পিরোজপুরে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

11

হাসান মামুনঃ কোরবানিকে সামনে রেখে পিরোজপুরের ৭ উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন চার’টি পৌরসভা মধ্যে প্রায় ৪২টি স্থানে বসে গরুর হাট। উপকলীয় দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে সর্ববৃহত হাট জেলার পোনা নদী পশ্চিম পাড়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখাগেছে, ভান্ডারিয়া উপজেলার নদমুলা ইউনিয়নের দক্ষিণ শিয়ালকাঠীর লিয়াকত মার্কেট হতে ধাওয়া ইউনিয়নের ফুলতলা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার দুই পার্শ্বে বিক্রেতারা কোরবানির গরু নিয়ে বসেছে বিক্রির জন্য। স্থানীয় খামারী এবং যশোর, ঝিনাইদাহ, মানিকগঞ্জ, সাতক্ষিরা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা গরু নিয়ে এসেছে বিক্রির জন্য। আর তা কিনতে ভান্ডারিয়া উপজেলা ছাড়াও পাশ্ববর্তী কাউখালী, ইন্দুরকানী, রাজাপুর, কাঠালিয়া, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা এমন কি ঝালকাঠীর বিভিন্ন উপজেলার ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।
তবে সকাল থেকে বলেশ্বর ব্রীজ সংলন্ন, পাঁচপাড়া ও চৈলশা হাট ঘুরে দেখা গেছে এবছর ভারতীয় কোন গরু বাজারে নেই। দেশি গরুর আমদানি বেশি। অনেকে আবার আগামী হাটে কেনার জন্য দাম থেকে ফিরে গেছে। অনেক বলছে আগামী হাটে বিদেশি গরু আসতে পারে। তবে অনেক ক্রেতাদের সাথে আলাপ কালে তারা জানান, এবছর গরুর দাম গত বছরের চেয়ে একটু বেশি। বেশিরভাগ ক্রেতাই ৩৫, ৪০, ৪৭, ৫০, ৬০ হাজার টাকা এরকম দামে কিনেছেন। গরু মোটা তাজা করণের নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে ক্রেতারাও কৌশলে হাটেই ডোঙ্গায় করে খইল, ভূসি, কুরা পানিতে মিশিয়ে তা খাইয়ে দেখান ক্রেতাদের।
জেলা শহরের বলেশ্বর ব্রীজ সংলগ্ন হাট ও পাঁচপাড়া হাটে দুই দিনের এ চিত্র দেখে মনে হয়েছে কোরবানির আগে গরুর হাটেই যেন তারা এক আনন্দের জানান দিচ্ছে। হাট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতা সমাগম বেশি দেখে বিক্রেতারা তাদের গরুর দাম একটু বেশি হেকে বসে আছে। পূর্বে বিদেশি বিশেষ করে ভারতীয় গরুর চাঁপ থাকলে এ বছর দেশি খামারীদের গরুই হাট ঘুরে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার হাটের দিন থাকায় সরেজমিনে ভান্ডারিয়া পশুর হাট ঘুরে উপজেলার শিলায়কাঠী এলাকার আনোয়ারা ডেইরিফার্মের আনা হাটের সব চেয়ে বড় ৯০০ কেজি ওজনের গরুটির দাম হাকা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। এবং বিক্রেতারা ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বললেও বিক্রেতা তাতে দেয়নি। এসময় ফার্মের মালিক মো. রিপন খানের সাথে আলাপককালে তিনি জানান, তার ফার্মে মোট ৩০০ গরু আছে। আর এ গরুটি ১১ মাস ধরে লালন পালন করে বড় করতে প্রতি দিন খরচ পড়েছে ২০০০ টাকা। এখন তিনি যদি ৮/৯ লাখ টাকা পায় তাহলে বিক্রী করবেন অন্যথায় ফেরৎ নিয়ে যাবেন।
দামও গতবছরের তুলনায় একটু বেশি বলে জানান বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ক্রেতারা। ছোট, বড় ও মাঝারি আকার ভেদে প্রতিটি গরুর মূল্য সর্বনিন্ম ২৭ হাজার থেকে ৭৫ হাজার এবং ওপরে ৩ লাখ থেকে ৯ লাখ টাকার গরু রয়েছে।
বলেশ্বর ব্রীজ সংলগ্ন হাটে বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ বাড়ইখালী এলাকার খমারী খালিদ হোসাইনের গরুই ছিল বড় আকারের যার মুল্য হাকা হয়েছে ৩ লাখ টাকা।
তবে তিনি সেটি ২লাখ ৫০ হাজার টাকা হলে বিক্রী করবেন। চিংরাখালী গ্রামের বাসিন্দা ও মৎস্য ব্যবসায়ী জামাল মিয়া সর্বচ্চ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় দুইটি গরু ক্রয় করেছেন। মাসুম শেখ নামের এক ক্রেতা মাঝারি সাইজের একটি দেশি গরু কিনেছেন ৫২ হাজার টাকায়। এছাড়াও পিরোজপুর পৌর এলাকার আবু সাঈদ নাইম একটি গরু কিনেছেন ৮০ হাজার টাকায়। এদিকে গরুর হাটে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা ও জাল নোট ঠেকাতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে। গরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রাণী সম্পদ বিভাগের উদ্যোগে মেডিকেল টিমও রয়েছে। হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ের মধ্যে ক্রেতাদের সাথে থাকা উঠতি বয়সী যুবকেরা উল্লাস প্রকাশ করার দৃশ্যও দেখাগেছে হাটে।
প্রবীণ গরু ব্যবসায়ী রাজ্জাক, সিদ্দিক, আবু ও শাহ সিকদার জানান, অন্যান্য হাটের চেয়ে এ হাটে অনেক দুর দুরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। শাহা সিকদার জানান, তার ফার্মে কোরবারিন জন্য ১৯টি গরু হাটে নিয়ে এসেছে। তার মধ্যে বস চেয়ে বড়টির মুল্য হাকা হয়েছে ২ খাল ৬০ হাজার টাকা। এক ক্রেতা ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছে।
গোয়ালের একটি গরু ১ লাখ ৮৫ টাকা দাম হাকা হয়েছে। এবং সেটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দাম উঠলেও ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হবে বলে জানান বিক্রেতা সুমন মিয়া।
এ হাটে উপজেলার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ব্যবসায়ী ছাড়াও দুর দুরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা গরু-ছাগল নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। এছাড়াও কৃষকেরাও বছরের এ একটি সিজনের জন্য আগে থেকেই দেশি গরুর পরিচর্যা করে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(সদর সার্কেল) আহমাদ মাঈনুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক জানান, আসন্ন কোরবারিন উপলক্ষে পশুর হাটে বিশেষ নিরাপত্তা এবং কোরবানির দিন পশু জবাইয়ের পর বর্জ অপসানের জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আর এগুলি মনিটরিং ও অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রতিটি থানার ওসিকে প্রধান করে একটি কমিটি করা সহ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত থাকায় ঠিকমত সময়ে আসতে না পাড়ায় কোরবানির গরু কিনতে সমস্যায় পড়তে পাড়ে সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী ১১ আগস্ট একই স্থানে হাট বসার ঘোষণা দিয়েছেন। যাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরে কোরবানির গরু কিনতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমস্যায় পড়তে না হয়।
পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান জানান, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে জালনোট সনাক্তকরন বুথ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ ব্যাংক। হাটে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে জালনোট সনাক্তকরন প্রক্রিয়া। এ সংক্রান্ত জেলা জালনোট প্রতিরোধ কমিটির এক আলোচনা সভায়াও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং পশুর হাটের ব্যাংক বুথে স্থানীয় ব্যাংক সমূহের দক্ষ কর্মকর্তাগন জালনোট সনাক্তকরনের মেশিনসহ বুথে থাকার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। পশুর হাটগুলোতে এসময় আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনিকে সতর্ক রাখার ওপরও সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সরেজমিনে গিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগমে দেখা গেছে। জমে উঠেছে পোনা নদী পশ্চিম পাড়ে ভান্ডারিয়ায় সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার এ দুই দিন হাট বসে। ক্রেতা মো. স্বপন সিকদারের সাথে আলাপ কালে জানান, সে তার দুই ছেলেকে নিয়ে হাটে এসে ৭০হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন।
এসময় দুরের ক্রেতাদের সাথে আলাপ কালে মাসুম, রত্তনসহ বেশ কয়েকজন জানান, হাটে একটি স্থানে জাল টাকা চেক করা, উপজেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগে গরুর রোগ নির্নয়ে ব্যনারসহ ক্যাম্প করা হয়েছে। হাটে পকেট মার রোধ সহ সর্বাত্মক ভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য থানা পুলিশ, র‌্যাব, সাদা পোষাকে গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও টহল দিচ্ছে। আর সে জন্য তারা জেলা প্রশাসকে ধন্যবাদ ও জানান। তবে বিদেশী গরুর সমাগম না থাকায় আগামী হাটে আরো দাম বাড়তে পারে বলেও জানান বিক্রেতারা।
অন্যান্য বিক্রেতারা জানান, কোরবানির আগের দিন রাত পর্যন্ত কোরবানির পশু বিক্রয় হবে। তবে এবছর দেশি গরুই বেশি এবং দামও গত বছরের চেয়ে কম। এদিকে হাট ঘুরে দেখা গেছে জাল টাকা, পকেটমার রোধে পুলিশ ছাড়াও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং মেডিকেল টিম তৎপর রয়েছে।