দায়মুক্তি —

16

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ আমি তখন অদৃশ্য অনুজীবের সাথে লড়াই করছি। সে এক কঠিন সময়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের জীবনের দায়- দেনার হিসাব মেলাচ্ছিলাম।

সুজনেষু হারুন মোল্লা। আমার ভালো লাগা মানুষদের একজন। আমার লেখা বই ‘দেখা হয় নাই চক্ষুমেলিয়া’, প্রকাশকালে হারুন ভাই মানিকগঞ্জ থেকে ফোন করে আমাকে অভিনন্দন জানান। “বইটির দাম কত? কীভাবে পেতে পারি?” জানতে চেয়েছিলেন। ‘প্রিয় কমরেড টাকার কথা বলছেন কেন? আমি নিজ দায়িত্বে আপনার হাতে বই দুটি পৌঁছে দেব।’ করোনাকাল- লকডাউনের কারণে সে দায় রয়েই গেছে।

রফিকুল আজিজ বলে আর এক সুহৃদ যার সাথে আমার কোন দিন দেখা হয়নি। ফেবু সূত্রে যোগাযোগ। টেলিফোনে দু’একবার কথা হয়েছে। আলাপচারিতায় বুঝেছি তিনি একজন বোদ্ধা- আলোকিত মানুষ। কথা দিয়েছিলাম তাঁর অফিসে চা খেতে যাবো। ব্যাটেবলে সংযোগ হয়নি। আমার প্রথম প্রকাশিত বই ‘কথকতায় মুক্তিযুদ্ধ’ বাহক মারফত তাঁর হাতে পৌঁছে দেই। সুন্দর মন্তব্যসহ কৃতজ্ঞতা জানান। ইতোমধ্যে তিনি চাকরি সূত্রে ঢাকা বদলি হয়ে এসেছেন।
আবারও চায়ের দাওয়াত দেন। বলেছিলাম আপনার সাথে আমার শীঘ্রই দেখা হবে। কিন্তু কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। লকডাউন–।

বেলি নামে বিশ্ব বিদ্যালয় জীবনে আমাদের এক ক্লাসমেট ছিল। ইনোসেন্ট- পুতুলের মত দেখতে। মাস্টার্স শেষ করে সবাই তখন চলে যাচ্ছে। কতকথা, কত আবেগ, কত চোখ ছলছল করে। অনেকে আবেগ ধরে রাখতে পারবেনা, তাই না বলেই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছে।
রাজনীতির কারণে আমি তখনো ক্যাম্পসে রয়ে যাই।
ডিপার্টমেন্টের করিডোরে বেলির সাথে দেখা। ডায়েরি বের করে অটোগ্রাফ চাইল। “বেলি, যতদূরই যাওনা কেন আবার দেখা হবে।”
বেলির সাথে শেষ কথা। ‘শিশির আপনি ক্যাম্পাস ছাড়বেন না? বিয়েথা, ঘরসংসার —থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, বিয়ে করলে তুমি জানবে- কার্ড পাবে। কার্ড না পেলে জানবে বিয়ে করা হয়নি। বেলির চোখে সেদিন পাপড়ি ভিজা জল দেখেছি।
অনেক দিন পরে মার্কেটে এক বান্ধবীর সাথে বেলির দেখা। কথা প্রসঙ্গে বেলি বলে আমাদের মধ্যে শুধু শিশির একমাত্র বন্ধু যে এখনো বিয়েথা করেনি।
তুমি কী বলছো?
হ্যাঁ! সে বিয়ে করলে আমি অবশ্যই দাওয়াত পেতাম। আমি বেলির বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারিনি।

অসুখের সময় হঠাৎ আমার দই খেতে ইচ্ছে করে। আমার মিসেস বললেন “এসময় দই খাওয়া যাবেনা। গলায় ঠান্ডা লাগবে, ব্যথা হতে পারে।”

বছর তিনেক আগের কথা। আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন Baten Banik এর নিজ শিক্ষালয় বেতিল হাই স্কুলের ৫০তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান পালিত হয়। বাতেন স্কুলের সুন্দর ছবিসহ একটি পোস্ট দেয়। আমি মন্তব্যে রসিকতা করে লিখেছিলাম, বেতিল হাই স্কুল বেতিলের দই এর মতই প্রসিদ্ধ। মেনুতে নিশ্চয় দই থাকবে? দাওয়াত পেলে যেতাম। বাতেন রিপ্লাই দেয় “দাওয়াত না পেলেও বেতিলের দই আপনি পাবেন।”

কত চন্দ্রভুক আমাবস্যা চলে গেল। প্রিয় বাতেনের সেই ‘বেতিলের বিখ্যাত দই’ আর খাওয়া হলোনা।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলেছি হে আল্লাহ! আমি যদি মরে যাই আমার যত দায় – তুমি দায়মুক্তি দিও। বেঁচে উঠলে দায় পরিশোধের সুযোগ করে দিও।
হে আল্লাহ! বাতেন যেন তার দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয় সেকথা তুমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিও।-লেখকঃ একজন সমাজকর্মী।
২৭ জুন, ২০২০ খ্রিঃ
লেক সার্কাস, ঢাকা।