পিয়া-মলি আপার গল্প:

11

সাইফুল ইসলাম শিশির: গত সপ্তাহে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিজ এলাকা খাগা গ্রামে গিয়ে ছিলাম। সেই গ্রাম আর নেই। রাস্তাঘাট, নদী- নালা, গাছ- পালা, বসত ভিটা, সবখানে পরিবর্তনের হাওয়া। চেনা প্রকৃতি যেন বড্ড অচেনা মনে হয়। রাস্তার দু’ধারে একদা সারিবাঁধা শিমুল, সোনালী, বট- পাইকড়ের ‘আড়া’ ছিলো। আজ সেখানে ইউক্যালিপটাস, মেহগনী গাছ ঠাঁই নিয়েছে। অথচ এখন শিমুলের ডালে ডালে ককিলের কুহুতান, ফাগুন বনে আগুন জ্বলার সময়।
সাত পাড়ার মস্তবড় গ্রাম এই খাগা। এ গ্রামের সাথে আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজিজ, জাহের, কুদ্দুস, গফুর, বারী, খালেক, সাইদ, মাহেলা এরা ছিলো আমার ধুলাবালি মাখা খেলার সাথী। সাইদ মাহেলার সাথে দেখা হলো। বলে না দিলে চেনা দায়। সময় কী ভাবে পাল্টে দেয় সব কিছু।
খাওয়া শেষে বৌ দেখাতে নিয়ে গেল। ঘর ভর্তি মেয়েরা ভীড় করে আছে। এক মধ্য বয়সী মহিলা নতুন বৌকে বললেন “উনি তোমার মামা শশুর, সালাম করো।” এই প্রথাটা আমার একদম ভালো লাগে না। তবু মানতেই হয়। সালাম নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় ‘বোমা ফাটালেন’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলা।

  • আমাকে চিনতে পেরেছেন?
    আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।
  • “আমি আপনার গলায় মালা দিয়ে ছিলাম- মনে পড়ে?”
    হঠাৎ আমার কান গরম হয়ে উঠলো। সামনে তাকাতেই পারছিলাম না। পাশে আমার বড়মা নাবিলা। মহিলা বলে কী!! সারা ঘর তখন পিনপতন নিরবতা। শুধু ঐ মহিলা মিটিমিটি হাসছে।
    “মনে করতে পারছেন না? আমি দয়া! মোছাঃ আসমা পিয়া- দয়া।” তারপর সে যা বলল তাতে আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে গেল।
    ১৯৮৬ সালে বহুলী হাটখোলার পাশে ধীতপুর কানু গ্রামে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্যোগে,,, প্রীতিলতা গার্লস হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। খুব ধুমধামের সাথে স্কুল উদ্বোধন হয়। সেদিন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মহোদয় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কার্তিক ভৌমিক- কাকা বাবু এক একর জায়গা দান করেছিলেন বলেই সেদিন আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখে। শুনেছি দুরন্ত যৌবনে মাস্টার দা সূর্য সেন কাকা বাবুর দীক্ষাগুরু ছিলেন।
    প্রীতিলতা স্কুলের বারান্দায় বসে সেই অগ্নি যুগের অনেক গল্প শুনেছি। অশেষ কৃতজ্ঞতা কাকা বাবুর প্রতি। তিনিও আজ স্বর্গবাসী।
    মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিবৃন্দকে মাল্যদান আনুষ্ঠানিকতার একটি অংশ মাত্র। অথচ দয়া সে স্মৃতি কী যতনে লালন করেছে।
    স্বাধীনতার পর তখন আমি রাজশাহীতে মালোমাড়া- কাদিরগঞ্জে থাকতাম। ঐ পাড়ায় মলি আপাদের বাসা। মলি আপা আমার একাডেমিক সিনিয়র। গৌর গাত্রবর্ণ, একটু বালকী হলেও দেখতে বেশ সুন্দরী ছিলেন। শাড়ি পরে বড় করে টিপ দিতেন। হাসলে গালে টোল পড়ত।
    শোনা কথা মলি আপা এ পাড়ার এক ছেলেকে ভালো বাসতেন। একদা রাতের আঁধারে বাড়ির আংগিনায় দু’জনে মিলে মালা বদল করেন। “পড়বিতো পড় মালির ঘাড়ে।” তার বড় ভাই এসব দেখে ফেলেন। ছেলেটাকে ধরে ভীষণ মার দেন। ছেলেটি লজ্জায় শুধু এ পাড়া নয়- রাজশাহী ছেড়ে চলে গেছে।
    মলি আপা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে পিছন থেকে দুষ্ট ছেলেরা ‘মালাবদল’ বলে চিৎকার দিয়ে গলির মধ্যে হারিয়ে যেত। মলি আপার মুখে তখন শুধু অমাবস্যার ছায়া। তিনি মাথা নিচু করে হেঁটে যেতেন। এসব দেখে আমার খুব খারাপ লাগতো। বুকের ভিতর চিন চিন ব্যথা অনুভব করতাম।
    বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি আমার বিভাগে পড়তেন। মাঝে মধ্যে দেখা হলে কথা হতো। আদর করে আমাকে তিনি ‘নেতাজী’ বলে ডাকতেন। আমি বিব্রত হতাম।
    ‘মলি আপা! আমি আপনার ছোট ভাই।’ একদিন দেখলাম সে আমাদের মিছিলে– তার পর থেকে নিয়মিত দেখা হতো।
    ক্রমশ —-
    ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
    লেক সার্কাস, উত্তর ধানমণ্ডি
    ঢাকা

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।