প্রবীর সিকদার মুক্ত

জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায়সহ পুরো দেশবাসীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সাংবাদিক প্রবীর সিকদার। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সন্ত্রাসী হামলায় পঙ্গু এই সাংবাদিক বলেছেন, ‘দেশবাসীকে স্যালুট’।

বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুর একটা ৪৭ মিনিটে ফরিদপুর জেলা কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন প্রবীর সিকদার। এর পরই জেলগেটে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বাংলানিউজসহ সমস্ত গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তার মুক্তিতে ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান প্রবীর সিকদার।

প্রবীর বলেন, আমাকে গ্রেফতারের পর সারা দেশে মুক্তির দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছে তা ছিল আমার প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন। এজন্য সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী, বিভিন্ন সাংবাদিক ও অন্য পেশাজীবী সংগঠন, গণজাগরণ মঞ্চসহ সমগ্র দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের একজন হিসেবে তার প্রতি সহানুভূতি-সহমর্মিতা দেখিয়ে দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রবীর সিকদার। আইনজীবীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।

জেলগেটে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের স্ত্রী অনিতা সিকদার ও ছোট ছেলে পুলক সিকদার। অনিতা সিকদার বাংলানিউজকে বলেন, আমি ও আমার পরিবার সবার কাছে ঋণী। সকালে আমার স্বামীকে রিমান্ডে নেওয়ার খবরে এসেছিলাম। পরে জানতে পারি, তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। এরপর খুব দ্রুততার সঙ্গে তার জামিন ও কারাগার থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

স্বামীর জামিনে মুক্তি প্রাপ্তিতে আইনজীবী, গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীসহ সারা দেশের মানুষ নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন বলে উল্লেখ করে তিনিও সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

স্বামীর অসুস্থতার দিকটি তুলে ধরে তার ও পরিবারের জন্য দোয়াও চান অনিতা সিকদার।

জেলগেটে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও প্রবীরকে স্বাগত জানান তার গ্রামের বাড়ি কানাইপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং তার প্রতিষ্ঠিত কিশলয় বিদ্যানিকেতন ও বেগম রোকেয়া বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা।

এদিকে মুক্তির পর ফরিদপুর প্রেসক্লাবে যান প্রবীর সিকদার। এরপর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কানাইপুরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

এর আগে দুপুরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে (আইসিটি) ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় জামিন পান সাংবাদিক প্রবীর সিকদার। তার জামিন মঞ্জুর করেন ফরিদপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১নং আমলি আদালতের বিচারক হামিদুল ইসলাম। এরপর আইনজীবীরা জামিনের কাগজপত্র নিয়ে জেলা কারাগারে যান। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে প্রবীর সিকদারকে জামিনে মুক্তি দেন কারা কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন একই আদালত।

রিমান্ডে নেওয়ার জন্য বুধবার সকালে ফরিদপুর জেলা কারাগার থেকে কোতোয়ালি থানায় নেওয়া হয় প্রবীর সিকদারকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের একই আদালতে হাজির করা হয় তাকে। তবে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিরাজুর রহমান আদালতকে জানান, তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হলেও একদিনেই জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। রিমান্ডের আর প্রয়োজন নেই।

এরপর প্রবীর সিকদারের জামিনের আবেদন জানান তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলী আশরাফ নান্নু। শুনানি শেষে পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় আগামী ২২ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন পর্যন্ত প্রবীর সিকদারের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট অনিমেষ রায় বাংলানিউজকে জানান, আমরা মানবিক কারণে জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করিনি।

রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রবীরকে কোতোয়ালি থানায় রাখা হয়েছিল। সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সে সময় তাকে দশদিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালত সেদিন প্রবীর সিকদারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেন।

মঙ্গলবার রিমান্ড নামঞ্জুর ও জামিনের আবেদন জানিয়ে প্রবীর সিকদার নিজে ও তার আইনজীবীরা শুনানি করলেও আদালত তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

প্রবীর সিকদার অনলাইন নিউজপোর্টাল উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ, বাংলা দৈনিক বাংলা ৭১ এবং উত্তরাধিকার নামের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। রাজধানীর ইন্দিরা রোডে পত্রিকাগুলোর কার্যালয়।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অভিযোগে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৭ (২) ধারায় কোতোয়ালি থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন ফরিদপুরের আওয়ামী লীগ নেতা, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা এপিপি অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার পাল। রোববার বিকেলে তিনি ওই মামলা করার পর রাতে প্রবীর সিকদারকে তার রাজধানীর ইন্দিরা রোডের কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করে ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ওই মামলায় প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

লিখিত এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, গত ১০ আগস্ট বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে ‘আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামে জনসমক্ষে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেন। এই পোস্টটি পড়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, উক্ত প্রবীর সিকদার ইচ্ছাকৃতভাবে গণমানুষের প্রিয় নেতা মাননীয় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি সম্পর্কে মিথ্যা অসত্য লেখা লিখে সেটি তার নিজস্ব ফেসবুকে পোস্ট করে মাননীয় মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন এবং উক্ত লেখাটি জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে উস্কানি প্রদান করে শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। এর ফলে মাননীয় মন্ত্রীর মানহানি ঘটেছে। যা একটি ফৌজদারি অপরাধ।

মামলার আরজিতে আরও বলা হয়, ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দাবি করে প্রবীর সিকদার বলেন- তার মৃত্যু হলে স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার দায়ী থাকবেন।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানায় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে ব্যর্থ হয়ে প্রবীর সিকদার ওই স্ট্যাটাস দেন।

পরিবার বলছে, রোববার সন্ধ্যায় প্রবীর সিকদারকে নিয়ে যান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তার ইন্দিরা রোডের কার্যালয় থেকে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশের একটি দল প্রবীর সিকদারকে নিয়ে যায়। পরে তাকে মিন্টো রোডে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হলেও রাতেই তাকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সাংবাদিক প্রবীর সিকদার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান। তার বাবাসহ পরিবারের ১৪ জন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শহীদ হয়েছিলেন। দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুরের নিজস্ব সংবাদদাতা থাকাকালে পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সেই রাজাকার’ কলামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুসা বিন শমসেরের বিতর্কিত ভূমিকার বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। এরপর ২০০১ সালের ২০ এপ্রিল সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হন। বর্তমানে একটি পা হারিয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন তিনি।

ফরিদপুরের কানাইপুরের ঐতিহ্যবাহী জমিদার সিকদার বাড়ির সন্তান প্রবীর সিকদার দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুরের নিজস্ব সংবাদদাতা ও পরে পদোন্নতি পেয়ে স্টাফ রিপোর্টার পদে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন। পরে ঢাকায় এসে দৈনিক সমকাল ও দৈনিক কালের কণ্ঠে কাজ করেছেন তিনি।