নারায়নগঞ্জে ৪টি ভবনে মোট ৫৪৯টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে

যুগবার্তা ডেস্কঃ টেকসই উন্নয়নের জন্য মানব সম্পদ তথা জনগণের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে উন্নয়ন অপরিহার্য। তাছাড়াও ধর্মীয় আচার, সংস্কৃতি এবং সামাজিক চর্চা আত্মনির্ভরশীল সমাজ তৈরী করে। সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো যেমন:- কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা, ঈদগাহ, খেলার মাঠ ইত্যাদি আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বিষয়গুলোর উপর জোর দিয়ে আজকের একনেকে “সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন” প্রকল্পটির অনুমোদ দেওয়া হয়েছে।সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতিসহ উন্নত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। “স্থানীয় পর্যায়ে সমাজের কল্যাণ ও সংহতি সুসংহত করতে সামাজিক, ধর্মীয় এবং খেলাধুলা বিষয়ক অবকাঠামো উন্নয়ন; এবং স্বল্প দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ১০০.০০ লক্ষ টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে” বলে জানান মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

অন্যদিকে আজকের একনেকেরে “চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার পোল্ডার নং ৭২ এর ভাঙ্গন প্রবণ এলাকায় স্লোপ প্রতিরক্ষা কাজের মাধ্যমে পুনর্বাসন” প্রকল্পটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্প। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১৮-০২-২০১২ তারিখে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ সফরকালে সন্দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমের ভেঙ্গে যাওয়া বেড়ী বাঁধ পুন:নির্মাণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। বিগত ষাট এর দশকে উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ সারা দেশে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পোল্ডারসমূহ নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের পর হতে সন্দ্বীপ উপজেলায় অবস্থিত বাপাউবো’র পোল্ডার ৭২ এর তেমন কোন পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯১ সালের প্রলংকারী ঘুর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের ঘুর্ণিঝড় আইলা এবং তৎপরবর্তীতে, বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড় বিজলি, নার্গিস, মালা ইত্যাদির প্রভাবে সৃষ্ট বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের আঘাতে এবং প্রতি বছর উঁচু জোয়ারের ফলে সন্দ্বীপ এর পোল্ডার নং ৭২ এর বাঁধ/সী-ডাইক/অবকাঠামোসমূহ ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আর তাই চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার পোল্ডার নং ৭২ এর ভাঙ্গন প্রবন এলাকায় বাধেঁর ঢাল সংরক্ষণ এবং বাঁধ পুনরাকৃতিকরণের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকা ও তৎসংলগ্ন প্রায় ১৮০০০ হেক্টর এলাকায় লবনাক্ত পানি অনুপ্রবেশ রোধসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

আজকের একনেক সভায় অনুমোদিত আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো হলো:

নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাস নির্মাণ প্রকল্প- নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের একটি পুরাতন ঐতিহাসিক বন্দর শহর। নারায়ণগঞ্জ ১৮৭৬ সালে মিউনিসিপ্যালিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যা প্রাচ্যের ড্যান্ডি নামে পরিচিত ছিল। নদী তীরবর্তী এ শহরে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুল পৌরসভা একত্রিক করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। সিটি কর্পোরেশনের তিনটি জোনে সুইপার ও ক্লিনার স্থানীয়ভাবে বসবাস শুরু করে। যদিও তাদের উন্নত আবাসস্থল নেই তথাপি পরিচ্ছন্ন কর্মীরা কঠোর পরিশ্রম করে শহরের পরিবেশকে ভাল ও পরিস্কার রাখে। ৬০০টি পরিচ্ছন্ন কর্মী পরিবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সিটি কর্পোরেশনে বসবাস করে। তাদের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সুবিধা নেই। এ সকল সুবিধা বঞ্চিত লোকদের বসবাসের জায়গায় উন্মুক্ত ড্রেন রয়েছে এবং স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নেই। ফলে তারা সারা বছর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে ৪টি ভবনে মোট ৫৪৯টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ভবনের নিচ তলা শিশুদের শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে স্কুল হিসাবে ব্যবহার করা হবে। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের নিরাপদ ও স্বাসথ্যসম্মত আবাসস্থল নির্মাণ, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা ও শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রদানের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৯.৬৬ কোটি টাকা। এটি স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকা (এনসিসি) কর্তৃক বাস্তবায়িত হবে। নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর টানবাজার, ইসদাইর ও রিশিপাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

গোপালগঞ্জে বহুতল বিশিষ্ট সমন্বিত সরকারি অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্প- গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এ পূণ্যভূমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান। বর্তমানে এই জেলা শহরে আনুমানিক ৫৫টি সরকারি দপ্তর রয়েছে। তন্মধ্যে ১৬টি দপ্তরের নিজস্ব ভবন না থাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন ভাড়া নিয়ে দাপ্তরিক কাজ পরিচালন করা হচ্ছে। এই ১৬টি দপ্তরের জন্য প্রতিমাসের ৪-৫ লক্ষ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ভাড়া বাবদ ব্যয় হচ্ছে। অন্যান্য জেলা ও উপজেলা শহরেও একই অবস্থা বিরাজমান। এ সকল দপ্তরের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথক ভবনে পরিবর্তে একই স্থানে পরিকল্পিতভাবে সমন্বিত অফিস ভবন নির্মাণ করলে দাপ্তরিক কাজের গতি দ্রুত ও সহজ হবে। এ বিষয়ে গত ১/৩/২০১৬ তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় মাদারীপুরে সরকারি অফিসমূহের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকল জেলা সদরে মাদারীপুর জোর ন্যায় সমন্বিত অফিস ভবন নির্মাণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। এ উদ্দেশ্যে গোপালগঞ্জ জেলা সদরে সকল প্রকার দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত স্থান সংকুলানের ব্যবস্থাকরণ; পেশাদরী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুযোগ প্রদান; পেশাদারী সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা; এবং সুশাসন নিশ্চিতকরণে গোপালগঞ্জে বহুতল বিশিষ্ট সমন্বিত সরকারি অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ২৩টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প- এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ২৩টি পৌরসভার মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবমান উন্নত করা। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হ’ল- প্রকল্প এলাকার পৌরসভাসমূহে পাইপ ওয়াটার সিস্টেমের সূচনা করা; প্রকল্পভুক্ত পৌরসভায়স্যানিটেশন সিস্টেম তৈরী করা; পৌরসভাসমূহের পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বিষয়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এ প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৯১.৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিওবি ২৯৩.১৭ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৬৯৮.৫৭ কোটি টাকা। প্রকল্প সাহায্য প্রদানকারী সংস্থা আইডিবি। এটি স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) কর্তৃক বাস্তবায়িত হবে।

আজকের একনেকের অন্যন্য প্রকল্পগুলো হলো- সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (৩য় পর্যায়)” প্রকল্প, আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-টাঙ্গাইল সড়কের ৬ষ্ঠ কিলোমিটারে ১০৩.৪৩ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ, সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প এবং যমুনা নদীর ভাঙ্গন হতে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলায় খুদবান্দি, সিংড়াবাড়ী ও শুভগাছা এলাকা সংরক্ষণ প্রকল্প।

আজকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৫ম একনেক সভায় মোট ৫ হাজার ১৮০ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে জিওবি ৪ হাজার ৪৬২ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা, সংস্থার নিজস্ব তহবিল ১৯ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৬৯৮ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা।
আজকের একনেক সভায় মন্ত্রীবর্গসহ উবর্ধতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একনেক শেষে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।