পানি থৈথৈ হাওরে বোরো নিয়ে শঙ্কা

যুগবার্তা ডেস্কঃ হাওর এলাকার মানুষের হতাশার চিত্র নিজের চোখেই দেখলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। চিন্তিতও হলেন। এক ফসলের ওপর নির্ভরশীল এই ভাটির কৃষকরা এবারও হাওরে আগামী বোরো মৌসুমে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। মৌসুমি ফসলের ভবিষ্যৎ এই হাওরবাসী অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছেন ভাগ্যের ওপর। মন্ত্রী আনিসুল ইসলামও তাদের এ শঙ্কাকে মেনে নিলেন। তবে আশ্বাস দিয়ে বললেন, এ বছর হাওর এলাকার বাঁধ নির্মাণ, হাওরসংলগ্ন নদী খননসহ স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজে প্রয়োজন অনুযায়ী সব টাকাই দেওয়া হবে। এ কাজগুলোতে যেন দুর্নীতির সুযোগ না থাকে, সেজন্য সর্বোচ্চ স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জ এলাকার হালির হাওর, শনির হাওরসহ আশপাশের গ্রামগুলো পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। সেখানকার বর্তমান অবস্থা ও নদী খননের কাজ ঘুরে ঘুরে দেখেন তিনি। এলাকার মানুষ কী অবস্থায় আছে, সে সম্পর্কেও খোঁজখবর নেন তিনি। প্রশাসনকে নানা তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন মানুষের পাশে থাকতে। পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার বরকতউল্লাহ খানসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরাও ছিলেন মন্ত্রীর সঙ্গে।

সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে বৌলাই নদীর মোহনায় ঢোকার কিছুদূর আগে দেখা গেল সুরমা নদীর এ অংশে খনন কাজ চলছে। মন্ত্রী এখানে স্পিড বোট থামিয়ে নদী খননের কাজ দেখেন সরেজমিনে। নদী খননের মাটি জমে উঁচু হয়ে ওঠা অংশটুকুকে কৃষকের ধান মাড়াই এবং বর্ষায় গবাদি পশু রাখার নিরাপদ স্থান হিসেবে তৈরি করার নির্দেশ দেন তিনি।

এখান থেকে বৌলাই নদী হয়ে সংযোগ খাল দিয়ে হালির হাওরে ঢোকার মুখে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, হাওর আর নদীর পানির উচ্চতা সমান এখন। উচ্চতা সমান থাকায় এখনও হাওরের পানি নামতে পারছে না- এটিই হাওরবাসীর দুশ্চিন্তার মূল কারণ হয়ে উঠেছে। পানি না নামায় ধানের বীজতলার কাজও শুরু করতে পারছেন না কৃষক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন কাজও শুরু করা যাচ্ছে না।

হালির হাওর থেকে শনির হাওরে গিয়েও দেখা যায় পানি থৈ থৈ করছে। মাঝখানে ডুবন্ত বাঁধ অবশ্য খানিকটা জেগে উঠেছে। সেখানে নৌকার গলুই ঠেকিয়ে বসে আছেন কয়েকজন হাওরবাসী। মন্ত্রীর নৌ বহর এখানে এসে দ্বিতীয় দফা নোঙর করে। দূর থেকেই চোখে পড়ে নৌকার গলুইয়ে হতাশ মুখে বসে আছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের একজন নূর মিয়া সমকালকে জানান, মধ্য নভেম্বর থেকেই সাধারণত বোরো মৌসুমের জন্য বীজতলার কাজ শুরু হয়। কিন্তু এবার নভেম্বরের শেষে এসেও হাওরের বুকজুড়ে পানি আর পানি। কবে পানি নামবে, কবে হবে বীজতলা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন কৃষকরা। ধান রোপণ করতে দেরি হলে আবারও বানের পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কি-না, তা নিয়েও আশঙ্কিত তারা।

এসব দেখে মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদও আশঙ্কিত কণ্ঠে সাংবাদিকদের জানালেন, নিজের চোখেই দেখছেন হাওরে এখনও পানি রয়েছে। পানি না সরায় কৃষকের বীজতলা হচ্ছে না, বাঁধ নির্মাণ কাজও শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বীজতলা নিয়ে অবশ্য এখনই এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ পানি আরও কিছু কমলে কৃষক বীজতলা করতে পারবে। এতে বড় সমস্যা হবে না।

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, এমনিতেই ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত সাধারণত হাওরে কিছু পানি থেকেই যায়। বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করতে তাই জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। তিনি জানান, এবার বাঁধ সুসংহত করতে তিন স্তরে মাটি ফেলা হবে। বাঁধ নির্মাণ কাজ তদারক করতে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ কমিটি করা হয়েছে। তা ছাড়া এবার মূল নির্মাণ কাজের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতেও উপকারভোগীসহ এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবার ঠিকাদার নয়, সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমেই বাঁধ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই নদী খনন করা হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এবারের কাজে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। শুধু সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার জন্যই এবার এখন পর্যন্ত ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে, যেখানে গত বছর পুরো হাওর অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি টাকা। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় টাকা দেওয়া হবে; কিন্তু খরচ এবং কাজের মানের ব্যাপারেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, চলতি বছর হাওরাঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতি বর্ষণের কারণে বিপুল পানির জোয়ারে হাওর প্লাবিত হয়েছে। আবহাওয়ার এমন অস্বাভাবিক আচরণ থাকলে হাওর এলাকায় আগামী বোরো মৌসুমের ধান তোলা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাবে। এ শঙ্কা দূর করতে তিনি কৃষকদের বিআর-২৯-এর পরিবর্তে বিআর-২৮ ধান রোপণের পরামর্শ দেন। কারণ বিআর-২৮ জাতের ধান পরিণত হতে এক মাস সময় কম নেয়। এটি রোপণ করা হলে বন্যার আগেই ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, শুধু ধান নয়, হাওর এলাকায় শীত মৌসুমে আরও কী কী লাভজনক ফসল চাষ করা যায়, তা নিয়েও ভাবনা-চিন্তা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় বর্ষায় মাছ ধরার সুযোগও অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মত দেন তিনি। এ কারণেই হাওর এলাকায় নদী এলাকার চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিচু কিংবা ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

বিআর-২৮ ধান রোপণ করবেন কি-না- জানতে চাইলে স্থানীয় কৃষক সলিম মিয়া বললেন, বিআর-২৯ জাতে ফলন অনেক বেশি হয়। তবে বিআর-২৮-এ ফলন কম; কিন্তু এক মাস আগেই ধান কাটা যায়। আর এবার বেশি ফলনের দিকে না তাকিয়ে ভালোয় ভালোয় ঘরে ধান তুলে আনার বিষয়কেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। তাই বিআর-২৮ রোপণের সিদ্ধান্তই নিয়েছেন তারা।-সমকাল