পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া ফুঁসছে মানুষ

6

অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল বা বুনো আগুন নতুন কোনো বিষয় নয়; কিন্তু এর ধ্বংসলীলা ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে ওঠায় এবার জলবাযু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে সাধারণ মানুষ। তাদের বক্তব্য, সরকার যদি অনতিবিলম্বে এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেয় তাহলে ভবিষ্যত্ অস্ট্রেলিয়ার জন্য মারাত্মক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। এরই মধ্যে দাবানলে বিভিন্ন রাজ্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবানলের এই মারাত্মক রূপের জন্য সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ব্যর্থতা দায়ী। তারা যদি এ ব্যাপারে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক হতেন তাহলে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। গত সেপ্টেম্বর থেকে এই দাবানলের ধ্বংসলীলা শুরু হয়। নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়ার দিকে এটি এগিয়ে আসায় লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এতে করে বন্য প্রাণিকুলেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, এর কারণে কোটি কোটি প্রাণী মারা গেছে। মূলত এই দাবানলের জন্য দেশটির প্রচণ্ড তাবদাহকেই দায়ী করা হয়। আরো রয়েছে প্রচণ্ড খরা ও ঝড়ো বাতাসের তাণ্ডব। এবারে এত দীর্ঘ সময় ধরে দাবানল চলতে থাকার কারণ হচ্ছে প্রকৃতির এই রুষ্ট আচরণ। অবশ্য প্রকৃতি এমনি এমনি এই রূপ ধারণ করেনি, মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই সে আজ এত ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে যদি আরো তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সেখানে আরো বেশি প্রাণহানি ঘটবে। গত কয়েক মাস ধরে তাপমাত্রা এত বেশি ছিল (গড়ে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) যে আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। তবে মধ্যে একটু স্বস্তির বৃষ্টি এলেও তা মরুভূমির বুকে এক ফোঁটা জলের মতোই ছিল। দাবানলের এই ভয়াবহ আকার ধারণের পিছনে সরকারের জলবায়ু পরিবর্তনের নীতিকে দায়ী করা হলেও সরকার বলছে, তারা বিষয়টিকে সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন। তাদের পক্ষে যা যা করণীয় তা-ই তারা করে যাচ্ছেন; কিন্তু সাধারণ জনগণ হঠাত্ করে যে বিরুদ্ধাচারণ করছে তা কাম্য নয়। এখানে তারা কার্বন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে দাবানল সংকটকে গুলিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বলছে, সরকার মুখে মুখে যত সুন্দর কথা বলছে, বাস্তবে তা খুব কমই দেখা যায়। আর এ কারণেই তারা সম্প্রতি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে। এ বিক্ষোভ ক্যানবেরা সিডনি, মেলবোর্নসহ বেশ কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তারা সরকারের পদত্যাগের দাবিতেও স্লোগান দেয়। তারা বলেন, এখানকার বাতাস ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে; কিন্তু সরকার নির্বিকার। এখানেও রাজনীতির কূটকৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার বছর আগে সেখানকার আদিবাসীরা কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করত তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। শুধু স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর বসে না থেকে এ খাতে অর্থ ব্যয় বাড়াতে হবে। দাবানলের একটা প্রধান কারণ ঘন ঘন বজ পাত। এই বজ পাতের কারণেই দাবানলে গাছে গাছে আগুন লেগে এটা মারাত্মক আকার ধারণ করে। তাই এ থেকে বাঁচতে তথা বজ পাত কমিয়ে আনতে করণীয় সম্পর্কে পরিবেশবিদদের পরামর্শ নিতে হবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীরা তাদের জমি রক্ষায় গাছপালা বড়ো হওয়ার আগেই তা আগুন লাগিয়ে পরিষ্কার করে ফেলত। যাতে ভবিষ্যতে এটা বড়ো বনজঙ্গল না হয়ে দাবানলের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। তারা বলছেন, আদিবাসীদের অভিজ্ঞতা এবং পাশ্চাত্য আগুন নেভানোর উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো যেতে পারে। তবে বিষয়টিকে আবার অনেকে নেতিবাচক হিসাবেও দেখছেন। তাদের মতে, একশ্রেণির লোক ইচ্ছে করে বনে আগুন লাগিয়ে দিয়ে মাইলের পর মাইল বনাঞ্চল উজাড় করে দিচ্ছে। আবার অন্যপক্ষ বলছে, বিষয়টি মহত্ উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করছে। কেউ যদি তেমনটি করে তাহলে তার নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে। আর যদি ভালো উদ্দেশ্যে করা হয় তাহলে তার অবশ্যই ইতিবাচক ফল থাকতে বাধ্য। যার প্রকৃত উদাহরণ আমরা আদিবাসীদের কাছ থেকে নিতে পারি। তারা যুগের পর যুগ এভাবেই দাবানল থেকে বাঁচতে পদক্ষেপ নিয়ে আসছে।-ইত্তেফাক