নতুন পাঠ্যবই অপেক্ষা করছে কোমলমতি শিশুদের জন্য

30

সাব্বির নেওয়াজঃ কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই হাতে পেত না এক দশক আগেও। বই পেতে কখনও কখনও তিন থেকে চার মাস লেগে যেত তাদের। তবু শিশুদের অপেক্ষার প্রহর ফুরাত না। পাল্টে গেছে সেই চিত্র। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিশুরা এখন শিক্ষা বছরের প্রথম দিনে পাঠ্যবই হাতে পায়। এ বছরের চিত্র আরও আশাব্যঞ্জক। এবার প্রায় এক মাস আগেই ছাপা হয়ে গেছে বিনামূল্যের ৩৫ কোটি বই। পৌঁছে গেছে তা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের হাতে। নওগাঁর রানীনগর উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন হাসতে হাসতে বলেন, ‘আসলে বই-ই এখন অপেক্ষা করছে শিশুদের জন্য!’

‘এটাই বাস্তবতা’- বলছিলেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা। তিনি বলেন, ‘বই বিলম্বে পাওয়ার দিন এখন অতীত। আগেভাগে ছাপা হয়ে উপজেলার গোডাউন ও স্কুলগুলোতে গিয়ে এখন বই-ই শিশুদের অপেক্ষায় থাকে। আমাদের সার্বিক প্রচেষ্টা ও মুদ্রণ শিল্প মালিকদের সহযোগিতায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যথাসময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।’ এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, এবার ৩৫ কোটি বই-ই দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ছেপেছে। এতে গতবারের চেয়ে অন্তত ১০০ কোটি টাকা কম খরচ পড়েছে।

আগামী ১ জানুয়ারি সারাদেশে পাঠ্যপুস্তক উৎসব অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের মূল ভেন্যু ঢাকায় দুটি স্থানে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই দিন সকালে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় আজিমপুর সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণ করবে। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘আজিমপুর সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন আমাদের জানানো হয়েছে। তার অসুস্থতার কারণে ভেন্যু পরিবর্তন করা লাগতে পারে।’

সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ের শিক্ষা অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল বইয়ের শতভাগই তারা নিজ নিজ এলাকায় বুঝে পেয়েছেন। কোথাও কোথাও সহপাঠ, বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার- এ ধরনের দু’একটি বই বাকি আছে। সেগুলোও আগামী দু’একদিনের মধ্যে পৌঁছে যাবে। রংপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মোসাম্মাৎ রোকসানা বেগম বলেন, ‘সব বই-ই ছাপা হয়ে ঢাকা থেকে চলে এসেছে। বই বুঝে পেয়েছি। এসব বই উপজেলাগুলোতে বিতরণের কাজও শেষ। এখন আমরা পাঠ্যপুস্তক উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

মাগুরা সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মালা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগর ও ইবতেদায়ি সবই পেয়েছি। এ বই উপজেলাগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে এখন। বই নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। নেই কোনো শঙ্কাও।’

পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘মূল বই সবই পেয়েছি। ব্যাকরণ বই কিছু বাকি আছে। জেলার ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই বিতরণ করে দিয়েছি। ১৬ ডিসেম্বরের পরে বাকি ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেও বই পৌঁছে দেওয়া হবে।’

সারাদেশে বই ছেপে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল কর্মকর্তা এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘মোট ৩৫ কোটি বইয়ের ৯৬ শতাংশই গত ১৩ নভেম্বরের মধ্যে সারাদেশে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুটি বড় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রক্রিয়াধীন কিছু বই ছিল। সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর ১১ লাখ বই নিয়ে ১১টি ট্রাক ঢাকা থেকে ছেড়ে গেছে। সব বই-ই এখন উপজেলাগুলোতে পৌঁছে গেছে।’ তিনি জানান, দুটি স্থানে পাঠ্যবইবাহী ট্রাক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ায় এক লাখ ৫ হাজার বই নষ্ট হয়েছিল। সেগুলোও পুনরায় ছেপে যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, আগামী ১ জানুয়ারি ২০২০ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে সারাদেশের ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৯৮ জন ছাত্রছাত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হবে ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৩৮ কপি পাঠ্যবই। এ বই ছাপতে ব্যবহার করা হয়েছে ৮৮ হাজার মেট্রিক টন কাগজ। শিশুরা খালি হাতে স্কুলে গিয়ে ওইদিন নতুন ক্লাসে উঠে ঝকঝকে বই নিয়ে আনন্দচিত্তে বাড়িতে ফিরবে। তারা জানান, সব বই এবার দেশেই ছাপা হয়েছে। সারাদেশের প্রায় ৪০০ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের (প্রিন্টিং প্রেস) ৯৮ হাজার কর্মী রাত জেগে পাঠ্যবই ছাপা, কাটিং ও বাইন্ডিংয়ের কাজে জড়িত ছিলেন। আর এসব বই ছেপে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে কাজ করেছে ১৬ হাজার ৪০০টি ট্রাক।

এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) মীর্জা তারিক হিকমত বলেন, ‘২০২০ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের বই ছাপতে সরকারের ৯২৯ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। মাধ্যমিক ও মাদ্রাসার দাখিল স্তরের বই ছাপতে খরচ হবে ৪৬৯ কোটি টাকা। মাধ্যমিক স্তরের প্রায় আট কোটি বইয়ের কাগজ কিনে দেই আমরা। তাতে আরও ব্যয় হবে ১৯৭ কোটি টাকা। আর প্রাথমিক স্তরের বই ছাপতে খরচ হবে ২৬৪ কোটি টাকা।’

এনসিটিবি সূত্র জানায়, আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৩২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৬ জন কোমলমতি ছাত্রছাত্রীর জন্য ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৬ কপি বই ৬টি লটে ছাপানো হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) দুই কোটি ৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৫ ছাত্রছাত্রী হাতে পাবে ৯ কোটি ৮৫ লাখ ৫ হাজার ৪৮০ কপি বই। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৯৭ হাজার ৫৭২ জন শিশুর জন্য প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির জন্য পাঁচটি ভাষায় রচিত ২ লাখ ৩০ হাজার ১০৩ কপি বই ছাপানো হয়েছে। ইবতেদায়ি (মাদ্রাসার প্রাথমিক) স্তরের ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৫ জন শিশুর জন্য দুই কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫ কপি বই ছাপানো হয়। এর সঙ্গে সারাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ছাপানো হয় ৯ হাজার ৫০৪টি বই। মাধ্যমিক স্তরে মোট ছাপা হয়েছে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই। এর বাইরে কারিগরি স্তরের জন্য ১৬ লাখ ৩ হাজার ৪১১ কপি বই, এসএসসি ভোকেশনাল এর জন্য ২৭ লাখ ৬ হাজার ২৮ কপি বই এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের জন্য ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৫ কপি বই ছাপানো হয়েছে।

২০১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকার ধারাবাহিক সাফল্য হিসেবে নতুন বছরের শুরুতেই সারাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে আসছে। চলতি ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২৯৬ কোটি সাত লাখ ৮৯ হাজার ১৭২ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রতি বছর সরকারের বিশাল এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করছে; যা সারাবিশ্বে নজরকাড়া সুনাম বয়ে এনেছে।-সমকাল