প্রথমে নগর তারপর গ্রামের আসন বণ্টন

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইনের খসড়াও প্রায় চূড়ান্ত। এতে বলা হয়েছে, এই আইন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রযোজ্য হবে। খসড়ার সর্বশেষ সংশোধনীতে প্রথম পর্যায়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোটার ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্র্নিধারণ করার বিধান রাখা হয়েছে। এরপর সীমানা পুনর্র্নিধারণ করা হবে দেশের বাকি অংশের আসনগুলোর। গত ২৪ আগস্ট সর্বশেষ সংশোধিত এই খসড়া আইনে স্বাক্ষর করেছেন নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম।

এ বিষয়ে গতকাল রবিবার ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, খসড়া আইনটি নির্বাচন কমিশনের সভায় উপস্থাপন করা হয় এবং কমিশন এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনারদের দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে একজন আইন বিশেষজ্ঞের মতামতও নেওয়া হবে। এরপর জাতীয় সংসদে পাসের লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

এদিকে সংলাপ শেষ হওয়ার আগে প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্ত করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংলাপ শেষ হওয়ার আগেই সীমানা পুনর্র্নিধারণের প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্ত করা মোটেও ঠিক হচ্ছে না।

এতে সংলাপ লোক-দেখানো বলে মনে হতে পারে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিকল্পনা বা রোড ম্যাপ অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ সবেমাত্র শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ঈদের আগে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত মোট ছয়টি দলকে আমন্ত্রণ জানায়। এর মধ্যে গত ২৪ আগস্ট মুক্তিজোট নামের একটি দল সংলাপে অংশ নেয়। ওই দিন বিএনএফ নামের আরেকটি দলের সঙ্গে সংলাপের সময়সূচি নির্ধারিত থাকলেও দলটি উপস্থিত হয়নি। এ ছাড়া ঈদের পর ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরো ছয়টি দলের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময়সূচি চূড়ান্ত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ আরো ২৮টি দলের সঙ্গে সংলাপের সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এ বিষয়ে বলেন, রোড ম্যাপ অনুসারে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শেষ করা হতে পারে।

অন্যদিকে রোড ম্যাপে সীমানা পুনর্র্নিধারণ সম্পর্কে সময়সূচি হচ্ছে, আগস্টেই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অক্টোবরে ৩০০ আসনের সীমানা পুনর্র্নিধারণ করে খসড়া তালিকা প্রণয়ন।

এদিকে খসড়া আইনে জেলার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, দ্য ডিস্ট্রিক অ্যাক্ট ১৮৩৬-এর বিধান অনুসারে সরকার কর্তৃক সৃষ্ট জেলা। আর ‘জেলা পর্যায়’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘জেলা পর্যায়’ অর্থ সিটি করপোরেশন। খসড়া আইনের ৬ ধারা উপ-ধারা (২)-তে বলা আছে, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত কাজ দুই পর্যায়ে নিষ্পন্ন করা যাবে। উপ-ধারা ২-এর (ক)-তে বলা আছে, সংসদের আসনগুলোর ভোটার সংখ্যা এবং জনসংখ্যার সমবিভাজনের ভিত্তিতে প্রথমে জেলা পর্যায়ে (সিটি করপোরেশন) বণ্টন এবং (খ) উক্তরূপ বণ্টনের পর জেলাগুলো (জেলা) বরাদ্দকৃত সংসদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্র্নিধারণ।

অবশ্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের ধারণা, কমিশন যেভাবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে তা বাস্তবায়ন হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিদ্যমান সীমানাতেই অনুষ্ঠিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী এলাকার আয়তন, অবস্থান অপরিবর্তিত রেখে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করে বিজ্ঞপ্তি আকারে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করবে।

এ বিষয়ে কমিশনের প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘সর্বশেষ আদমশুমারীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সীমানা পুনর্র্নিধারিত হইবার পর হইতে পরবর্তী আদশশুমারীর প্রতিবেদন প্রাপ্তির মধ্যবর্তী সময়ে বা ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে চূড়ান্তভাবে প্রকাশের পর কোন নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হইলে উহা সর্বশেষ সীমানার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হইবে। এক্ষেত্রে কমিশন নির্বাচনী এলাকার আয়তন, অবস্থান হুবহু ঠিক রাখিয়া নির্বাচনী এলাকার শুধুমাত্র প্রশাসনিক পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করিয়া বিজ্ঞপ্তি আকারে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করিবে। ’

এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘সর্বশেষ আদমশুমারী প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উক্ত প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ হইতে অনূর্ধ্ব ১২ মাসের মধ্যে সীমানা পুনর্র্নিধারণ কাজ সম্পন্ন করিতে হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, আদমশুমারীর প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বেই যদি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন তফসিল ঘোষণা করা হইয়া থাকে এবং ওই সময়সূচি যদি সীমানা নির্ধারণের সময়সূচির সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে ঘোষিত নির্বাচন সম্পন্ন হইবার পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করিতে হইবে। ’

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশ হয় ২০১১ সালে। এরপর ২০১৩ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন দশম সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্র্নিধারণ করে। পরবর্তী আদমশুমারি এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখের আগেই। এর মধ্যে কমিশনের প্রস্তাবিত আইন সংসদে পাস হলে এ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্র্নিধারণের কোনো প্রয়োজন হবে না।

এর আগে নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে তাদের রোড ম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনায় সীমানা পুনর্র্নিধারণে ভোটার সংখ্যার পাশাপাশি এলাকার পরিমাণ বিবেচনায় আনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। রোড ম্যাপের প্রস্তাবনায় কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে, সময়ের পরিবর্তনে এবং জনগণের শহরমুখী প্রবণতার কারণে বড় বড় শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যার আধিক্য বা ঘনত্ব বিবেচনা করা হলে শহর এলাকায় সংসদীয় আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে পল্লী অঞ্চলে আসন সংখ্যা কমে যাবে। ফলে শহর ও পল্লী অঞ্চলের আসনের বৈষম্য সৃষ্টির সুযোগ হবে। সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শুধু জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি না করে ভোটার সংখ্যা এবং সংসদীয় এলাকার পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়ার জন্য আইনি কাঠামোতে সংস্কার আনা প্রয়োজন। কেননা ভোটার তালিকা প্রতিবছর হালনাগাদ করা হয়। জনসংখ্যা, মোট আয়তন ও ভোটার সংখ্যা এগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে বড় বড় শহরের আসনসংখ্যা সীমিত করে দিয়ে আয়তন, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও উপজেলা ঠিক রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি কমিশন সক্রিয় বিবেচনায় রেখেছে।-কালেরকন্ঠ