দুঃখের দরদী আমার জনম দুঃখী মা!!!

ইঞ্জিনিয়ার সরদার মোঃ শাহীনঃ ডিম দেবার পরে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় মা মাকড়শা। ডিমগুলো যাতে অন্য কোন প্রাণী খেয়ে ফেলতে না পারে সেই ভয়ে সে অস্থির থাকে। কোথায় রাখবে, কিভাবে রাখবে এ নিয়ে চিন্তার যেন শেষ নেই। এত বড় পৃথিবীর কোথায়ও সামান্য নিরাপদ জায়গা না পেয়ে শেষমেষ নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে রাখে ডিমগুলোকে। এভাবে চলাফেরায় তার সমস্যা হয়। কিন্তু আগত সন্তানদের ভাবনায় সব সয়ে যায়, সব মেনে নেয়। এক পর্যায়ে সময় আসে; ডিমগুলো ফুটে বাচ্চা বের হবার সময়। মা মাকড়শার কষ্টের বুঝি শেষ হয়! খুশীর আর সীমা থাকে না মা মাকড়শার!
বাচ্চা হবার পর শুরু হয় নতুন সমস্যা। এতগুলো বাচ্চা খাবার পাবে কোথায়? ক্লান্ত দেহের শ্রান্ত মা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে না। শেষমেষ হাতের কাছে মায়ের দেহ থাকে বিধায় বাচ্চাগুলো মায়ের দেহের রক্ত মাংশ খাওয়াই শুরু করে। এভাবে ওদের জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ওরা বড় হতে থাকে। দুখিনী মা নীরবে কঠিন কষ্ট হজম করে; কিন্তু বাঁধা দেয় না। অবশেষে এক পর্যায়ে বুকধারিনী মায়ের দেহকে শুকনো খোসায় পরিণত করে নির্মম পাষন্ডের মত বাচ্চাগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে নিজেদের জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। মৃত মায়ের দিকে ফিরে তাকাবার সময় ওদের হয় না!
এই হলো মা; সামান্য মাকড়শার অসামান্য মা! নিজের জীবন নিঃশেষ করে সন্তানের জীবন শুরু করে দিয়ে যায়। আমাদের মত মানব সন্তানদের এত নিষ্ঠুরভাবে জীবন শুরু করতে হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন কাজের ভীড়ে দু’এক বেলা মাকে ভুলে যাই কিংবা আমার শোনিমকে পেলে আর কিচ্ছু মনে থাকে না, তখন মাকড়শার বাচ্চার চেয়েও অধম মনে হয় নিজেকে। নিজেকেই নিজে ছিঃ ছিঃ করি। মাকড়শার বাচ্চার মত এতটা নির্মম ভাবতে ভীষন লজ্জা লাগে।
তবে সবাই আমার মত না। ব্যতিক্রমও আছে। আমার এক সহকর্মী আছেন; বয়সে যথেষ্ঠ তরুণ। বিয়ে করেছেন বছর দু’য়েক হলো; ইতিমধ্যেই সন্তানের বাবাও হয়েছেন। একদিন ভুলে আমার ডেস্কে তার মোবাইলটি ফেলে রেখে যায়। একটু পর শুরু হয় তার মোবাইলে ফোন আসা। আমি অতিষ্ট হয়ে তার মোবাইলের মনিটরে আড়চোখে তাকিয়ে ফোনকারীর নামটি দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম “প্রাণ” নামে কেউ একজন ফোনটি করেছে। ভাবলাম নতুন দম্পতি। তাই এই অবস্থা। একটু পরে সহকর্মী হন্তদন্ত হয়ে আমার রুমে ফিরলেন মোবাইলটি নেবার জন্যে। তাকে একটু খোঁচা দিয়ে তার প্রাণের ফোনের কথা বললাম। শুনে কাল বিলম্ব না করে প্রাণকে ফোন দিলেন।
ও পাশ থেকে কী বলেছে আমি শুনছি না। কিন্তু এ পাশ থেকে তিনি যা বলছিলেন তা আজও আমি মনে রেখেছি। তিনি বলছিলেন, মা, ও মা। ভুলে ফোনটি আমি অন্য রুমে ফেলে রেখে গিয়েছিলাম। তাই আপনার কলটি ধরতে পারি নাই। মা, মা, ও মা। আমি খেয়ে নিবো নে। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি খাইছেন তো? আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি এখনি খাবো। আপনি এক্ষুনি খেয়ে নেন। এমনি প্রচন্ড মা ভক্ত ছেলে দেখে মনে মনে স্যালুট করেছিলাম তাকে। এমন না হলে চলে! ভাগ্যবতী মা; ভাগ্যবান ছেলে। মা থাকতে মাকে কদর করছেন। মায়ের সামান্য অসুখ করলে অস্থির হয়ে যান সহকর্মী আবুল হোসেন; ডাক্তার দেখান। মাঝে মাঝে ভাবি কোন একদিন মাকে হারিয়ে এই মানুষটি বেঁচে থাকবেন কিভাবে?
আমি দিব্যি বেঁচে আছি আজ পাঁচ বছর হলো। এককালে যে আমি মাকে ছাড়া মাত্র পাঁচ মিনিট একা থাকতে পারতাম না, সেই আমি পাঁচটি বছর একা একা পার করে দিলাম! ওই পারে বসে মা কি এসব দেখছেন! মা ইন্তেকাল করেন ২০১১ সালের ১৯ জুলাই গভীর রাতে। ২০ তারিখ সন্ধ্যের আগে আগে প্রচন্ড বাদলা দিনে মায়ের দাফন করি। সেই শেষ দেখা! সেই থেকে প্রতি বছর জুলাই মাসের ১৯ আসে, ২০ যায়; আমার দরদী মায়ের মায়াভরা মুখটি আর দেখা যায় না!
সাধারণত কোন লেখা শুরু করতে আমার ৭ মিনিটও লাগে না। বসলেই লাইনের পর লাইন লেখা হয়ে যায়। কিন্তু মাকে নিয়ে লেখা শুরু করতেই লাগে ৭ দিন। আমার দুটো চোখের কারনেই লাগে। ফাজিল চোখ দুটো এত ভিজে যায় যে সব কিছু আবছা লাগে; কিছু দেখা যায় না, লেখা যায় না। কোথা থেকে যে এত পানি আসে! যত চোখ মুছি, তত পানি আসে; আসতেই থাকে! কোনভাবে সামলে আটঘাট বেঁধে টেবিলে বসি। বসতেই মায়ের সেই মুখ! হাসিভরা মুখ!!
এমনি হাসিমাখা মুখে মা আমার অবলীলায় মিথ্যে বলতে পারতেন। সত্যি বলছি, মা মিথ্যে বলতেন। কেবল আমার মা নন, সবার মা-ই মিথ্যে বলেন। ঘরে যখন ৩ জনের খাবার থাকে আর মানুষ হয় ৪ জন, তখন মা বলে, তোরা খা। আমি একটু আগেই খেয়েছি। আমাদের ছোটবেলায় সবার খাওয়া শেষে মুরগীর ছোটখাট একখানা হাড় চিবানো ছাড়া মায়ের ভাগে আর কিছু পড়েছে বলে মনে পড়ে না!
নিজের ভাগে ঠিকমত খাবার না পড়লেও সংসারের সবার কষ্টের ভাগ মাকেই নিতে হতো। মা হলো ব্যাংকের মত। মা এমনই একটি ব্যাংক, যেখানে আমাদের সব রাগ, অভিমান, কষ্ট জমা রাখতে পারতাম। আব্বার অফিসে ঝামেলা? তুমি কোন কথা বলবা না, মেজাজ খুব খারাপ! যেন ঝামেলাটা মা পাকিয়েছেন! ভাইয়ার রেজাল্ট খারাপ? সব দোষ মায়ের। কষ্টে মা কাঁদছেন! ভাইয়া খিটমিট করে বলছেন, মা, এত ফেছর ফেছর করোনা তো! তবু মা ফেছর ফেছর করেন!
মৃত্যুর আগে একটানা ৩২ মাস অচেতন মনে, অবশ দেহে মা আমার বিছানায় পড়ে ছিলেন। সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েও আমার মনে হত পুরো পৃথিবীর বাইরেও ঘরে আমার এক বিরাট শান্তির পৃথিবী আছে। হোক না হয় অবচেতন মনের মা, কিন্তু বেঁচে তো আছেন! প্রচন্ড মন খারাপ করে ঘরের আলো নিভিয়ে যখন চোখ বুঁজে থাকতাম, মনে হত অদৃশ্য একজোড়া চোখ হাসপাতালের বেডে শুয়ে থেকেও আমার ছায়া দেখে গেছে। আজ আমার অনেক পৃথিবী আছে। কিন্তু আমার ছায়া দেখার সেই পৃথিবীটি কেবল নেই!
আমার মায়ের প্রচন্ড মাথা ব্যথা ছিল। দিনে ১০টা ডিসপ্রিনও খেতে হতো মাঝে মাঝে। প্রায় সময়ই শুয়ে থাকতেন অসুস্থ মা আমার; চোখের পাতা খোলার শক্তি নেই। তবুও ঠোঁট নেড়ে বলতো, বাসী খাবার খাসনে বাবা! তোরা কে আছিস, ওকে একটু গরম করে দে। তরকারী ভাল হয়নি বলে রাগ করে যেদিন খাইনি, সেদিন ভুলে গেছি, এমন অনেক দিন কিছু একটা মুখে দিতে গিয়েও মা সেটা তুলে রেখেছিল। আমি যদি চাই আরেকবার! মায়ের আঁচলের গিট, অথবা তোষকের ভাঁজ সরিয়ে টাকা সরানোর সময়ও কোনদিন বুঝিনি, আমি নিবো জেনেও মা কেন টাকা সরিয়ে রাখেনি। আমার সব ইচ্ছা, সব ব্যথা মা নিজ থেকেই বুঝতে পারতো।
ব্যথা মাপার ইউনিট কি আমি ঠিক জানি না। কিন্তু এটা জানি, একজন সাধারণ মানুষ ৪৫ ডেলস ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে পারে। তবে একজন মা পারে ৫৭ প্লাস। একসাথে শরীরের ২০টি হাঁড় ভেঙে যাওয়ার ব্যথার থেকেও কষ্ট। সন্তান জন্মের সময় মাকে এই ব্যথা সহ্য করতে হয়। সব মায়েরাই এই ব্যথা সহ্য করেন। কিন্তু অধিকাংশ সন্তানই মায়ের সামান্য ব্যথাও সহ্য করতে পারে না। অচিরেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মা একাই তার ৫ জন সন্তানকে সেবা করতে পারেন, লালন পালন করতে পারেন। আর আমরা ৫ জন সন্তান মিলেও মায়ের সেবা করতে পারি না!
আমরা সন্তানেরা অধমেরও অধম; অনেক কিছুই পারি না। চাইলেও মৃত মাকে আর দেখতে পারবো না! হাদিস কোরআনে কী আছে ভাল করে জানিনা; জানার চেষ্টা যে করিনি তাও নয়। আজতক কেউ পরিস্কার করে বলেওনি আমাকে। জানি না আবার দেখা হবে কি না। নাকি আতর গোলাপ মেখে ধবধবে সাদা কাফনে জড়িয়ে কবরে শুইয়ে শেষবারের মত ঢেকে দেবার আগে সোনামায়ের চাঁদমাখা যেই মুখটি আমি দেখেছিলাম, সেটিই দুঃখের দরদী আমার জনম দুঃখী মায়ের শেষ দেখা কি না!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা