প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ

যুগবার্তা ডেস্কঃ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা ছুটি শেষে দেশে না ফিরে পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়ছেন গণমাধ্যমে।
পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গতকাল শুক্রবার বিশেষ মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে আইন মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রপতির দপ্তর গতকাল রাত পর্যন্ত কিছুই বলতে পারেনি।

গতকাল শুক্রবার প্রধান বিচারপতির ছুটির মেয়াদ শেষ হয়। বিচারপতি এস কে সিনহা ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০১৮ সালের ৩১ জানুযারি পর্যন্ত তাঁর প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বে থাকার কথা। কারণ সংবিধান অনুযায়ী একজন বিচারপতি ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বিচারপতি এস কে সিনহাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অমুসলিম কাউকে প্রধান বিচারপতি করা হয়। প্রধান বিচারপতি গতকাল সিঙ্গাপুর থেকে কানাডার উদ্দেশে যাত্রা করায় শিগগির তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যাবেন। এরপর দেশে ফিরতে পারেন। তবে কবে ফিরবেন তা কেউ বলতে পারছেন না। জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি সিঙ্গাপুরে অবস্থান করে সেখানে ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে চিকিত্সা নেন। তিনি চার দিন হাসপাতালে ছিলেন। এর আগেও তিনি ওই হাসপাতালে চিকিত্সা করিয়েছেন। চিকিত্সার জন্য তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে গত ৬ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে যান। চিকিত্সা শেষে তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তিনি দেশে না ফিরে গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় চুঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চায়না-সাউদার্ন এয়ারলাইনসের একটি বিমানে কানাডার উদ্দেশে সিঙ্গাপুর ছাড়েন। মাঝপথে ওই ফ্লাইটটি চীনের একটি বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করে। প্রায় তিন ঘণ্টা যাত্রাবিরতির পর কানাডার উদ্দেশে রওনা হন প্রধান বিচারপতি। আজ টরন্টোর স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টায় পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি অবতরণ করার কথা। তিনি কানাডায় তাঁর ছোট মেয়ে আশা সিনহার বাসায় অবস্থান করবেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গত ২ অক্টোবর এক মাসের ছুটি নেওয়ার পর তিনি তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছিলেন। পরে তিনি বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর বিদেশে থাকার কথা উল্লেখ ছিল। ১০ নভেম্বর বা এর কাছাকাছি সময়ে তাঁর দেশে ফেরার কথা বলা হয় আবেদনে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে গত ১২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি দেশে না ফেরা পর্যন্ত এবং দেশে ফিরে দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এক মাস নয় দিনের ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা গত ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। এর চার দিন পর তাঁর সহধর্মিণী সুষমা সিনহা অস্ট্রেলিয়ায় যান। তাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় বড় মেয়ের বাসায় ওঠেন। পরে সেখান থেকে সিঙ্গাপুরে যান। প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়ার পরদিনই সুপ্রিম কোর্টের বিরল এক বিবৃতিতে বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, অর্থ পাচার ও নৈতিক স্খলনসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগ থাকার কথা প্রকাশ করা হয়। এর আগে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে। সরকার সমর্থক আইনজীবীরা রায়ের পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবিতে মিছিল-সমাবেশ করেন। প্রধান বিচারপতির সব কর্মসূচি বর্জন করার জন্য আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান। রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে জাতীয় সংসদেও ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ অবস্থার মধ্যে গত ৩ আগস্ট থেকে একমাস ৯ দিনের ছুটি নেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি এস কে সিনহা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আলীনগর ইউনিয়নের তিলকপুর গ্রামে ১৯৫১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা প্রয়াত ললিত মোহন সিনহা ও মা ধনবতী সিনহা। বিচারপতি এস কে সিনহা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলএলবি পাস করার পর ১৯৭৪ সালে সিলেট জেলা জজ আদালতে আইনজীবী হিসেবে পেশা শুরু করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে হাইকোর্টে এবং ১৯৯০ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে প্রখ্যাত আইনজীবী এস আর পালের জুনিয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর তাকে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই আপিল বিভাগে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।