নেপালে বিমান বিধ্বস্তে নিহত ৫০

যুগবার্তা ডেস্কঃ ঢাকা ছেড়ে যাওয়া ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইট নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়ে ৫০ যাত্রী নিহত হয়েছে। বিমানটিতে ৬৭ জন যাত্রী ৪ জন ক্রুজ ছিলেন বলে জানা গেছে।

ইউএস বাংলার ড্যাশ কিউ-৪০০ বিমানটি সোমবার বেলা ১২ টা ৫২ ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে ছেড়ে যায়। দুপুর ২ টা ২০ মি: নেপালের কাঠমুন্ডুর ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরন করার সময় দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ইউএস বাংলা ফ্লাইটটি বিমানবন্দরে রানওয়েতে নামার পর চলার সময় একটি মোড় ঘুরতেই বিমানটিতে আগুন ধরে যায়।

বিমানটিতে ৪ জন ক্রুসহ আরোহীদের ৩৬ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালের এবং ১ জন চাইনিজ ও ১ জন মালদ্বীপের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্র জানিয়েছেন, ৩৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৯ জন কাঠমাণ্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২৫ জন বেঁচে নেই। বাকি দুজন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, রাডারের ভুল সিগন্যাল পেয়ে পাইলট উড়োজাহাজ অবতরণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

উড়োজাহাজটি ছিল ক্যাপ্টেন আবিব সুলতান মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন। কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ ও কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মারা গেছেন। সাফি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি।

নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে স্থানীয় খবরের কাগজ কাঠমাণ্ডু পোস্ট লিখেছে, উড়োজাহাজটি ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার কথা ছিল রানওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে। কিন্তু সেটি নামার চেষ্টা করে উত্তর দিক দিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, পাইলট কোনো ধরনের কারিগরি জটিলতায় পড়েছিলেন। অবতরণের সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। এরপর বিমানবন্দরের কাছেই একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় সেটি।

বিমানের যাত্রীদের মধ্যে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রগ্রাম অফিসার সানজিদা হক বিপাশা, তাঁর স্বামী রফিক জামান ও তাঁদের শিশুসন্তান অনিরুদ্ধ জামান বেঁচে নেই। বিধ্বস্ত বিমান থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়ে তাঁরা পরিবারের সদস্যদের কাছে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। যাত্রী ছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নগরহাওলা গ্রামের এফ এইচ প্রিয়ক, তাঁর স্ত্রী আলমুন নাহার এ্যানি ও তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তান তামারা প্রিয়ন্ময়ী এবং তাঁদের সঙ্গী ছিলেন প্রিয়কের মামাতো ভাই মেহেদি হাসান মাসুম অমিয় ও অমিয়র স্ত্রী সাঈদা কামরুন নাহার স্বর্ণা। প্রিয়ক ও তাঁর শিশুসন্তান মারা গেছেন। কামরুন নাহার আহত হলেও আশঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।

আরেক দম্পতি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার রেজওয়ানুল হক শাওন ও তাঁর স্ত্রী তাহেরা তানভীন শশী রেজা। তাঁদের মধ্যে শশী মারা গেছেন। তাঁদের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার গোপালপুরে। যাত্রী রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইমরানা কবির হাসি বেঁচে থাকলেও তাঁর স্বামী ক্যাফালো বাংলাদেশ লিমিটেডের সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রকিবুল হাসান মারা গেছেন। যাত্রী ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সহকারী প্রধান নাজিয়া আফরিন চৌধুরী ও উম্মে সালমা। তাঁরা কেউই বেঁচে নেই। সরকারি এক সেমিনারে অংশ নিতে তাঁরা নেপাল যাচ্ছিলেন। বৈশাখী টেলিভিশনের সাংবাদিক ফয়সাল আহমেদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। তিনিও বেঁচে নেই। গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী পিয়াস রায়ও মারা গেছেন।

আরো মারা গেছেন হাসান ইমাম, বেগম নুরুন্নাহার বিলকিস বানু, মো. নজরুল ইসলাম, আখতারা বেগম, বিলকিস আরা, আলিফুজ্জামান, ইয়াকুব আলী, মিনহাজ বিন নাসির, আখি মনি, এস এম মাহবুবুর রহমান, মো. মতিউর রহমান ও মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। যাঁরা জীবিত আছেন বলে জানা গেছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শাহরীন আহমেদ, শাহীন বেপারী, কবির হোসাইন, শেখ রাশেদ রুবায়েত।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র গোকুল ভাণ্ডারি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা ৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছি। জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ থেকে কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ৯ জনের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কাউকে জীবিত উদ্ধার করার আশা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কারণ উড়োজাহাজটি ভয়াবহভাবে পুড়ে গেছে। ’

ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র প্রেমনাথ ঠাকুরের বরাত দিয়ে নেপালের ইংরেজি দৈনিক দ্য হিমালয়ান জানায়, উড়োজাহাজটি থেকে ২৫ জনকে উদ্ধার করে কাঠমাণ্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে আটজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

‘ভাগ্যক্রমে বেঁচে আছি’ : ‘জানালার পাশেই ছিল আমার আসন। কাচ ভেঙে আমি বেরিয়ে আসি। ’ নেপালি যাত্রী বহোরা জানিয়েছেন এ কথা। উড়োজাহাজে থাকা ওই যাত্রীর বরাত দিয়ে কাঠমাণ্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, তিনিসহ ১৬ জন নেপালের বিভিন্ন ট্রাভেল সংস্থার হয়ে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন। ঢাকা থেকে উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের সময় স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কাঠমাণ্ডুতে অবতরণের সময় এটি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে উড়োজাহাজটি ঝাঁকুনি খেতে থাকে এবং এর পরপরই বিকট শব্দ হয়। স্থানীয় থাপাথালিভিত্তিক নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। বহোরা আরো বলেন, ‘উড়োজাহাজটি থেকে বেরিয়ে আসার পর আমি আর কিছু মনে করতে পারিনি। কেউ একজন আমাকে সিনামঙ্গল হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে আমার বন্ধুরা নরভিক হাসপাতালে নিয়ে আসে। ’ তাঁর মাথায় ও পায়ে আঘাত লেগেছে।

হটলাইন চালু : দুর্ঘটনা সম্পর্কিত তথ্যের জন্য সরকার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসে হটলাইন চালু করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হটলাইনের নম্বর : +৮৮০১৯১২০৬২৯৬৬, +৮৮০১৭৫৭৬৮২৪৮৯ ও +৮৮০১৫৫৩৩৪৪৫৮৮। কাঠমাণ্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের হটলাইন নম্বরগুলো হলো : মোহাম্মদ আল আলামুল ইমাম (কাউন্সেলর), মোবাইল নম্বর +৯৭৭৯৮১০১০০৪০১ ও অসিত বরণ সরবার (প্রথম সচিব), মোবাইল নম্বর +৯৭৭৯৮৬১৪৬৭৪২২।

ইউএস-বাংলা জরুরি তথ্যের জন্য যাত্রীদের স্বজনকে ০১৭৭৭-৭৭৭৭৬৬ নম্বরে ফোন করতে বলেছে। পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়েও একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগের নম্বর ৯৫৪৫১১৫, ৯৫৪৯১১৬। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার গত রাতে জানান, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা ও মানসিক সুস্থতায় সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটিকে ইতিমধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিযুক্ত করা হয়েছে।

শোক প্রকাশ : বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন। এ ছাড়া শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগবার্তা সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সুজনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

অপরদুকে দুর্ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। তিনি টুইট বার্তায় নিহতদের স্বজনকে সমবেদনা জানান এবং আহতদের আরোগ্য কামনা করেন। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশ ও নেপালের জনগণের পাশে আছে। ভারতের উপরাষ্ট্রপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু এক টুইট বার্তায় হতাহতের খবরে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনিও আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। শোক জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে শোক জানিয়ে তাঁর বার্তাটি ক্রেমলিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। শোক প্রকাশ করেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগেও।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের জনগণকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানান। বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রস্তাব দেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশে এর আগে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৪ সালে। ওই বছর ৫ আগস্ট বাংলাদেশ বিমানের একটি ফকার এফ-২৭ বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরের কাছে বিধ্বস্ত হলে ৪৯ যাত্রী নিহত হয়।