ধুলায় দমবন্ধ জীবন

9

জয়নাল আবেদীনঃ রাজধানীর জুরাইন-পোস্তগোলা ধুলার রাজ্য হিসেবে পরিচিত। ধুলার দূষণ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের জায়গায় পানি ছিটাতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকলেও সিটি করপোরেশন তা মানছে না। আদালতের নির্দেশনা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পরও বায়ুদূষণ রোধে সরকারের তৎপরতা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অবকাঠামো নির্মাণের বেলায়ও আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। ফলে দূষণ জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। কয়েকটি এলাকায় দমবন্ধ হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবন।

বায়ুদূষণে ভারতের রাজধানী দিল্লি প্রায় সবসময়ই আলোচনায় থাকে। সেখানে একাধিকবার পরিবেশগত জরুরি অবস্থাও জারি হয়। অথচ চলতি মাসে বেশ কয়েকবার সেই দিল্লিকেও টপকে যায় ঢাকা। রাজধানীতে দূষণের মানমাত্রা বিপজ্জনক অবস্থায় চলে গেলে তৎপর হয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তখন রাজধানীর কিছু সড়কে পানি ছিটাতে দেখা যায়। দূষণ সৃষ্টিকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু দূষণের ব্যাপক উৎসের তুলনায় সেগুলো খুবই অপ্রতুল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বায়ুদূষণের উৎসে বড় রকম ভূমিকা না রাখলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

অন্যদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আদালতের নির্দেশনা না মেনেই অবকাঠামো নির্মাণ কাজ চলছে। চারপাশ ঘেরাও করে কাজ করা এবং নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখার কথা বলা হলেও তা মানা হচ্ছে না। নির্মাণ কাজ চলার সময় দিনে একাধিকবার পানি ছিটানোর কথা থাকলেও সেটি করতে দেখা যায় না। গত তিন দিন রাজধানীর পুরান ঢাকা ঘুরে ভয়াবহ বায়ুদূষণের চিত্র দেখা গেছে। দুপুরে প্রখর রোদের আলোয়ও জুরাইন- পোস্তগোলার সড়ক এবং নয়াবাজার থেকে বুড়িগঙ্গা সেতু পর্যন্ত চারপাশ অন্ধকার দেখাচ্ছিল। টিপু সুলতান রোডে একাধিক নির্মাণ কাজ চলছে। তবে কোথাও আদালতে নির্দেশনার প্রতিফলন দেখা যায়নি। নির্মাণসামগ্রী খোলা রাখায় ধুলা উড়ছিল।

ওয়ারীর টিপু সুলতান রোডের ১৮/বি নম্বর হোল্ডিংয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। পাশেই চলছে একটি পুরোনো ভবন ভাঙার কাজ। পাশাপাশি দুটি অবকাঠামোর কাজ চলায় বাতাসের সঙ্গে মিশে ধুলা ঢুকে পড়ছে আশপাশের বাড়িঘরে। চারপাশ ঘিরে রাখা এবং নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখার কোনো নিয়মই মানা হয়নি। কর্মরত শ্রমিকদের কাছে জানতে চাইলে, তারা এসব নিয়মের বিষয়ে অবগত নন বলে দাবি করেন।

জুরাইন এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া জানান, সিটি করপোরেশনের পানি এই এলাকায় এক দিনও ছিটানো হয়নি। দিনরাত সমানে ধুলা ওড়ে। ঘর থেকে বাইরে পা রাখলেই ধুলায় একাকার। কর্মস্থলে যেতেও মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে।

গেণ্ডারিয়ার গৃহিণী মমতাজ বেগম বলেন, ‘সারাদিন ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। কোনো কারণে কয়েক মিনিটের জন্য খুললেই ঘরের ভেতরটা ধুলায় ভরে যায়। বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। স্কুলে যাওয়ার সময় মুখোশ (মাস্ক) পরিয়ে দিই। তাতেও ধুলার দূষণ থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। সব মিলিয়ে খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে দমবন্ধ অবস্থায় বসবাস করছি।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রচলিত আইনেই বায়ুদূষণ অনেকখানি রোধ করা সম্ভব। কিন্তু তা মানা হয় না। পানি ছিটানোর ক্ষেত্রেও যথাযথ নির্দেশনা মানতে দেখা যায় না। শীতকাল শুরুর আগেই ঢাকার চারপাশে একযোগে ইটভাটাগুলো চালু হয়েছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ নেই। এগুলো বায়ুদূষণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

অন্যদিকে, বায়ুদূষণ রোধে সরকারের তৎপরতার অংশ হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে পানি ছিটানো হলেও তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পানি ছিটানোর ধরন নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়কমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেছিলেন, ‘এটা তো পানি ছিটানো নয়, এটাকে বলা চলে ঢেলে দেওয়া। এতে করে বায়ূদূষণে তেমন প্রভাব পড়ে না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ঝরনার মতো ওপর থেকে পানি ঢালব।’ গত সোমবার আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেছিলেন। তবে ওই বৈঠকের পরও সড়কে পানি ছিটানোর ধরণে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

বায়ুদূষণ রোধে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানালেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী। তিনি বলেন, তারা প্রতিদিনই বাতাসের মানমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন। বায়ুদূষণের মূল উৎস অনেক। এ জন্য নিয়ন্ত্রণ করাটা চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। গাড়ি বৃদ্ধি পাওয়া এবং একই সঙ্গে নানা রকম অবকাঠামো নির্মাণের কারণে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সব সংস্থার সমন্বয় ছাড়া তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

দূষণ বাড়ে সন্ধ্যার পর :বায়ুদূষণের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, দিনের চেয়ে রাতে দূষণের মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়। সরকারের তৎপরতায় দিনে কিছুটা কমলেও বিকেল থেকে দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বিকেল ৫টার পর থেকে রাতভর মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে ঢাকার বাতাস। গত বৃহস্পতিবার রাতে এয়ার ভিজুয়ালের র‌্যাংকিংকে এক ঘণ্টার জন্য দূষণের তালিকায় শীর্ষে উঠে যায় ঢাকা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ও ব্যবস্থাপনা) জিয়াউল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, কুয়াশার সঙ্গে দূষিত বস্তুকণার মিশ্রণে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। বিশেষ করে বাতাসে যখন কুয়াশার প্রলেপ থাকে, তাতে দূষিত বস্তুকণা মাটিতে পড়ে না। ফলে দূষণ বেড়ে যায়। তবে বৃষ্টি হলে মাটিতে সেগুলো মিশে গিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায়।

রাতে ঢাকায় দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির বড় কারণ বর্জ্য পোড়ানো। বর্তমানে ঢাকা শহরে ৪০টি স্থানে রাতের বেলায় বর্জ্য পোড়ানো হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাতাস দূষিত হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ এই বর্জ্য পোড়ানো। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সোমবারের সভায় রাতে বর্জ্য না পোড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।-সমকাল