তোর পাশে মা ঠাঁই যদি পাই , মরণে ভয় করবো না!!!

14

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর কথা দেশবাসী কেন, আমাদের পরিবারের কোন কোন সদস্যেরও মনে থাকে না। কেউ কেউ আছেন, মনে রাখার চেষ্টাও করেন না। সারা বছরও করেন না, এই দিনটিতেও না। চেষ্টা করবেন কি! বিষয়টিকে তো গায়েই মাখেন না। তবে দেশবাসীর কথা ভিন্ন। দেশবাসীর কোনমতেই মনে থাকার কথা না। মনে রাখার প্রশ্নই উঠে না। অন্য দশজনা গৃহবধুর মত মা একান্তই গৃহিনী ছিলেন। ঘর সংসারের বাইরে কোনকালেও যাননি। তাই কাছের এবং প্রিয়জনেরা ছাড়া আর কারো তাঁকে মনে রাখা ভাল, চেনারও কথা না।
কিন্তু বড় বড় বিখ্যাত মানুষদের দেশবাসী বেশ ভালো করেই চেনে এবং তাঁদের মৃত্যুবার্ষিকীর কথা অনেকে মনেও রাখতে পারে। অসম্ভব জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের প্রয়াণ দিবসটিও তেমনি। অনেকের মত আমারও সব সময়ই মনে থাকে। মনে হয় এইতো সেদিন। আমেরিকা থেকে পিলে চমকানো সংবাদটি এলো। খুবই খারাপ সংবাদ। অপারেশন পরবর্তী ধকল সামলাতে পারেননি। ডাক্তারের সব চেষ্টা ব্যর্থ প্রমান করে অবশেষে তিনি চলেই গেলেন।
হুরমুর করে খবরটি নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় চলে এলো। মিডিয়ার মাধ্যমে সারাদেশে খবরটি চাউর হতে একটুও সময় লাগল না। এবং মূহুর্তেই দেশবাসী শোকে বিহ্বল হয়ে পড়লো। এমন কাউকে পাইনি যে বা যিনি খবরটিতে কষ্ট পাননি। কষ্ট পাবার মতই বিষয়। এত নামিদামী এবং তুমুল জনপ্রিয় একজন লেখকের অকাল প্রয়াণে পুরো দেশবাসী কষ্ট পাবে এটাই তো স্বাভাবিক। বাংলা সাহিত্যে অনেক গুণী মানুষ আছেন। কিন্তু তার মত বহু গুনে গুনান্বীত এত মেধাবী গুণী ক’জন আছেন!
এমনি একজন মেধাবী গুণীকে পেতে বাংলাদেশ তথা পুরো বাঙালী জাতিকে কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে! মানুষটি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৬৪ বছরেই চলে যান। মাত্র তো বটেই। আজকাল অনেক বাংলাদেশী অনায়াসেই ৮৪ বছরও আয়ু পান। তিনি পাননি; হয়ত আল্লাহ্ চাননি বলেই পাননি। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন। অনেক অনেক দিন বাঁচতে চেয়েছিলেন। নিজের লেখায় এমনি আকুতিও জানিয়েছিলেন। ভাগ্য তাঁকে সায় দেয়নি। তিনি পারেননি! আল্লাহর ইচ্ছাটাই হয়ত এমন ছিলো; তাকে আগেভাগেই নিবেন। এবং ১৯ শে জুলাইয়ের এক বিকেলে আমাদের মাঝ থেকে তাঁকে আগেভাগেই নিয়ে গেলেন!
ঘটনাক্রমে আমার মায়ের চিরবিদায়ের দিনটিও একই দিনে। হুমায়ুন আহমেদের চলে যাবার ঠিক এক বছর আগে এমনি দিনেই আমার মাও চলে যান।
মা নিজেও অনেকটা অকালেই চলে যান। হুমায়ুনের মত তিনিও বাঁচতে চেয়েছিলেন। বাঁচতে কে না চায়! এমন চমৎকার পৃথিবীর মায়া ছেড়ে কে চলে যেতে চায়! আমাদেরকে ছেড়ে কিছুতেই তিনি চলে যেতে চাননি। প্রায়শই বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে মা আমায় বলতেন, “আমি মরতে চাই না বাবা। তোকে ছেড়ে কিছুতেই যেতে চাই না!!”
আমাকে ছেড়ে যেমনি যেতে চইতেন না। তেমনি মৃত্যুকেও মা আমার ভয় পেতেন। বড় ভয় পেতেন। বেজায় রাগী কিন্তু অতীব সহজ সরল মা আমার কবরকে ভয় পেতেন। একা একা কবরে থাকার কথা চিন্তাই করতে পারতেন না। মাঝরাতে আমার বুকের মাঝে মুখটি রেখে বলতেন, “আমাকে দূরে কোথাও মাটি দিস্নে বাবা! বাড়ির আঙিনাতেই দিস্। কবরে শুয়েও যেন তোকে দেখতে পাই।” কত্তটা আদর যে করতেন মা আমার। সবার ছোট্ট ছিলাম বলে শুধু অনেক বেশী নয়; সবার চেয়ে বেশী আদর করতেন। আদরে আদরে সারা শরীর ভরে দিতেন।
খুব মায়া করতেন আমায়। ছোট বেলায় প্রায় রাতেই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। কখনো মায়ের রাতের রান্না শেষ হতে একটু দেরী হলেই ঘুমিয়ে পড়তাম। আমাকে না খাইয়ে মা ঘুমাতেন না। রান্না শেষে ঘুুম থেকে তুলে কোলের মধ্যে বসিয়ে মুঠি মুঠি লোকমা মেখে মুখে পুরে দিতেন। আমি চোখ মেলতাম না। বন্ধ চোখে হা করে খাবার মুখে নিতাম। মুখে খাবার রেখেই আলতো করে চাবাতে চাবাতে আবার ঘুমিয়ে পড়তাম। মা হাল ছাড়তেন না। একটু একটু করে পুরো খাবার শেষ করিয়ে ছাড়তেন।
মায়ের হাতের ইলিশ ভূনা ছিল জগৎ সেরা। কেমন করে যেন মা রান্না করতেন; আর স্বাদ পেতাম পুরো মুখ জুড়ে। কড়াইয়ের তলা থেকে হাত মুরিয়ে ইলিশের ঝোল তুলে পাতে দিতেন। মাঝে মাঝে কড়াইয়ে ভাত রেখে ঝোলের সাথে মাখিয়ে প্লেটে তুলে দিতেন। এটা ছিল সাংঘাতিক রকমের মজার একটা বিষয়। মায়ের হাতের মাখা ভাত খাবার জন্যে মাঝে মধ্যে ছুঁতো খুঁজতাম। হাতে ব্যথা পাইছি কিংবা হাত কেটে গেছে বললে মা মুচকী হেসে নিজেই ভাত মেখে দিতেন।
কলেজে পড়ার সময়। সংসারের টানাটানিটা বেশ বেড়ে গেছে। নগদ টাকার একটা ক্রাইসিসে আব্বাকে বেশ হিসাব করেই চলতে হয়। আব্বার অসম্ভব প্রিয় চিকন চালের ভাত আর খেতে পারিনা। ইরি ধানের মোটা চাল রান্না হয় ঘরে। বাসায় মেহমান না আসলে কোনমতে মাস পার করা যায়। মেহমান আসলে আর পারা যায় না। আমাদের ছোট তিন ভাইকে নিয়ে বাবা-মায়ের এমনই সংসার। বড় দুই ভাই কর্মজীবনে বেশ ভালই আছেন। একজন বিদেশে, অন্যজন দেশে। বিয়েসাদিও করে ফেলেছেন সময়ের আগেই।
চলেনও বেশ ডাটেফাটেই। দামী পারফিউম মাখেন। আর তাকান কেবলই উপর তলার দিকে। আমাদের দিকে তাকাবার টাইম কোথায়! সামনে তাঁদের অনাগত ভারী সুন্দর ভবিষ্যত। তারা স্বপ্নে বিভোর। রঙিন স্বপ্ন। গাড়ি করবেন, বাড়ি করবেন। আরো কত কিছু করবেন। এমন অবস্থায় আমাদের নিয়ে ভাববার সময় কোথায় তাদের! কদাচিৎ বাসায় আসলেও জাষ্ট মেহমানের মতই আসতেন। এতেই আব্বা আম্মার সে কি আনন্দ! মা ভালো মন্দ রান্নায় বসে যেতেন। আব্বা দৌঁড়ে যেতেন মুরগী আর পোলাওয়ের চাল কিনে আনতে। মন ভরে আপ্যায়ন করতেন।
তারাও খুব হাসিমুখে আপ্যায়ন ভোগ করতেন। শসার সালাদে লেবুর রস চেপে বলতেন, বাহ্ বেশ তো! অনেক রস! জানতে চাইতেন কোন বাজারের লেবু! কিন্তু একটিবারও জানতে চাইতেন না সংসারটি চলছে কিভাবে। আব্বা কেমন করে সব সামাল দিচ্ছেন! কিভাবে আমাদের পড়াশুনা চলছে! ছোট ভাইরা আদৌ পড়াশুনা করছি কিনা সে ব্যাপারেও কোন আগ্রহ ছিল না। অথচ ছোট দু’ভাই তখন কলেজে পড়ছি। ৩য় জন ঘরে বেকার। আব্বা মাস শেষে মায়ের হাতে যা দিতেন তা দিয়েই মা হিসেব করে করে মাস পার করতেন। কেমন করে কিভাবে কী করতেন আব্বা নিজেও বুঝতেন না।
আমার কলেজের পড়া। অন্তত দু’সাবজেক্টে প্রাইভেট না পড়লেই নয়; পদার্থ এবং অংক। বাকীগুলো একাই ম্যানেজ করতে পারতাম। কিন্তু পুরো মাস টেনশানে থাকতাম। টিউটরের টাকার টেনশান। মা কিছুই বলতেন না। নীরব থাকতেন। কেবল মাস শেষে পকেটে পাঁচ’শ টাকার নোটটা গুঁজে দিয়ে গালের কাছে গালটা লাগিয়ে আদর করে দিতেন। আর বলতেন, “আমার মানিক! কিসের টেনশান! আর তো ক’টা বছর বাবা! সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে। বড় হয়ে আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। বড় ইঞ্জিনিয়ার। তখন আমার আর কোন কষ্ট থাকবে না।”
বড় হয়ে মায়ের কষ্ট শেষ করতে পেরেছিলাম কি না জানি না। মায়ের কষ্ট ঘুচানো কি এতই সোজা! আমার বড় হতে হতে মায়ের বুড়ো হবার সময় হয়ে যায়। সাথে শেষ হয়ে যায় তাঁর জীবনের সকল সখ আহ্লাদ। বাকী থাকে না আর কোন চাওয়া পাওয়ার। সর্বকনিষ্ঠ সন্তানদের বেলায় এমনই হয়। বাবামায়ের জন্যে কিচ্ছু করার সময় পায় না। পায় শুধু করতে না পারার চাপা কষ্ট। বাবা-মাকে মন ভরে আদর করতে না পারার কষ্ট। আর এই কষ্ট নিয়েই ওরা বেঁচে থাকে।
মৃত্যু পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তবুও থেমে থাকে না জীবন। জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলতেই থাকে। আজ সেই জীবনের মধ্য গগণে এসে একটি দুটি নয়; শত শত পাঁচ’শ টাকার নোট নাড়াচাড়া করি। কিন্তু প্রতিমাসে মায়ের দেয়া হালকা ছ্যাড়া সেই পাঁচ’শ টাকার নোটটি কোথায়ও খুঁজে পাই না। আজকাল বহু দেশের বহু বড় নোট দেখি; দামী নোট দেখি! কিন্তু আমার পরম পূজনীয় লক্ষ্মী মায়ের হাত থেকে বারবার নেয়া জীবনে দেখা সবচেয়ে দামী নোটটি আর কোথায়ও দেখিনা!! কোত্থায়ও না!!-লেখকঃ- উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।