছেন, “খন্দকার মোশতাক দাবি করেছেন, তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। তাকে ডেকে আনা হয়েছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য।”

প্রসঙ্গে ফেরা যাক, ডালিমের ঘোষণা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করে যে সেদিন ভোর থেকে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছিল; আর মজার কথা হলো ‘সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে’ বলার পর প্রত্যক্ষভাবে না বললেও সে ব্যবস্থা যে ‘সামরিক শাসন’এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়; দেশের জনগণও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোর থেকে ভালোভাবে জানতেন যে সামরিক শাসন আরোপ করা হয়েছে। কোন তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে মহিউদ্দিন মেজর ডালিমের বক্তব্যের একটি বিকৃত সংস্করণ উপস্থাপন করে বলছেন, “রেডিওতে ঘোষণা শোনা যাচ্ছিল : ‘আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ সারা বিশ্বে কারফিউ জারি করা হয়েছে। উত্তেজনার বশে ডালিম ‘সারা বিশ্বে’ কারফিউ জারি করে দিলেন।”প্রিপেইড মহিউদ্দিন তার এক রচনায় দাবি করছেন, “২০ আগস্ট নতুন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ সামরিক আইন জারি করেন।” অথচ পরের অনুচ্ছেদে কয়েক লাইন পরে তিনি মোশতাকের ভাষণটি তুলে ধরেছেন যেখানে মোশতাক নিজেই ১৫ আগস্ট সামরিক আইন জারির কথা নিশ্চিত করেন।

এম সানজীব হোসেন এ বিষয়ে প্রিপেইড মহিউদ্দিনকে লেখার মাধ্যমে অবহিত করলেও তিনি তা আমলে নিচ্ছেন না; কারণ তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে একটি বিকৃত ন্যারেটিভ/বিবরণী তৈরি করতে চান; ডালিমের মূল বেতার ঘোষণাটি প্রিপেইড মহিউদ্দিন কোনোভাবেই ব্যবহার করতে চাননা; যদিও ১৫ আগস্ট ভোর থেকে ডালিমের ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর আর সামরিক শাসন ও অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারির ঘোষণা, খন্দকার মোশতাকের ভাষণ, সেনা-বিমান-নৌবাহিনীর প্রধানকর্তৃক মোশতাককে সমর্থন করে দেয়া বিবৃতি, আর ঐদিনের বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ এখনও ইউটিউবে পাওয়া যায়।কিন্তু শতমন ঘি মাখলেও প্রিপেইড মহিউদ্দিনের লেজ কখনও সোজা হবার নয়– সারমেয় প্রজাতির একটি নেড়ির যা বৈশিষ্ট্য হয় আর কি! [এখানে আরও একটু ‘চাটনি’ দেয়া যাক– সিপিবি’র সভাপতিমণ্ডলির একজন সদস্যও মহিউদ্দিনের মতো করে মনে করেন যে ১৫ আগস্ট ভোরে সামরিক শাসন জারি করা হয়নি; এ বিষয়ে তাঁর সাথে মেসেঞ্জারে আমার দীর্ঘ কথপোকথন হয়েছে এবং এক পর্যায়ে তিনি লেজ গুটিয়ে চলে গিয়েছেন।]

এর সাথে সাথে দেখা যাক খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজে কী বলছেন। পঁচাত্তরের ২০ আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত প্রেসিডেন্টের সচিবালয়ের ঘোষণায় খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, “… ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের প্রভাতে আমি রেডিও বাংলাদেশের সকল কেন্দ্র থেকে একটি সামরিক ঘোষণা প্রচারের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে সামরিক আইন জারি করেছি।”

কিন্তু প্রিপেইড মহিউদ্দিন ইউটিউবে সংরক্ষিত অডিও-ভিডিও ফাইল বা বাংলাদেশ গেজেটে মুদ্রিত তথ্য-প্রমাণ বিশ্বাস করবেন কেন? তিনি তো ‘ফালতু কথা’কে ইতিহাস হিসেবে ভেবে ভেবে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছেন। ১৫ আগস্ট সকাল ৯টার পর বেতারে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে আর ১৬ তারিখ বঙ্গভবনে কর্নেল তাহের যে রাজনৈতিক প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করেছেন সেখানে সামরিক শাসন জারি করার বিষয়টি নতুন কোনো প্রত্যাশা বা মাত্রা যোগ করে না, তিনি ইতোমধ্যে জারিকৃত সামরিক শাসনকে ‘ব্যবহার’ করার কথা ভাবছিলেন [পরের অনুচ্ছেদ দুটো বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য]। বিষয়টি কেবল প্রিপেইড মহিউদ্দিনকেই নয়, ইতিহাসের অপরাপর লেখক-গবেষক-শিক্ষার্থীদেরও বিবেচনায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাহেরের প্রথম প্রস্তাব ছিল চতুর্থ সংশোধনীজাত সংবিধান স্থগিত/বাতিল করা, কারণ পঁচাত্তরের ২৫ আগস্ট চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একক জাতীয় দল-কর্মসূচি-ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, এক ব্যক্তির শাসন কায়েম করা হয়েছিল, ব্যক্তির সকল মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল; এ সংবিধান বহাল রাখলে বাকশাল বহাল থাকে আর খন্দকার মোশতাকও সাংবিধানিকভাবে ‘একনায়ক’ হিসেবে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন। কর্নেল তাহের যেহেতু চতুর্থ সংশোধনীজাত সংবিধানের স্থগিত/বাতিল দাবি করেছেন, কিন্তু কোনো না কোনো আইনী কাঠমোর অধীনে তো দেশ পরিচালিত হতে হবে; হ্যাঁ সামরিক শাসন বর্বর ও অসভ্য একটি ব্যবস্থা, কিন্তু তা কোনো আইনহীন ‘শূন্যতা’ বা ‘নৈরাজ্য’ নয়। একে একটি মধ্যবর্তী-সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে ভেবে কর্নেল তাহের পরবর্তী প্রস্তাবগুলো প্রদান করেন– যাতে ছিল দলমত নির্বিশেষে সকল রাজবন্দির মুক্তিদান, বাকশালকে বাদ দিয়ে একটি সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা ও জাতীয় সংসদ গঠন করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। সংক্ষেপে [ক] সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর প্রেক্ষাপটে,[খ] রাজনীতি-সরকার-সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, [গ] ‘ক’ ও ‘খ’ এর একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে কর্নেল তাহের ‘শূন্যতা/নৈরাজ্য’ নিরসনে সাময়িক কালের জন্য ইতোমধ্যে জারিকৃত সামরিক শাসনকে ব্যবহার করার প্রস্তাব রেখেছেন।

বাকশাল কায়েমের পর থেকে জাসদ যেহেতু সশস্ত্র-গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক লাইনে ছিল, সম্ভবত সেজন্যই দলের ভেতর সম্ভাব্য ক্যু ও সামরিক শাসন বিষয়ে দলের ভেতর কোন আলোচনা হয়নি; বাকশালের মতো জাসদও সুনির্দিষ্টভাবে অনুমান করতে পারেনি এরকম একটি ক্যু হয়ে যেতে পারে। কর্নেল তাহের যে প্রস্তাবগুলো রেখেছেন, সেগুলো সেসময় আওয়ামী লীগ ও বাকশাল সমর্থিত/বিরোধী সকল জাতীয় গণমাধ্যমেরও প্রধান দাবি ছিল। যা হোক, চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে প্যানডোরার বাক্স খুলতে চাচ্ছিনা ইচ্ছে করেই, বস্তুনিষ্ঠভাবে এ আলোচনা করার মতো বা তা সহ্য করার মতো মানসিকতা এখনও আমাদের সকলের তৈরি হয়নি; এটা নিকট বা দূর ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেয়াই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। বলে রাখা ভালো খন্দকার মোশতাক প্রস্তাবগুলো না মেনে ক্ষমতাকে উপভোগ করার পথেই হাঁটছিলেন আর তা থেকেই প্রমাণ হয় তাহেরের প্রস্তাবগুলো কতোটা ন্যায়সঙ্গত ছিল। প্রিপেইড মহিউদ্দিন বা তার নিয়োগকর্তা চাইলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারেন, দেখি কতো ক্ষমতা!

[আগামীকাল পর্ব ১০ এর বিষয়াবলী: চব্বিশ. কর্নেল তাহেরকে ব্যবহার করার ও ক্ষমতার অংশীদার করার ব্যর্থ প্রয়াস; পঁচিশ. মোশতাকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কর্নেল তাহের? ছাব্বিশ. ‘উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া?’ সাতাশ. এক কান কাটা ও দুই কান কাটা]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।