ফরাসি বিপ্লব সূচনার ২৩৩ বছর

সৈয়দ আমিরুজ্জামান:

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯–১৭৯৯) ফরাসি, ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং একই সাথে দেশের রোমান ক্যাথলিক চার্চ সকল গোঁড়ামী ত্যাগ করে নিজেকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়। ফরাসি বিপ্লবকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি জটিল সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা নিরঙ্কুশ রাজনীতি এবং অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকত্বের যুগে পদার্পণ করে।

ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল “স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, অথবা মৃত্যু”। এই শ্লোগানটিই বিপ্লবের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিলো যার মাধ্যমে সামরিক এবং অহিংস উভয়বিধ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শ্লোগানটি তখন সকল কর্মীর প্রাণের কথায় পরিণত হয়েছিলো।

ফরাসি বিপ্লবের কারণ

ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক প্রকৃতিকে ইতিহাসবিদরা স্বীকার করেননা। কারণ সম্বন্ধে একটি ধারণায় বলা হয়: অ্যানসিয়েন সরকারের প্রাচীন অভিজাত নীতি ও আইনসমূহ একটি উদীয়মান বুর্জোয়াতন্ত্রের উচ্চাভিলাষের খোরাক যোগাতে শুরু করে যা আলোকসম্পাতের দ্বারা ছিলো ব্যাপকভাবে আক্রান্ত। এই বুর্জোয়ারা শহরের বিশেষত প্যারিস এবং লিওনের চাকুরিজীবী এবং অত্যাচারিত চাষী শ্রেণির সাথে মিত্রতা সৃষ্টি করে। আরেকটি ধারণা অনুসারে অনেক বুর্জোয়া এবং অভিজাত মহল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের চেষ্টা করতে থাকে যা পরবর্তীতে চাকুরিজীবী শ্রেণির আন্দোলনগুলোর সাথে একাত্ম হয়ে যায়। এর সাথে এক হয় প্রাদেশিক চাষীদের আন্দোলন। এই ধারণা অনুসারে তাদের মধ্যে কোন মেলবন্ধন কেবল ঘটনাক্রমে হয়েছে, তা পরিকল্পিত ছিলোনা।

যে ধারণাকেই ধরা হোক না কেন, অ্যানসিয়েন সরকারের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিলো যা বিপ্লবের মূল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। একদিক দিয়ে সেগুলো ছিলো অর্থনৈতিক কারণ:

নিম্নমানের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং বল্গাহীন জাতীয় ঋণ। এর মূল কারণ ছিল অসম করারোপণ যার বোঝা মোটেই বহনযোগ্য ছিলনা, সম্রাট লুই ১৬-এর অত্যধিক খরচ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধসমূহ।
বেকারত্বের উচ্চহার এবং খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য।
বিপ্লবের ঠিক আগের মাসগুলোতে বিরাজমান খাদ্য সংকট।

অপর দিকে এর পিছনে কিছু সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণ ছিল। আলোকিত সমাজ এই কারণগুলোকে কেন্দ্র করেই তাদের আন্দোলন শুরু করে যারা ছিল আলোকসম্পাতের যুগ দ্বারা প্রভাবিত। এই কারণগুলো হল:

নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের পুনঃস্থাপন যা রাজত্বের পক্ষে ছিল ক্ষতিকর।
সমাজের একটি বিশেষ পেশাদার শ্রেণি এবং উঁচুশ্রেণির লোকদের ব্যাপক সুবিধা দেয়া হচ্ছিলো যা জনসাধারণের জীবনকে নিজের প্রভাবাধীনে রাখতে শুরু করেছিলো।
কৃষক, চাকুরিজীবী শ্রেণি এবং কিছু পরিমাণ বুর্জোয়া কর্তৃক জমিদারতন্ত্রের উচ্ছেদের পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়।
বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য, যাজকশ্রেণির ভোগ-বিলাস চরমে উঠে। অপরদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একটি জোয়ার সৃষ্টি হয়।
স্বাধীনতা এবং প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অনুপ্রেরণা।

সবশেষে যে কারণ সম্বন্ধে বলতে হয় তা হল এই সমস্যাগুলোর যেকোনটির সমাধানে সম্রাট লুই ১৬-এর চূড়ান্ত ব্যর্থতা।

রাজকীয় অর্থ সংকট

ফ্রান্সের সম্রাট লুই ১৬ (রাজত্বকাল: ১৭৭৪ – ১৭৯২) যখন রাজকীয় অর্থের সংকটে পড়েন তখনই বৈপ্লবিক সংকটকাল শুরু হয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বলতে হয় ফরাসি রাজের শোধক্ষমতা (solvency) ছিল ফরাসি রাষ্ট্রের শোধক্ষমতার সমমানের। ফরাসি রাজ বিপুল পরিমাণ ঋণের ফাঁদে পড়েছিলো যা তদানীন্তন অর্থ সংকটের সৃষ্টি করে।

লুই ১৫ (রাজত্বকাল: ১৭১৫ – ১৭৭৪) এবং লুই ১৬-এর শাসনকালে মূলত অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত রাজকীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য গৃহীত হয়েছিলো। মন্ত্রীদের মধ্যে মূল হিসেবে বলা যায় Baron de Laune Anne Robert Jacques Turgot (অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রক: ১৭৭৪ – ১৭৭৬) এবং জ্যাক নেকারের (অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রক: ১৭৭৭ – ১৭৮১) নাম। তারা বারবার অর্থ সমস্যার সমাধানের জন্য ফরাসি করারোপণ পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করেন যা কোন সফলতার মুখ দেখেনি। আর এ ধরনের উদ্যোগ সংসদ থেকে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। সংসদ তখন ছিলো Robe Nobility-দের করায়ত্তে যারা নিজেদেরকে জাতির অভিভাবক জ্ঞান করতেন। এর ফলশ্রুতিতে দুজন মন্ত্রীই পদচ্যুত হন। চার্লস আলেকজান্ডার দ্য ক্যালোঁ, যিনি ১৭৮৩ সালে অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পান, বিশিষ্ট ব্যয়সমূহের জন্য একটি নতুন নীতিমালা হাতে নেন যার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতাদের বুঝানোর চেষ্টা চালান।

রাজ্যসভা

জুন ১০, ১৭৮৯ তারিখে Abbé Sieyès প্রস্তাব করে যে তৃতীয় এস্টেট তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে এগুবে এবং অন্য দুইটি এস্টেটকে আমন্ত্রণ জানাবে, কিন্তু উক্ত এস্টেটদ্বয় তৃতীয় এস্টেটের জন্য অপেক্ষা করবেনা।

বাস্তিল দুর্গ

রাজপ্রাসাদের বিলাস ব্যসন ও রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ফরাসি জনগণকে রাজতন্ত্রের প্রতি ক্রমেই বিদ্বিষ্ট করে তুলছিল। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ ছিল বিলাস ব্যসন ও ঐশ্বর্যের ইন্দ্রপুরী। ১৮ হাজার কর্মচারী রাজপরিবারের সেবায় সদাসর্বদা নিযুক্ত থাকত এবং সভাসদদের মধ্যে কোটি কোটি মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হতো।

একটি হিসাব থেকে জানা যায়, ১৭৮৯ সালে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে বিলাসী কর্মকাণ্ডে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। রাজা, রানি ও তাঁদের সন্তান-সন্ততি এবং অগণিত আত্মীয়স্বজন সবার জন্য পৃথক পৃথক সুরম্য অট্টালিকা ছিল। এক হিসাবে রানি মেরি অ্যান্টয়নেটের নিজস্ব সহচরীসংখ্যা ছিল ৫০০। রাজা, রানি, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকত।

এসব বিষয় ফরাসি জনগণের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। এতে রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়। অবস্থা এমন হয়েছিল যে ৫ অক্টোবর প্যারিস থেকে মহিলাদের ভুখামিছিল বা হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন ভার্সাই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায়।

তখন রানি মেরি অ্যান্টয়নেট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তাঁর সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানি অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস ব্যসনে জীবনযাপন করে রানি অ্যান্টয়নেট নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি।

ফ্রান্সের সমাজ প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যেমন-সুবিধাভোগী শ্রেণি ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি। অভিজাত সম্প্রদায় ও যাজক সম্প্রদায় প্রথম শ্রেণিভুক্ত ছিল। যাজক সম্প্রদায়কে ফার্স্ট এস্টেট ও অভিজাত সম্প্রদায়কে সেকেন্ড এস্টেট বলা হতো। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ জনগণ ছিল সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি, তাদের বলা হতো থার্ড এস্টেট।

যাজকদের নিজস্ব প্রাসাদ, দুর্গ ও গির্জা ছিল। যাজকদের দুর্নীতি ও ধর্মীয় অনাচার লক্ষ করে রাজা ষোড়শ লুই নিজে একসময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, অন্তত একজন আর্চবিশপকে চাই, যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। তাঁর ভাষায়-লেট আস অ্যাটলিস্ট হ্যাভ এ আর্চবিশপ অব প্যারিস, হু বিলিভস ইন গড।

ফরাসি সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণি ছিল অভিজাত সম্প্রদায়। তারা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্রের করভার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। দরবারি অভিজাতরা বৃত্তি, পুরস্কার ও পেনশন ভোগ করত। অভিজাতদের শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধা, ভোগ-বিলাস এবং কৃষকদের ওপর শোষণ ও নিষ্পেষণে প্রকৃতপক্ষে ফরাসি সমাজে শ্রেণিসংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে, যা সর্বাত্মক বিপ্লবের পরিণতি লাভ করে।

বিপ্লব শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ফরাসিদের মনোজগতে পরিবর্তন শুরু হয়। আঠারো শতকের শেষভাগে ফ্রান্সে এমন কয়েকজন দার্শনিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তানায়কের আবির্ভাব হয়, যাঁদের অবদানে মধ্যযুগীয় সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। চিন্তানায়কদের পুরোভাগে ছিলেন মন্টেস্কু। দীর্ঘ ২০ বছর পরিশ্রম করে তিনি ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন।

আরেকজন দার্শনিক ছিলেন ভলতেয়ার। ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ভলতেয়ার লিখলেন-দ্য পেন ইজ মাইটার দ্যান দ্য সোর্ড-অর্থাৎ অসির চেয়ে মসি বেশি শক্তিশালী। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্সের শোষণনীতি, চার্চের গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের তীব্র নিন্দা করেন।

স্বাধীনচেতা ভলতেয়ার সোজাসাপ্টা ভাষায় তাঁর মত প্রকাশ করে ফরাসি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি লিখলেন-তুমি যা বলছ তা আমি অস্বীকার করতে পারি; কিন্তু আমি আমার মৃত্যু দিয়ে হলেও এ কথা প্রতিষ্ঠা করব যে তোমার বলার অধিকার আছে। কেউ কেউ তাঁকে মানবজাতির বিবেক আখ্যা দিয়েছেন।

রাজা সাধারণ মানুষের ওপর দমননীতি শুরু করেন। রাজকীয় বাহিনী অতর্কিত হামলার প্রস্তুতি নেয়। জার্মান ও সুইস সৈন্যদের ভার্সাইয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাজার এই দমননীতির বিরোধিতা করে তৃতীয় শ্রেণির সমর্থক সাধারণ জনতা ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্রাচীন যুগের অত্যাচারের প্রতীক বাস্তিল কারাদুর্গ আক্রমণ করে বন্দিদের মুক্ত করে আনে। রাজকীয় শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য লাফায়েতের নেতৃত্বে জাতীয় গার্ডবাহিনী গঠন করা হয়।

জাতীয় পরিষদ ২৭ আগস্ট ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। যেখানে মানুষের স্বাধীনতা, বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, অবাধ গ্রেপ্তারের অবসান, বিবেকের স্বাধীনতা, আইন মানে জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ, সার্বভৌমত্ব জাতির ওপর ন্যস্ত-এ সব কিছু ম্যাগনাকার্টা হিসেবে ঘোষিত হয়।

সংবিধানের বিরোধিতা ও দেশদ্রোহের কারণে ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি রাজা ষোড়শ লুইকে এবং পরে রানি মেরিকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয়। তারপরও ফরাসি বিপ্লবের গতি থেমে যায়নি। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। শুরু হয় আরেক যুগ, যা শুধু নেপোলিয়ন বোনাপার্টের।

-লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।