দেশে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে হেগে যাচ্ছেন সু চি

5

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি সর্বশেষ ২০১৬ সালে পশ্চিম ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন। দেশটির জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। সে সময় সু চি প্রশংসিত হয়েছিলেন ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ হিসেবে। তিন বছরের ব্যবধানে এবার রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ মাথায় নিয়ে ইউরোপে যাচ্ছেন তিনি। যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে তিনি বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিলেন, এবার তাদেরই গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইতে সেখানে যাচ্ছেন। রয়টার্সের বিশ্নেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই সু চি নেদারল্যান্ডসের হেগে যাচ্ছেন বলে মনে করেন পশ্চিমা বিশ্নেষকরা।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে গত ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মামলা করে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোট ওআইসির সমর্থনে গাম্বিয়ার ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ এবং তাদের আবাসন ধ্বংস করেছে মিয়ানমার। এই মামলার শুনানিতে অংশ নিতে আগামী ১০ ডিসেম্বর হেগে যাচ্ছেন সু চি। সেখানে তিনি দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ খণ্ডন করবেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সু চির কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষায়’ আগামী ১০ ডিসেম্বর গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রথম শুনানিতে অংশ নেবেন তিনি। সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির মুখপাত্র মিও নিয়ান্ত বলেছেন, ‘মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে আসলে কী ঘটেছিল জাতিসংঘের আদালতে তার ব্যাখ্যা দেবেন রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার শুনানিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে সু চি থাকায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে সু চির- এমন ঘনিষ্ঠজনরা এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এতে করে বিদেশে তার ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তবে এসবের তোয়াক্কা করছেন না তিনি। এর বড় কারণ, আগামী বছর মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে দেশটির সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সমর্থন ধরে রাখতেই সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়বেন সু চি। গত সপ্তাহে তার হেগে যাওয়ার বিষয়টি সমর্থন করে দেশটিতে মিছিল হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আরও মিছিল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সু চির সাবেক মিত্র কো কো জিই বলেন, ‘এখন সারাদেশে মিছিল হচ্ছে। এটা তার ভাবমূর্তি শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা। তবে অনেকেই মনে করছেন, এর সবটাই রাজনীতি।’ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপে নিযুক্ত মিয়ানমারের পরামর্শক রিচার্ড হর্সে বলেন, ‘মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষ রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগকে পক্ষপাতমূলক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে মনে করে। আর এর বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ ভূমিকা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সু চি।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কারেন রাজ্য কর্তৃপক্ষ তিন সেনার সঙ্গে সু চির হাস্যোজ্জ্বল ছবি দিয়ে কয়েক ডজন বিলবোর্ড প্রদর্শন করেছে। এতে নিচে লেখা রয়েছে, ‘আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’ এ কারণে খোদ মিয়ানমারেরই অনেক ভিন্নমতাবলম্বী মনে করেন, স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাইছেন সু চি।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে গণহত্যার আলামত। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সু চি’ও রোহিঙ্গাদের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হন। বরং বরাবরই গণহত্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন তিনি। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতেও কোনো উদ্যোগ নেননি সু চি। দেশটির সেনাবাহিনীর মতো মিয়ানমার নেত্রী সু চি’ও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেন না।-সমকাল