ডেস্ক রিপোর্ট: খাদ্যে ভেজাল এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। মেশিনে কাটা চালে ক্ষতিকর মোম পলিশ করা হচ্ছে, মাছে দেয়া হচ্ছে ফরমালিন, মুরগি ও মাছকে যে খাবার খাওয়ানো হয় তাতে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, বাজারের বিভিন্ন সয়াবিন তৈল প্রস্তুত হয় উচ্চতাপে যা মারাত্মক ক্ষতিকর; ফলমূলে মেশানো হচ্ছে ইডেন, টমটম, ফরমালিনসহ নানা রাসায়নিক।

আর এ খাবার খেয়ে মানুষ বিভিন্ন ধরনের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই বাধ্য হয়ে তারা খাঁটি বা নিরাপদ খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। আর তাদের এ চাহিদা পূরণে ‘অর্গানিক খাবার’, ‘খাঁটি খাবার’, ‘বিষমুক্ত খাবার’, ‘নিরাপদ খাবার’- এমন প্রতিশ্রুতিতে অনেক উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান জন্ম নিয়েছে। ভালো সার্ভিস দিয়ে ইতোমধ্যে সুনামও কুড়িয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

রোনার মহামারীর এ সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি ‘শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হলে ভেজালমুক্ত খাবার খেতে হবে।’ আর এর জন্য দরকার ভেজালমুক্ত প্রাকৃতিক খাবার। তাই মানুষ এ সময়টিতে অনলাইনসহ নানা উপায়ে এ ধরনের খাবার সংগ্রহ করছেন। তবে যেসব উদ্যোক্তা নিরাপদ খাবার নিয়ে এগিয়ে এসেছেন তাদের খাবারের গুণগত মান ঠিক আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করতে মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর শুক্রাবাদের বাসিন্দা ব্যাংকার আলিমুজ্জামান বলেন, আমার বয়স মাত্র ৪০ বছর। এ বয়সেই আমার ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, কোলস্টেরল এবং লিভারের সমস্যা। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি বললেন, আপনার লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে হবে। সেটাও আংশিক করলাম। কিন্তু ভালো হচ্ছিলাম না। ডাক্তার এবার বললেন, ভেজাল খাবার ও খাদ্যাভাস পুরোপুরি পাল্টাতে। এরপর নিজে উদ্যোগী হয়ে অনেক কিছু জানতে শুরু করলাম। তেল, চাল, ডাল থেকে শুরু করে খাবার সব পরিবর্তন করতে শুরু করলাম। কারণ আমরা যা খাই তার বেশিরভাগই রিফাইন্ড ও ভেজালে ভরা। এরপর আস্তে আস্তে শারীরিক ভালো পরিবর্তন খেয়াল করলাম।

২০ বছর আগে চিত্রা অর্গানিক কৃষি বাজার নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন শাহজাহান শাহীম। তিনি বলেন, প্রবর্তনা ও মিনা বাজারই প্রথম খাঁটি খাবার নিয়ে এগিয়ে আসে। কেন তাদের এ ধরনের উদ্যোগ তা জানাতে গিয়ে দেখলাম আমাদের চারদিকের খাবারের ভয়াবহ অবস্থা। কয়েকটা প্রজন্ম ধ্বংস করার জন্য সব আয়োজন পসরাগুলোতে। বাজারের এসব ভেজাল ও রাসায়নিক খাদ্য গ্রহণ করে নানা জটিল রোগব্যাধির পাশাপাশি আরেকটি বিরাট ক্ষতি হতে যাচ্ছে দেখলাম। এসব খাবার খেয়ে ভবিষ্যতে যে প্রজন্মটি তৈরি হবে তারা রোগব্যাধিতে তো ভুগবেই পাশপাশি নষ্ট হবে তাদের প্রজনন ক্ষমতা। সব বিবেচনায় খাঁটি খাবার পৌঁছে দিতে উদ্যোগী হলাম। এখন আমাদের শতাধিক পণ্য।

তিনি বলেন, কিছু বিষয় বুঝতে হবে। যে চালে রাসায়নিক আছে তাতে পোকা ধরবে না। কিন্তু আমাদের কাছে যে চাল আছে তাতে পোকা ধরবে। অর্থাৎ এতে রাসায়নিক নেই। এটা বুঝে নিয়েই ওই চালটাকে ব্যবহার করতে হবে। সরিষার তেল কাঠের ঘানিতে ভাঙানোয় দাম পড়বে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা লিটার। সেটার সংরক্ষণ পদ্ধতিও ভিন্ন। এভাবে একেকটা খাঁটি পণ্য একেকভাবে বুঝে নিয়ে ব্যবহার করতে হবে।

বাজারে এখন খাঁটি খাবারের প্রচুর উদ্যোক্তা দেখা যাচ্ছে। ফেসবুক খুললেই নানা নামে এসব উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন পণ্য অর্ডার করে কেনা যাচ্ছে। সেখানে চাল, ডাল, তেল, মধু থেকে শুরু করে নদীর মাছ বা বিষমুক্ত সবজি সবই পাওয়া যায়।

নিওফার্মার্স বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে খাঁটি পণ্যের ব্র্যান্ড হিসেবে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামজিদ সিদ্দিক স্পন্দন বলেন, আমরা আসলে আমাদের পণ্যগুলোকে অর্গানিক বলছি না। কারণ কোনো না কোনো ভাবে মাটিতে বা পানিতে বিভিন্ন সার বা নানা উপাদান তো থাকে। আমরা আমাদের পণ্যগুলোকে বলছি ‘সেফ ফুড’। অর্থাৎ এতে বিষ নেই, প্রিজারভেটিভ নেই। সবচেয়ে বড় কথা আমরা বেশ সাড়া পাচ্ছি মানুষের কাছ থেকে। সত্যি বলতে বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে ভালো থাকতে হলে কি করতে হবে। যারা এ নিরাপদ খাদ্য কিনছেন তারা কিছু বিষয় জেনে ও বুঝেই কিনছেন। খাঁটি বা নিরাপদ খাবারগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু ১ বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। কোনো কোনোটা ৩ মাস বা ৬ মাসের মধ্যেও নষ্ট হয়ে যায়। সেটা আমরা পণ্যের গায়ে লিখে দেই। যেমন খাঁটি সরিষার তেল দেড় বছর পর্যন্ত ঠিক থাকতে পারে। কিন্তু আমরা এক বছরের বেশি মেয়াদ দেই না।

এসব খাদ্যের মান পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে কিনা সে বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরাও চাই এ ধরনের পণ্য যারা আনছেন তাদের খাদ্যের মান নিশ্চিতে সরকারিভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়া হোক। আমরা বিসিএসআইআরএ আমাদের কয়েকটি পণ্য টেস্ট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাদের চার্জ এতো বেশি যে আমরা সাহস করতে পারছি না। তবে আমাদের কিছু পণ্য বিএসটিআইয়ে পাঠানো হয়েছে।

খাঁটি পণ্যের আরেকটি প্রতিষ্ঠান অর্গানিক অনলাইন; যেটি ইতোমধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোক্তাদুল হক বলেন, খাঁটি পণ্যের দাম একটু বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। সরিষার তেলের বীজ হাইব্রিডও আছে আবার একেবারে ভালো দানাও আছে। ঘানিও আছে বিভিন্ন রকম। তাই নানা বিষয়গুলো বিবেচনাতেই ভালো জিনিসটির দাম বাড়ে।

বারডেম হাসপাতালের সাবেক চিফ নিউট্রিশন অফিসার আখতারুণ নাহার বলেন, খাঁটি খাবারের চাহিদা সব সময় ছিল। তবে এখন মানুষ যেভাবে খাঁটি খাবারের বিষয়ে সচেতন হয়েছে তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কারণ ইমিউনিটি সিস্টেম ঠিক রাখতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খাঁটি খাবারের বিকল্প নেই। ভেজাল খাবার খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তো বাড়বেই না; বরং আরও রোগ শরীরে বাসা বাঁধবে। যেমন আমরা কিডনি রোগীদের ইউরিয়া মেশানো মুড়ি খেতে মানা করি। সেদিক থেকে হাতে তৈরি মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ভালো তেমনি খেতেও সুস্বাদু। তবে এত খাঁটি খাবার যারা তৈরি করছেন সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও মনিটরিং দরকার। খাবারটা আসলেই খাঁটি কিনা বা গুণগত মান রক্ষা হচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ে ভোক্তা অধিকার থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।আমাদের সময়.কম