বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল তাহের: পর্ব ৮

64

জিয়াউল হক মুক্তা

[জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম এর সম্পর্ক নিয়ে গত সাত বছর ধরে এক কলুষিত অপপ্রচার চলছে দৈনিক প্রথম আলো ও এর সিস্টার কনসার্ন প্রথমা’র কথিত ‘লেখক ও গবেষক’ মহিউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে। গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ক চরম অজ্ঞতা আর নিকৃষ্ট রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির সাথে লেলিহান বাণিজ্যিক স্বার্থের মিশেলে গড়ে ওঠা এ কলুষিত অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে অনেকে চলমান বিএনপি-জামাত-জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনের মঞ্চ ১৪ দলের অংশীদার আওয়ামী লীগ ও জাসদ এর রাজনৈতিক ঐকমত্যকে বানচাল করতে চান। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির ‘প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক’ জিয়াউল হক মুক্তা তৈরি করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল তাহের’ শিরোনামের এ ধারাবাহিক রচনা। আজ প্রকাশিত হলো ১৪ পর্বের এ রচনার পর্ব ৮।]

[গতকালের পর]

উনিশ. ‘লুজ টক’ কি ইতিহাস?
তৎকালে নগর গণবাহিনীর নেতা আবুল হাসিব খানের নাম করে প্রিপেইড মহিউদ্দিন বলেন যে ১৫ আগস্ট ঢাকা নগর গণবাহিনীর জরুরি সভায় আনোয়ার হোসেন নাকি উপস্থিত সবাইকে বলেছেন যে ভাইজান [কর্নেল তাহের] সকালে রেডিও স্টেশনে গিয়েছিলেন আর মেজর ডালিমকে বকাঝকা করে বলেছেন, “–র মেজর হয়েছ, এখন পর্যন্ত একটা মার্শাল ল প্রক্লেমেশন ড্রাফট করতে পারলে না। জানো, কাল ইউনিভার্সিটিতে কারা বোমা ফাটিয়েছিল? দে আর মাই বয়েজ।”

প্রিপেইড মহিউদ্দিনের এ ভাষ্য পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর আনোয়ার হোসেন প্রিপেইড মহিউদ্দিনের বর্ণিত তথ্যসূত্র আবুল হাসিব খানের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে হাসিব খান তাকে জানান যে, এসব বিষয়ে তিনি নিজেকে জড়াতে চান না; বেশ কিছুকাল আগে মহিউদ্দিনের সাথে এক আড্ডায় তার দেখা হয়েছিল, সেখানে কিছু ‘লুজ টক’ হয়েছিল। তো এই হলেন প্রিপেইড মহিউদ্দিন! সে কারণে ‘লুজ টক’ বা ‘ফালতু কথা’ বা ‘বাজে কথা’ বা ‘হালকা কথা’ বা ‘চটুল কথা’র ওপর নির্ভরশীল তথাকথিত ‘লেখক ও গবেষক’ প্রিপেইড মহিউদ্দিনকে নতুন করে ডাকা যায় ‘লুজ মহিউদ্দিন’ নামে। এখানে প্রমাণ হয়ে রইল গবেষণার পদ্ধতিগত দিক থেকে তো বটেই, এমনকি একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবেও লুজ মহিউদ্দিনকে কোনোক্রমেই বিশ্বাস করা যায় না, বৈঠকি গল্পের লুজ তথ্যভাষ্যের ভিত্তিতে তিনি ইতিহাস রচনা করছেন কথিত তথ্যদাতার অনুমোদন না নিয়ে। গবেষণা ও ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় আচরণ বিশ্বব্যাপী অ্যাকাডেমিশিয়ান বা বিদ্যায়তনিক ব্যক্তিবর্গের কাছে এক চরম নৈতিক স্খলন ও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। যা হোক, লুজ মহিউদ্দিনের গবেষণা পদ্ধতির ওপর ব্যাপক-পরিসরে আলোচনা করা হয়েছে ‘প্রিপেইড মহিউদ্দিনের জাসদ চর্চা’ শীর্ষক অপ্রকাশিত বইয়ে; এটি প্রকাশিত হলে পাঠক লুজ মহিউদ্দিনের অন্তঃসারশূন্যতা সম্পর্কে বিশদ জানতে পারবেন।

মেজর ডালিমকে উদ্দেশ্য করে কর্নেল তাহেরের কল্পিত ভাষ্যের যে বিবরণ আবুল হাসিব খানের নামে লুজ-মহিউদ্দিন বাজারজাত করেছেন সে সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন বলেন যে গণবাহিনীর মতো একটি গোপন সংগঠনে ভাই-ভাইজানের মতো সম্বোধন ও তাহেরের উক্তি উদ্ধৃত করার প্রশ্নই আসে না। আর আনোয়ার হোসেন যে কর্নেল তাহেরের ভাই তা গণবাহিনীর নেতৃস্থানীয় অল্প কয়েকজন ছাড়া অন্যরা জানতেন না। কারণ, এটা একটা নিরাপত্তা ইস্যুও বটে। আনোয়ার হোসেন রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বল্পপরিচিত বলেই তাকে ঢাকা নগর গণবাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়। কর্নেল তাহেরের আরেকজন ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক ২০২০ সালে ২১ জুলাই ‘শহীদ কর্নেল তাহের দিবস’ উপলক্ষ্যে বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন যে কাজের ক্ষেত্রে কর্নেল তাহের ‘নো মোর ভাই বিজনেস’ নীতির চর্চা করতেন কঠোরভাবে।

লুজ মহিউদ্দিন যেহেতু আবুল হাসিব খানকে উদ্ধৃত করে মার্শল ল প্রক্লেমেশন ড্রাফট করা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা ফাটানোর প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন, আর আবুল হাসিব খান যেহেতু এসবে নিজেকে জড়াতে চাননা ও কিছু লুজ টকের কথা বলে প্রসঙ্গগুলো নাকচ করে দিয়েছেন, তাই এ বিষয় দুটো নিয়ে এখানে অধিকতর আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক। প্রিপেইড মহিউদ্দিন একজন ব্যক্তি হিসেবে নিজ বান্ধব-পরিজনদের প্রতিও বিশ্বাস নন। আড্ডার ‘লুজ টক’কে কবে কোথায় কীভাবে না কীভাবে ব্যবহার করে তাদেরকে ফাঁসিয়ে দেন বা তাদের জন্য বিব্রতকর অবস্থা তৈরি করেন– তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

বিশ. বিকৃত-মস্তিষ্কের রাজনৈতিক প্রচারণা
যদিও কোন উদ্ধৃতিচিহ্ন নেই, অনুচ্ছেদ শেষে এন্ডনোট থেকে জানা যায় যেপ্রিপেইড মহিউদ্দিন একজন বিজেড খসরুর বরাতে লিখেছেন, “লে. কর্নেল আবু তাহের গোপনে গণবাহিনী গড়ে তুলছিলেন। ডালিম ও নূর তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাহের ও ডালিমের চিন্তাধারা ছিল একই রকম। তাহের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেন নি। তবে ওই দিনই তিনি অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।”

কে এই বিজেড খসরু যাকে মহিউদ্দিন পরম দরদে উদ্ধৃত করলেন? ইন্টারনেটে সার্চ করে জানা গেল তিনি চরম পশ্চাদপদ মানসিকতার দক্ষিণপন্থার এক সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদি লেখক। ‘সাউথ এশিয়া জার্নাল’ তার পরিচয়ে লিখছে যে বিজেড খসরু নিউইয়র্কের ‘দি ক্যাপিটাল এক্সপ্রেস’-এর সম্পাদক আর ‘মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস: বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’ ও ‘দি বাংলাদেশ মিলিটারি ক্যু অ্যান্ড দি সিআইএ লিংক’ বইয়ের লেখক। খসরু এখন ‘দি কিংস মেন, ওয়ান-ইলেভেন, মাইনাস টু, সিক্রেটস বিহাইন্ড শেখ হাসিনাস ওয়ার অন ইউনুস অ্যান্ড আমেরিকা’ নামের একটি নতুন বইয়ের কাজ করছেন।

শেষ বইটির শিরোনাম যেন দিনের আলোয় উজ্জ্বল করে তোলে কে এই বিজেড খসরু! আর কী অদ্ভুত চমৎকার মিল প্রথম আলো ও প্রথমা’র মালিক মতিউর রহমান ও তার কর্মচারি প্রিপেইড মহিউদ্দিনের সাথে বিজেড খসরুর! ‘আমেরিকা ও ইউনুসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার যুদ্ধের গোপনীয়তা’ নিয়ে কাজ করছেন এ খসরু!!!

বিজেড খসরুকে চিনতে এটুকুই যদিও যথেষ্ট, তারপরও আরো একটু দেখা যাক বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে একটি কমেন্টারিতে তিনি ভারতীয় মুসলিমদের কী পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি লিখেছেন, “প্রতিবাদ হিসেবে ভারতীয় মুসলমানদের উচিত মসজিদের জন্য জমি দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা এবং সেখানে কোন মসজিদ নির্মাণ না করা। চরমপন্থি হিন্দুদের আঘাত করতে তাদের উচিত যখনই সম্ভব খোলা আকাশের নিচে শুক্রবারের সাপ্তাহিক জামাত শুরু করা।” একজন লেখক সেজে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সুপরামর্শ দেয়ার বদলে তিনি উস্কে দিচ্ছেন সংঘাত। সে যা হোক, বাংলায় একটি প্রবচন আছে– রতনে রতন চেনে, শুয়োরে চেনে কচু। প্রিপেইড মহিউদ্দিনের মতো লোকদের জন্যই বিজেড খসরুর মতো লোকরা লেখালেখি করে থাকেন, যেমনটি প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখে-খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকেন তারই মতো বিকৃত মস্তিষ্কের রাজনৈতিক প্রচারকদের জন্য।

গণবাহিনী সম্পর্কে প্রিপেইড মহিউদ্দিন তার গুরু খসরুকে উদ্ধৃত করেছেন, “লে. কর্নেল আবু তাহের গোপনে গণবাহিনী গড়ে তুলছিলেন।” অথচ মহিউদ্দিন নিজ বইয়ের ১৫৯ পৃষ্ঠা থেকে ১৬৫ পৃষ্ঠায় বিস্তারিতভাবে লিখেছেন গণবাহিনী গঠনের ইতিহাস– কীভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে জাসদের নেতাকর্মীগণ অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন-হত্যার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের ধারাবাহিকতায় গণবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।আর কর্নেল তাহেরএকা গণবাহিনী গড়ে তোলেননি; তা গঠন করেছিল জাসদ; জাসদ তাঁর কাছে এর নেতৃত্ব অর্পণ করেছে প্রধান হিসেবে, উপপ্রধান হিসেবে তাঁর সাথে দিয়েছে হাসানুল হক ইনুকে, আর উভয়ের রাজনৈতিক কমিসার হিসেবে নিয়োগ করেছিল মোহাম্মদ শাহজাহানকে। তবে প্রিপেইড মহিউদ্দিন বা তার গুরু খসরু গণবাহিনীর গঠনকে ভালো-মন্দ যাই বলুন না কেন, জাসদ গণবাহিনী গঠনের দায় বা কৃতিত্ব গৌরবের সাথে স্বীকার করে; ভয় পেয়ে অস্বীকার করে না।ঘটনার বা অনিবার্যতার ঐতিহাসিকতা জাসদ অস্বীকার করে না।

খসরু-মহিউদ্দিন বলেছেন, “ডালিম ও নূর তাঁর [কর্নেল তাহের] সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাহের ও ডালিমের চিন্তাধারা ছিল একই রকম।”এ কথা বলে তারা উভয়ে চরম বেয়াদবির পরিচয় দিয়েছেন। ডালিম-নূরের সাথে তাহেরের যোগাযোগ থাকার বিষয়টি ডাহা মিথ্যা; কুমিল্লায় কর্নেল তাহের ৪৪ ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন মাস চারেক, এসময় তার অধঃস্তন অফিসার ছিলেন ডালিম, ব্যস ওটুকুই; আগে-পরে এর আর কোনো রাজনৈতিক-সামরিক মাত্রা ছিল না। কোন যোগাযোগও ছিলনা; খসরু-মহিউদ্দিন চক্র তাহেরের সাথে ডালিমের যোগাযোগ থাকার কোন তথ্য-প্রমাণ বা এভিডেন্স দিতে পারবেন না। উপরন্তু ‘তাহের ও ডালিমের চিন্তাধারা ছিল একই রকম’ বলে খসরু-মহিউদ্দিন চক্র তাদের মূর্খতার পরিচয়ও প্রকট করে তোলেন; তাদের মধ্যকার তথাকথিত ‘একই রকম’ ‘চিন্তাধারা’র কোন তথ্যউপাত্ত বা এভিডেন্স তারা হাজির করতে পারেননি। আর তাদের চিন্তা যদি একই রকম হতো, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তো তাহলে একই রকম হওয়ার কথা! যুক্তি তো তাই বলে, নাকি? তারা কি বলতে চান যে তাদের মধ্যে চিন্তা-কাজের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? প্রিপেইড মহিউদ্দিন এখানে খসরুকে ব্যবহার করে তাহেরের গায়ে আরও একটু রং মাখিয়ে নিজের ষড়যন্ত্রের প্লটটিকে আরও একটু সম্প্রসারিত করে রাখলেন; লুজ-মহিউদ্দিনের সাথে সে দিকে যাওয়া যাবে, সমস্যা নেই।

প্রিপেইড মহিউদ্দিন মৌলবাদি লেখক খসরুকে নিজের গুরু মেনে লিখেছেন, “তাহের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেন নি। তবে ওই দিনই তিনি অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।” এর মাধমে খসরু-মহিউদ্দিন একদিকে ১৫ আগস্টের খুনিদের সাথে তাহেরের স্বতঃপ্রণোদিত বা ‘ প্রোঅ্যাকটিভ’ যোগাযোগ স্থাপনের তথ্য নির্মাণ করতে চান; আর অন্যদিকে ‘যোগাযোগ’ শব্দটিকে ‘কোয়ালিফাই’ না করে বিমূর্তভাবে রেখে কর্নেল তাহেরকে ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত দেখাতে চান নিজেদের হীনস্বার্থে।

কর্নেল তাহের তাঁর সামরিক আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে বলেছেন যে বঙ্গবন্ধু-হত্যার খবর শুনে তিনি ‘যথেষ্ট আঘাত’ পান ও ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন[আমার ধারণা, বিশেষত বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির সামরিক সহযোগিতা বিষয়ক ধারাটির কারণে]। প্রকৃতপক্ষে ১৫ আগস্ট সকালে টেলিফোনে অনেকের অনুরোধ পেয়ে তিনি বেতার ভবনে যেতে রাজি হন। বেতার তখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, তিনি ভাবলেন যে ‘যেয়ে দেখা উচিত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছে’ [এ বিষয়ে আরও আলোচনা করা হয়েছে অধ্যায় ‘বাইশ. কর্নেল তাহেরের পরামর্শে ডালিম সশস্ত্র বাহিনী প্রধানদের বেতারে নিয়ে আসেন?’-এ]। বেতারে যাবার পর তিনি তামাশা দেখার পরিবর্তে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কিছু দরকষাকষি করাকে উপযুক্ত মনে করলেন। তাঁর এ আচরণ লক্ষ্যভেদে একজন প্রতিভাবান রাজনীতিকের আচরণের মতোই।

একুশ. ইতিহাস গবেষণার মান
যতো দিন যাচ্ছে, ডিসিপ্লিনগুলো নিজেদেরকে ততো বেশি পরিশীলিত করে নিচ্ছে; নিজেদের জন্য কিছু বৈশ্বিক ‘মান’ সেট করে নিচ্ছে। ইতিহাস বিষয়টিও এর বাইরে নয়। এ বিষয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করছি না, কিছুটা আলোচনা করে রেখেছি ‘প্রিপেইড মহিউদ্দিনের ইতিহাস চর্চা’ বিষয়ক অন্য রচনাটিতে। এখানে শুধু এটুকু বলতে চাই যে মহিউদ্দিন ইতিহাস গবেষণার ‘পদ্ধতি’ বিচারে একজন মূর্খ ও গবেষণার ‘নৈতিকতা’ বিচারে একজন অপরাধি।

২০১৭ সালের জুনে প্রথম আলো’র ঈদ সংখ্যায় জনৈক সাইদুর রহমানকে উদ্ধৃত করে প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখছেন যে বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে ‘কর্নেল তাহের তো ইনভল্ভড ছিলই। কর্নেল তাহের থাকলে হাসানুল হক ইনু ওয়াজ ইনভল্ভড। ইনুরে জিজ্ঞাসা করলে আমতা আমতা করে। আর্মির সঙ্গে এরা কিন্তু মোটামুটি ইনভল্ভড ছিল, ডিসটেন্টলি হইলেও। অ্যাকটিভ পার্ট না নিলেও তাদের নলেজে ছিল। আর তাহেরের তো পুরাপুরি সম্মতি ছিল’। কোন তথ্য-প্রমাণহীন এ বক্তব্য উদ্ধৃত করার মানে কী? এ বক্তব্য থেকে কেউ কি কোন উপসংহারে পৌঁছতে পারেন? এ বক্তব্যের অর্থ কী? যখন একবার বলা হচ্ছে ইনভল্ভড ছিল, আবার বলা হচ্ছে মোটামুটি ইনভল্ভড ছিল;একবার বলা হচ্ছে নলেজে ছিল, আবার বলা হচ্ছে পুরোপুরি সম্মতি ছিল। এ জাতীয় ছ্যাবলামি কখনও ইতিহাস গবেষণার উপাদান হতে পারে না! আর ‘লেখক ও গবেষক’ হিসেবে কতোটা নিন্মস্তরের ও কাণ্ডজ্ঞানহীন হলে এরকম অর্থহীন অপলাপকে এন্টারটেইন করা যায় তা মহিউদ্দিনকে না পড়লে কারো জন্য অনুধাবন করা মুশকিল বটে! বিবরণী ও পদ্ধতিগত বিবেচনায় কোনো রচনা কতোটা নিন্মস্তরের ও অগ্রহণযোগ্য হতে পারে শিক্ষার্থীদের তা বোঝানোর জন্য চমৎকার অ্যাকাডেমিক ‘কেইস স্টাডি’ হতে পারে প্রিপেইড মহিউদ্দিনের গবেষণা নামের অপপ্রয়াসগুলো।

একই রচনায় জনৈক ক্যাপ্টেন শচিন কর্মকারকে উদ্ধৃত করে প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখছেন, “বেগ সাহেব এবং শাজাহান উমর দুজনই আমার খুব ঘনিষ্ঠ। সেরনিয়াবাত তখন পানিসম্পদ মন্ত্রী। বেগ সাহেব শাজাহান উমরের সামনে কর্নেল তাহেরকে জিজ্ঞেস করছে (ইতিপূর্বে সেরনিয়াবাত তাহেরের একটি উপকার করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গ টেনে), তাঁকে আপনারা মাইরা ফেললেন? তাহের বললেন, কই, তাঁকে তো মারার কথা না। বেগ সাহেব আমারে বলছে। শাজাহান উমর আমার ঘনিষ্ঠ লোক। বলল, বুঝেছিস, কাদের মারার কথা ১৫ই আগস্ট, তুই (তাহের) তাহলে জানতিস। একেবারে ইনস্ট্যান্ট শাজাহান উমরের উক্তি। আমি বুঝে নিয়েছি যে, তাহের জানত। দে আর পার্ট অব ইট।”

বাংলা প্রবচন আছে ‘গাঁজার নৌকা পাহাড় দিয়া যায়’। এ কথপোকথন কতো তারিখের? প্রিপেইড মহিউদ্দিন উদ্ধৃত শচিণভাষ্যটিখুব নিবিড়ভাবে প্রতিটি শব্দ-বাক্য ধরে ধরে পাঠ করলে বোঝা যায় এ কথপোকথন ১৮ বা ১৯ আগস্ট সকালের। হায়রে কপাল আমার! ফালতু মহিউদ্দিনের উদ্ভট সব কম্পাইলেশন আমাকে স্টাডি করতে হচ্ছে– বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে সেগুলো যাচাই করতে হচ্ছে! প্রিপেইড মহিউদ্দিন জানেন যে ১৫ ও ১৬ আগস্ট কর্নেল তাহের নারায়নগঞ্জ থেকে ঢাকা এসেছিলেন। অন্যত্র প্রিপেইড মহিউদ্দিন তার গল্পে ১৭ আগস্ট তাহের নারায়নগঞ্জের বাসায় ছিলেন বলে জানাচ্ছেন। পঁচাত্তরের ১৭ আগস্ট ছিল রোববার, সরকারি ছুটির দিন।১৮ ও ১৯ তারিখ হলো সোম ও মঙ্গলবার; কর্মদিবস। শচিণভাষ্যের ‘কীভাবে যেন আমাদের মধ্যে একটা কানেকশন হইল’ অনুযায়ী তারা ১৮/১৯ আগস্ট কর্মদিবসে ‘বনানী ওয়াপদা স্টাফ কোয়ার্টারে’ আড্ডা দিলেন! তারা তা দিতেই পারেন! কিন্তু কর্মদিবসের সকালে তাহের নিছক আড্ডার জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় বনানীর ওয়াপদা স্টাফ কোয়ার্টারে এসে তাদের সাথে যোগ দিলেন? এটা বিশ্বাসযোগ্য? অথচ এ দিনগুলোতে কর্নেল তাহের কোন ধরনের রাজনৈতিক মুভ করছিলেন তা পাঁড় আওয়ামী লীগার একজন লেখকের নির্ভরযোগ্য যৌক্তিক স্মৃতিকথা থেকে আমরা খুবই বিস্তারিতভাবে জানতে পারি [এ রচনার পর্ব ১১-এর অধ্যায় উনত্রিশে বর্ণিত হয়েছে]। প্রিপেইড মহিউদ্দিন সেসব তথ্য ব্যবহার করবেন না।সকল প্রাণির পেটে ঘি হজম হয় না তা বাংলা প্রবচনে স্পষ্ট বলা আছে।

১৮ বা উনিশ আগস্ট তাহেরের কি বলার কথা ‘কই, তাঁকে তো মারার কথা না’? ‘কই, তাঁকে তো মারার কথা না’ বাক্যটিতে বাংলা ‘কই’ শব্দটি হচ্ছে প্রশ্নবোধক, এর পেছনে থাকে ‘না-জানা’র বিষয় অথবা ‘প্রথম-শোনা’র বিস্ময়। ১৮ বা ১৯ আগস্ট সকালে কল্পিত এ আলাপ-আলোচনা যখন হচ্ছিল, তখনও কি কর্নেল তাহের কি জানতেন না যে সেরনিয়াবাত মারা গেছেন? অবশ্যই জানতেন। তাহলে কি তাঁর প্রশ্ন করার কথা, ‘কই, তাকে তো মারার কথা না’। প্রিপেইড মহিউদ্দিন অথবা শচিণ অবশ্য চালাকি করে বাকট্যির শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন না দিয়ে ‘দাঁড়িচিহ্ন’ দিয়েছেন; কিন্তু ওখানে দাঁড়িচিহ্ন দিলে যে বাক্যটির কোনো অর্থই প্রতিষ্ঠিত হয়না তা বুঝে উঠতে পারেননি। আর প্রিপেইড মহিউদ্দিনেরও ‘লেখক ও গবেষক’ হবার শখ হয়েছে, অথচ মাতৃভাষার শব্দাবলী, বাক্যে সেসবের ব্যবহার, অর্থ ও দ্যোতনা, ঘটনার স্থান-কাল-পাত্র ক্রস চেক করা– এসব কিছুই বোঝার যোগ্যতা বা সামর্থ্য তার নেই, প্রয়োগ করা তো দূরের কথা! মাছিমারা কেরাণীর মতো যেখানে যা পান, সেগুলো কম্পাইল করে লেখক-গবেষক-ইতিহাসবিদ সাজতে চান! মূর্খ কোথাকার! হাহ্।

আবারও, আরও একটু আছে। প্রিপেইড মহিউদ্দিন শচিনভাষ্যে যে শাজাহান উমরকে আমদানি করলেন, তিনি সেনাবাহিনী ছাড়ার পর বিএনপিতে যোগ দেন, তার জন্ম ১৯৪৭ সালে এবং কর্নেল তাহেরের প্রায় ৯ বছরের ছোট। এ শাজাহান উমরের সাথে কর্নেল তাহেরের তুই-তোকারি সম্পর্ক থাকতে পারে? আসলে প্রিপেইড মহিউদ্দিনের মনোবিকলন চিকিৎসাতেও নিরাময়যোগ্য নয়।

আর হাটে-মাঠে-ঘাটে-শয়নকক্ষে যা কিছু ঘটে তার সব ইতিহাসের উপাদান নয়। অতএব উপরে সাইদুর-শচিণ বর্ণিত ঘটনা দুটো কখনও ইতিহাসের উপাদান হতে পারে না, ইতিহাস গবেষণা পদ্ধতির স্বীকৃত ‘মান’ সে অনুমোদন দেয় না। আধুনিক কালে একজন ইতিহাস গবেষককে জীবিত ও মৃত, এমনকি প্রাচীন ও প্রাগৈতিহাসিক চরিত্রগুলোকেও সুনির্দিষ্ট ও দায়িত্বশীল কঠোর অ্যাকাডেমিক মানদণ্ড অনুসারে বিবেচনা করতে হয়। মহিউদ্দিন তা করবেন না, এটা তার অজ্ঞতাজাত নয়, বরং নোংরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত।প্রিপেইড মহিউদ্দিন হচ্ছেন নর্দমায় প্রবাহিত মনুষ্যবর্জ্য-খেকো নেড়ি-সারমেয়। দীন-হীন-নীচমানসে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে ও দায়দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সে যা কিছু ‘কমপাইল’ করে তা ইতিহাস নয়।

[আগামীকাল পর্ব ৯ এর বিষয়াবলী: বাইশ. কর্নেল তাহেরের পরামর্শে ডালিম সশস্ত্র বাহিনী প্রধানদের বেতারে নিয়ে আসেন? তেইশ. তাহেরের ম্যান্ডেট ও পাঁচ দফা প্রস্তাব]


*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।