ফেলে আসা দিনগুলিঃ ২ পর্ব

23

সাইফুল ইসলাম শিশির: ছোট বেলায় শুনেছি ‘আশ্বিন গা করে শিন শিন।’ শরৎ এর শেষে হেমন্তের আগমন। গ্রামীণ জীবনে ঋতু বৈচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মাঠ থেকে পানি নেমে গেছে। বিরানভূমি দু’এক জায়গায় মরা কলা গাছ- কলার ডাগর, খড়কুটো, কচুরি পানা স্তুপ হয়ে আছে।
উপর্যুপরি বন্যায় ধানের চারা পচে মাটির উপর নেতিয়ে আছে। যে আশা নিয়ে চারা রোপণ করতে নেমেছিল কৃষক। বন্যার শেষ আঁচড়ে ভাগ্যাহত কৃষক জমি ছেড়ে উঠে গেছে সেই কবে। চারার মুঠি গুলো হরিদ্রাভ হয়ে আছে। আইলের উপর নতুন করে শিকড় গজিয়েছে। দু’একটা সবুজ পাতা জীবনের জানান দিচ্ছে।
ভোর হলে দূর থেকে মহালয়া,শারদীয় উৎসব, ঢাক- ঢোলের আওয়াজ কানে ভেসে আসে। কদিন আগে থেকেই মরাখালে নৌকা ঠেকে আছে। নদীর দাড়া জাগছে। আর দুএক সপ্তাহ হয়ত খেয়া নৌকা পারাপার করবে। তার পরেই ঘাট অঘাট হবে। থেমে যাবে হাঁকডাক- থেমে যাবে জীবনের সব কোলাহল।
সামনে মরা কার্তিক। কলেরা- ডাইরিয়ার ভয়ে শংকিত মানুষ। গ্রাম্য প্রবাদ আছে ‘কার্তিকটা পার করতে পারলে একবছর বেঁচে গেলাম।’ এসময়টা ধূপধূণা- দোয়া- দরুদ পড়া বেড়ে যায়। নানা কুসংস্কার এসে ভর করে।
সাঁজবেলা পেরিয়ে গেছে। কোরপ শেখের বৌ কাচারি ঘরের সামনে বসে আছে। আয়নাল এখনো হাট থেকে ফিরেনি। তাকে সে মিলাদের জন্য জিলাপি কিনতে দিয়েছে।
মাথায় ডালি নিয়ে আয়নাল বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ তার মনে হয় কাল মিলাদে থাকতে পারি কিনা। আমার ভাগের দু’খানা জিলাপি তো খেয়ে নেই। মাথার উপর ডালি হাতড়ে দু’খানা জিলাপি বের করে। আর খাবনা- এবারই শেষ। এভাবে সারা পথে সে দুএকখানা করে মুখে ভরে আর নিয়ত করে আর খাবনা। বাড়ির কাছে এসে ডালিতে আবারও হাত দেয়। কিন্তু একি! জিলাপি গেল কই?
কোরপ শেখের বৌকে সে কোন মতো ভুতের গল্প বলে ছাবেদ বুঝ দেয়। তখন মানুষ বিশ্বাস করত, মহামারির সময় রোগ- ব্যাধি নানা রূপ ধারণ করে গ্রামে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ইলিশ মাছ, পাকা কলা, মিষ্টির হাড়ি- পোটলার সাথে সম্পর্ক আছে। আয়নালের কথায় বিশ্বাস করে কোরপ শেখের বৌ। কুপিবাতি নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। অথচ কোরপ- বৌ ভীষণ কিপ্টে। কানাকড়ি ছাড় দেবার মানুষ সে নয়।
মধ্য বাড়ির বাহেজ মণ্ডলের কথা মনে পড়ে। দীর্ঘদেহী খেটে খাওয়া এক পরিশ্রমি মানুষের মুখচ্ছবি। তাল গাছের মতো লম্বা- সুপুরুষ। শুনেছি আড়াইমনি বস্তা নিয়ে গড়ান বেয়ে উঠতে গিয়ে সে কোমরে ব্যথা পেয়েছিল। একটু ঝুকে হাঁটে। সেই থেকে আড়ালে আবডালে অনেকে তাকে ‘বাঁকা বাহেজ’ বলে ডাকে। তাতে সে খুব একটা গা করে না। তবে একদিন একজন “বাঁকা চাচা” বলতেই – “ক্যারে বা! তোমার বাপ না হয় বলতে পারে, তাই বলে তুমিও? —-।” বড্ড মাটির মানুষ ছিলেন বাহেজ চাচা।
আমার বয়স তখন ৫/৬ বছর হবে। একদিন তিনি হঠাৎ করে আমাকে ধরে মাথার উপর তুলে নাভিতে মাথা দিয়ে শুড়শুড়ি দিতে থাকেন। আমি প্রথমে ভয়- পরে খিলখিল করে হেসে উঠি। বাহেজ চাচাও হাসতে হাসতে বলে, “হাসে রে কান্দে রে, গুয়ের টোপলা বান্দে রে।” আমি তখন নিচে নামার জন্য ছটফট করি।
“ক্যারে বা ডাক্তারের বেটা! তোমার মা কি ভালো করে খেতে দেয়না? এত শুকনা ক্যা ? আড়ে নাড়ে বাতাসে উড়ে–।”
একবার ভরা বর্ষায় বাড়ির সামনে ধানের নৌকা ডুবে যায়। প্রচন্ড খরস্রোত অথৈ পানি। ১৫- ২০ হাত গভীর তার উপর ঘুর্ণি স্রোত। নৌকা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ডাক পড়ে বাহেজ মণ্ডলের। লম্বা লগি নামিয়ে দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৌকার অবস্থান নিশ্চিত হতে চায় বাহেজ মণ্ডল। এক মাইল ভাটি পর্যন্ত দড়িতে ইট বেঁধে টানতে থাকে সারাবেলা। নাহ! কোন খোঁজ নেই। বাড়ির সামনে লাইন ধরে বসে মানুষ তা দেখছে। দেরি হলে পলি জমে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাবে। তখন আর নৌকা তোলা সম্ভব হবে না।
পরদিন গায়ে-পায়ে সরিষার তেল মেখে বাহেজ মণ্ডলের সাথে পাঁচু মণ্ডল, মাকড় ফজেল, ফরজ মণ্ডল পানিতে নামে। অনেক ভাটিতে গিয়ে নৌকার খোঁজ পায়। কপি কল লাগিয়ে কয়েক বস্তা ধান পাড়ে টেনে তোলে। অন্যরা ডুব দিয়ে নৌকার কাছে পৌঁছানোর আগেই তারা ভেসে উঠে। ছেলেরা চিৎকার করে ধুয়ো ধ্বনি দেয়।
বাহেজ মণ্ডল মোটা দড়ি- কাছি নিয়ে ডুব দেয়। শুশুক এর মতো ভেসে ওঠে। মুখ দিয়ে পানি ছাড়ে। “এবার দড়ি ধরে মার টান –।” ঐ বলরে বলো হাঁইয়ো– জোরছে বলো হাঁইয়ো — উঠেই যাবে হাঁইয়ো।
সে বার দেখেছি বাহেজ চাচা দেখতে যেমন বিশাল, তেমনি গায়ে পায়ে তার অসুরের মতো শক্তি। সর্বোপরি অসীম সাহস। সে খেতেও পারে প্রচুর। শুধু মিষ্টি আলু ধামা ধরে খেয়ে ফেলতে পারে। গামলাকে গামলা ভাত সে এক নিমিষে সাবাড় করে ফেলে।
বাড়ির সীমানা নিয়ে পাঁচ কড়ি মণ্ডলের সাথে তার বিরোধ ছিল। পাঁচু মণ্ডল প্রায়শই সীমানা ঠেলে। বাহেজ চাচা বাড়ি এলে চাচি নালিশ দেয়। এর একটা বিহিত ব্যবস্থা আজ তোমাকে করতেই হবে। বাহেজ মণ্ডল হাসে।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো করে চাচিকে বুঝায়, বাপে তার নাম রেখেছে পাঁচ কড়ি। তার বুদ্ধি বিবেচনা তো পাঁচ কড়ির বেশি, ছয় কড়ি হবেনা। পাঁচ কড়ি থেকে তিন কড়ি- তিন কড়ি থেকে সে এখন কানা কড়ি। সীমানা ঠেললেই বা কী, আর পা দিয়ে জাল ঠেললেই বা কী। নির্ঝঞ্ঝাট নিরীহ মানুষ বাহেজ মণ্ডল। কোন গোণ্ডগোলে সে জড়াতে চায় না।
মিষ্টি খাওয়ার প্রতি ছিল তার বিশেষ দুর্বলতা। কাজের জন্য কেউ ডাকলে সে বলতো “মাগনা কামলা দিতে চাই। দুখানা তেলের পিঠা আর আউস চালের সাথে ঝোলা গুড়ের ঘ্যাগা নাস্তা- একটু গরুর মাংসের পিটুলি — ব্যস!”
খাওয়ার শেষে — “ভাবি, আমিতো খাইলাম, ফরজের মা খাইব কী?” বাহেজ মণ্ডল কলার পাতায় তেলের পিঠা, ঘ্যাগা নাস্তা, গরুর গোস্তো- পিটুলি গামছায় বেধে বাড়ি ফেরে। বাড়িতে ঢুকেই “ও ফরজের মা! দেখ তোমার জন্য গরুর গোস্ত- পিটুলি আনছি।”-লেখক: একজন সমাজকর্মী।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, উত্তর ধানমন্ডি

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।