বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল তাহের: পর্ব ১০

50

জিয়াউল হক মুক্তা

[জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম এর সম্পর্ক নিয়ে গত সাত বছর ধরে এক কলুষিত অপপ্রচার চলছে দৈনিক প্রথম আলো ও এর সিস্টার কনসার্ন প্রথমা’র কথিত ‘লেখক ও গবেষক’ মহিউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে। গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ক চরম অজ্ঞতা আর নিকৃষ্ট রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির সাথে লেলিহান বাণিজ্যিক স্বার্থের মিশেলে গড়ে ওঠা এ কলুষিত অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে অনেকে চলমান বিএনপি-জামাত-জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনের মঞ্চ ১৪ দলের অংশীদার আওয়ামী লীগ ও জাসদ এর রাজনৈতিক ঐকমত্যকে বানচাল করতে চান। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির ‘প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক’ জিয়াউল হক মুক্তা তৈরি করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল তাহের’ শিরোনামের এ ধারাবাহিক রচনা। আজ প্রকাশিত হলো ১৪ পর্বের এ রচনার পর্ব ১০।]

[গতকালের পর]

চব্বিশ. কর্নেল তাহেরকে ব্যবহার করার ও ক্ষমতার অংশীদার করার ব্যর্থ প্রয়াস
প্রিপেইড মহিউদ্দিনের এক রচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে কর্নেল তাহের ‘বেতার কেন্দ্রে আসার পর মেজর ডালিম ছুটে এসে তাঁকে সালাম করেন এবং বেতারে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করেন’। আর বর্তমান রচনায় আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে গোপন সামরিক আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে কর্নেল তাহের বলেছেন মেজর রশিদ বেতারে তাঁকে আলাদা একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হতে চান কি না। কর্নেল তাহের মেজর ডালিম ও মেজর রশিদের দুটো প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বেতারে কিছু বলতে চাননি, কেননা জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের সাথে তিনি নিজেকে জড়াতে পারেন না, তিনি একটি ক্যু’র সাথে নিজেকে জড়াতে পারেন না। ঠিক একই কারণে কর্নেল তাহের মন্ত্রীত্বও গ্রহণ করেননি।তাঁর আশঙ্কা ছিল খুনিরা তাঁর নাম ব্যবহার করবে, সেজন্য রশিদ কর্তৃক বারবার অনুরোধ করার পরও তিনি এমনকি বঙ্গভবনে মোশতাকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানও বুদ্ধিমত্তার সাথে এড়িয়ে যান। খুনি-মেজরগণ বেতারে ও বঙ্গভবনে কর্নেল তাহেরকে কিচ্ছু পুশ করতে পারেননি, উল্টো তিনিই চেষ্টা করেছেন তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য যতোটুকু সম্ভব ‘পুশ’ করতে।

পরের ঘটনা তাহেরের নিজের মুখ থেকে শোনা যাক। সামরিক আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে কর্নেল তাহের বলছেন, “[বেতারে] খন্দকার মোশতাক আমার সব কথা [তাঁর ৫ দফা প্রস্তাব; এর আগের অধ্যায় ‘তেইশ. তাহেরের ম্যান্ডেট ও পাঁচ দফা প্রস্তাব’ অংশে আলোচিত] মনযোগ দিয়ে শুনলেন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন। রশিদ বারবার জোর দিয়ে বলতে থাকলো যে আমি যেন বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের শপথ গ্রহণের সময় উপস্থিত থাকি।” ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলিতে প্রকাশিত কর্নেল তাহেরের জবানবন্দি থেকে জানা যায় যে তিনি বলছেন, “অ্যাট ইলেভেন-থার্টি আই লেফট বাংলাদেশ বেতার উইথ এ ফিলিং অব ডিপ কনসার্ন। আই সেন্সড দ্যাট সাম আউটসাইড পাওয়ার ওয়াজ ইনভল্ভড ইন দ্য কিলিং অব দি ফাদার অব দ্য নেশন। [সকাল সাড়ে এগারোটায় গভীর উদ্বেগ নিয়ে আমি বাংলাদেশ বেতার ত্যাগ করি। আমি উপলব্ধি করলাম যে জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের সাথে বহিঃশক্তি যুক্ত ছিল।]” [এখানে বলে রাখা ভালো কর্নেল তাহের বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির জনক’ হিসেবে বলছেন।]

কর্নেল তাহের বলছেন, “আমার ধারণাই সত্যে পরিণত হলো– জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে খন্দকার মোশতাক আমার সাথে আলোচিত একটা কথাও উল্লেখ করেননি। দুপুর বেলায় আমি যখন বঙ্গভবনে পৌঁছলাম ততোক্ষণে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি হত্যাকাণ্ডে জড়িত অফিসারদের সাথে আলোচনায় বসি। এদের নেতা ছিল মেজর রশিদ। সেদিন সকালে মোশতাকের কাছে আমি যে প্রস্তাবগুলো রেখেছিলাম, এদের কাছেও সেগুলো পেশ করি। সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগেই যাতে জরুরি ভিত্তিতে সব রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া হয় সে ব্যাপারে আমি আমি বেশ জোর দিয়েছিলাম।”

তাহেরের জবানবন্দির এ প্রাসঙ্গিক অংশের মাঝখানে প্রিপেইড মহিউদ্দিনের একটি রচনা থেকে ডালিমের একটি বক্তব্য শোনা যাক। প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখেছেন, “ডালিমের ভাষ্য অনুযায়ী, বামপন্থি অনেক রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জাসদ চাচ্ছিল একটি বিপ্লবী সরকার [আসলে জাতীয় সরকার] গঠন করে তাদের দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু অভ্যুত্থানকারিরা তাতে সায় দেয়নি। ১৫ আগস্ট সকালে আবু তাহের নিজেই খন্দকার মোশতাক আহমদকে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন।”

ফিরে আসা যাক কর্নেল তাহেরের বক্তব্যে। তিনি বলছেন, “আমাদের আলোচনার শেষের দিকে আলোচনায় যোগ দেয়ার জন্য জেনারেল জিয়াকে ডেকে আনলাম। আমার প্রস্তাবগুলো সবাই সমর্থন করলেন। এ ব্যাপারে সবই একমত হয়েছিলেন যে, সে মুহূর্তে সেটাই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। পরদিন মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ ও মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমানের সাথে আমার অনেকক্ষণ আলাপ হয়। তারাও আমার প্রস্তাবগুলো সঠিক ও গ্রহণীয় মনে করেন।

“কিন্তু ষোলোই আগস্ট আমি বুঝতে পারলাম মেজর রশিদ ও মেজর ফারুক শুধু আমার নামটিই ব্যবহার করেছে, যাতে তাদের নেতৃত্বাধীন সিপাহীরা এই ধারণা পায় যে আমি তাদের সাথে রয়েছি। পরদিন ১৭ আগস্ট এটা পরিষ্কার হয়ে গেলো যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান এই ঘটনার নেপথ্য নায়ক। আমি আরও বুঝতে পালাম যে, এর পেছনে খন্দকার মোশতাকসহ আওয়ামী লীগের উপরের তলার একটা অংশও সরাসরি জড়িত। এই চক্র অনেক আগেই যে তাদের কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছিল সেটাও আর গোপন রইলো না। সেদিন থেকেই আমি বঙ্গভবনে যাওয়া বন্ধ করি ও এই চক্রের সাথে সব যোগাযোগ ছিন্ন করি।”

তাহেরের এ বক্তব্য থেকে আবারও আরও একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে ১৫ আগস্ট সম্পর্কে আগে থেকে তিনি কিছু জানতেন না; এটা যে কতিপয় অফিসার কর্তৃক জাতির জনককে হত্যা করার সাধারণ একটি ক্যু নয়, এদের পেছনে যে সুনির্দিষ্ট রাজনীতি রয়েছে আর পাক-মার্কিনআদর্শ যে এ ক্যু’র রাজনীতি– ১৭ আগস্ট তা সুনিশ্চিত হওয়া মাত্রই তিনি এদেরকে তাঁর প্রস্তাবগুলো দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা বন্ধ করেন ।

পঁচিশ. মোশতাকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কর্নেল তাহের?
এখানে প্রিপেইড মহিউদ্দিনের আরেকটি ছলচাতুরির কথা বলা যায়। প্রথমা প্রকাশিত ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইটির কাটতি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে পাণ্ডুলিপি থেকে চটকদার অংশগুলো দৈনিক প্রথম আলো’য় ছাপানো হয় ২০১৪ সালের ১২ থেকে ১৪ আগস্ট। পরে ২১ আগস্ট প্রথম আলোতে এগুলোর ওপর ড. মো. আনোয়ার হোসেনের একটি প্রতিক্রিয়া ছাপানো হলে প্রিপেইড মহিউদ্দিন ২৪ আগস্ট তার জবাবে কী সব আগডুম-বাগডুম বলে তারপর লেখেন, “শুধু একটি বিষয় আমি নিশ্চিত হতে পারিনি। আমি লিখেছিলাম, ‘সন্ধ্যায় খন্দকার মোশতাক আহমদ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাহের উপস্থিত ছিলেন।’”

২০১৪ সালের অক্টোবরে বাজারে এল প্রিপেইড মহিউদ্দিনের উল্লিখিত বই। তার আগে আগস্ট মাসে পাণ্ডুলিপি থেকে পত্রিকায় চটকদার অংশ ছাপানো হলো। প্রকাশিত বইয়ে তথ্যসূত্র হিসেবে লরেন্স লিফসুলৎসের ‘বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রেভুল্যুশন’ বইটির নামও দেয়া হলো। অথচ দেখা গেল ড. আনোয়ার হোসেনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের আগে প্রিপেইড মহিউদ্দিন অবলীলায় লিখে দিয়েছিলেন যে খন্দকার মোশতাকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছিল সন্ধ্যায় এবং কর্নেল তাহের সেখানে উপস্থিত ছিলেন; যদিও লিফস্যুলৎসের বইয়ে স্পষ্ট বলা আছে কখন-কোথায় শপথ হয়েছিল, কর্নেল তাহের সেখানে ছিলেন কি ছিলেন না, আর সন্ধ্যায় কর্নেল তাহের কোথায় কী করছিলেন। লিফস্যুলৎসের বইয়ের রেফারেন্স দিচ্ছেন, আর একই সাথে বলছেন যে তিনি ‘নিশ্চিত হতে’ পারেননি– এর অর্থ কী? তার মানে কি এই যে লিফস্যুলৎসের বইয়ের প্রাসঙ্গিক অংশটুকু পড়ার সময় মহিউদ্দিনের চোখে ছানি পড়ে গিয়েছিল অথবা তিনি সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন? নাকি পড়েও তথ্যটি লুকিয়ে ফেলেছিলেন পাঠকদের প্রতারিত করতে আর নিজের মন মতো বিকৃত ইতিহাস রচনা করতে? নাকি লিফস্যুলৎসের বইটি না পড়েই ‘গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র’তে সেটির নাম দিয়ে দিয়েছিলেন পাঠককে নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করতে?

বলা বাহুল্য, বেয়াদব প্রিপেইড মহিউদ্দিন কর্নেল তাহেরকে কালিমালিপ্ত করার কৃতকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন নি, ক্ষমা চাননি তার বইয়ের পাঠকের কাছে, আর ক্ষমা চাননি তাহেরের পরিবার-পরিজন-সহযোদ্ধাদের কাছে। এর পরে অবশ্য তিনি এটা তার বইয়ে সংশোধন করে নিয়েছেন। কিন্তু এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় মহিউদ্দিনের মনোভাব– চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ি ধরা।

ছাব্বিশ. ‘উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া?’
প্রিপেইড মহিউদ্দিন লিখছেন, “[১৫ আগস্টের] দুই দিন পর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীর নারায়নগঞ্জে তাহেরের বাসায় যান পরিস্থিতি সম্পর্কে আঁচ করতে। ১৯৭১ সালে নঈম ১১ নম্বর সেক্টরে তাহেরের সহযোদ্ধা ছিলেন এবং প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেন। তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া।”

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীরের বয়স ১৯৭১ সালে কতো ছিল এবং নঈম ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের ‘কমান্ডার’-এর ‘সহযোদ্ধা’ হন কী করে? হ্যাঁ, শ্রেণিহীন সেনাবাহিনীর বা জনযুদ্ধের গণবাহিনীর ধারণা থেকে তারা দু’জন সহযোদ্ধা; কিন্তু সেখানেও কিছু শৃঙ্খলা ও বিন্যাস আছে। মহিউদ্দিন নিজ ভাষিক-আচরণে তাহেরের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচকতা প্রদর্শন করেছেন সকল সময়; সেজন্যই তিনি নঈমকে তাহেরের ‘সহযোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করতে আর নঈমের [কথিত/অকথিত] ভাষ্যকে উর্ধে তুলে ধরতে আর কর্নেল তাহেরকে খলনায়ক হিসেবে দেখাতে। প্রিপেইড মহিউদ্দিন তার ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইটিতে একটিবারের জন্যও ‘শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম’ নামটি পুরোটা লেখেন নি; তাঁর নামের সাথে তাঁর অর্জিত সাহসিকতার সর্বোচ্চ খেতাব ‘বীরউত্তম’ ব্যবহার করেন নি; এবং তাঁর পুরো পরিচয় দেন নি। এতটাই দীন ও গরিবমানস এ বেয়াদব প্রিপেইড মহিউদ্দিন!

বঙ্গবন্ধুর লাশ বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া প্রসঙ্গে আসা যাক। তাহেরের অনুজ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান ১৯৭৫ সালের ১৭ আগস্ট তিনি তাহেরের সাথেই ছিলেন। তিনি বলেন, “নঈম জাহাঙ্গীর নামের কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে তাহের ভাইয়ের বাসায় কখনও দেখি নি। খবর নিয়ে জানলাম, বিভিন্ন সময়ে বিএনপি এবং নানা সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। আমার ভাবী সংসদ সদস্য লুৎফা তাহেরও তার কথা কিছুই জানেন না। সর্বোপরি আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সাংসদ ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীর প্রতীক প্রথম আলোর সংবাদ পড়ে মোবাইল ফোনে তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে নঈমও বলেন এসব ‘লুজ টক’। বিশদ কিছু না বলে তিনি ফোন কেটে দেন।”

কর্নেল তাহের যাঁকে ‘জাতির জনক’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ বলেন, তাঁর লাশ তিনি বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়ার কথা বলতে পারেন না। এসব প্রিপেইডের ফরমায়েশি আবিষ্কার।

সাতাশ. এক কান কাটা ও দুই কান কাটা
ধরা পড়ে যাওয়া একজন ভীত-সন্ত্রস্ত অপরাধী যখন কৃত্রিমভাবে সাহসিকতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেন– তখন তাকে দেখতে কতোটা কার্টুন-কার্টুন হাস্যকর লাগে সেটা অনুমান করে নিলে বর্তমান রচনার এ অংশের আলোচনাটি উপভোগ্য হতে পারে। ২০২০ সালের ১৮ জুলাই একটি ফেইসবুক পোস্টে প্রিপেইড মহিউদ্দিন তার পিঠ-চামড়া বাঁচাতে নিজের অনুসৃত ইতিহাসের গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে কিছু শিবের গীত গেয়েছেন; সেসব অন্য লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানকার প্রসঙ্গ অল্প।

পোস্টটিতে তিনি বলেছেন, “যখন এ নিয়ে [সাক্ষাৎকার গ্রহণ বিষয়ে] নিয়ে দু-একজন ঢিল ছোঁড়া শুরু করল, তখন ভয় পেয়ে গেলাম, পাছে তারা কেউ অস্বীকার করেন যে তিনি এ কথা বলেন নি। আমার সৌভাগ্য, তাঁরা কেউ অস্বীকার করেননি।”

মহিউদ্দিন এখানে ডাহা মিথ্যা কথা বলছেন। বর্তমান রচনার অধ্যায় উনিশ ও অধ্যায় ছাব্বিশে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ ও আলোচনা করা হয়েছে যে যথাক্রমে আবুল হাসিব খান ও নঈম জাহাঙ্গীর তাদের সাথে মহিউদ্দিনের কথাবার্তাকে ‘লুজ টক’ বলেছেন। হাসিব খান এমনকি এও বলেছেন যে সামাজিক আড্ডায় আকস্মিক দেখা ও সে সূত্রেই তাদের কথাবার্তা; দেখা হওয়াটি পরিকল্পিত ছিল না। এসব তথ্য প্রিপেইড মহিউদ্দিনের নিয়োগদাতা মতিউর রহমানের প্রথম আলো পত্রিকায় [ও বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম-এ] প্রকাশের পরও মহিউদ্দিন তার পোস্টে নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করে বলেন যে ‘আমার সৌভাগ্য, তাঁরা কেউ অস্বীকার করেন নি’। বলে রাখা ভালো আবুল হাসিব খান ও নঈম জাহাঙ্গীরের মতো আরও অনেকে আছেন– মহিউদ্দিন যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন ও তার বইয়ের পরিশিষ্টে উল্লেখ করেছেন– যারা মহিউদ্দিনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন তাদেরকে তথ্যদাতা হিসেবে প্রকাশ করে বিকৃত তথ্য দেয়ায়। ফলশ্রুতিতে প্রিপেইড মহিউদ্দিনকে এখন ঢাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদি থেকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হওয়া এড়াতে।

সে যাক। প্রসঙ্গ হলো– বাংলায় একটি প্রবচন আছে– যার এক কান কাটা সে যায় রাস্তার এক সাইড দিয়ে, আর যার দু’কান কাটা সে চলে রাস্তার মাঝখান দিয়ে। প্রিপেইড মহিউদ্দিন এতটাই নির্লজ্জ যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত রচনার মাধ্যমে তার মিথ্যাচারিতা প্রকাশ করে দেয়ার পরও ফেইসবুক পোস্টে তিনি অবলীলায় মন্তব্য করেন ‘আমার সৌভাগ্য, তাঁরা কেউ অস্বীকার করেন নি’। বেহায়া কোথাকার!

[আগামীকাল পর্ব ১১ এর বিষয়াবলী: আটাশ. একটি লিফলেট ও একটি বিবৃতি; উনত্রিশ. সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রস্তাব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।