তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি পেলেও বৈষম্যের শিকার হিজড়ারা

সজিব খানঃ ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে হিজড়াদের স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। তবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি পেলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে হিজড়ারা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

এদেশের হিজড়ারা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। এছাড়া শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ না থাকা, চাকরিতে নিয়োগ না পাওয়াসহ নানা কারণে তারা আয়ের উৎস হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তি ও যৌনকর্ম বেছে নিচ্ছে।

জয়া । যিনি কেবল মাত্র হিজড়া হওয়ার কারণে ভাল ফল নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা সত্ত্বেও ভার্সিটিতে পড়াশোনা করে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করার সুযোগটি পায়নি। অনেক স্বপ্ন ছিল তার যে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, ভালো কোনো চাকরি করবে । কিন্তু সে সুযোগটি তাকে দেওয়া হয়নি।

উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর ‘জয়ার’ বাবা তাকে পাঁচ থেকে ছয়টা কলেজে নিয়ে যান ভর্তি করানোর জন্য। কিন্তু হিজড়া হওয়ায় কোনো কলেজই তাকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়নি। ফলে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের আর সুযোগ মেলেনি তার।

পরবর্তীতে জয়া একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেয়। সেখানে তাকে পরিচয় গোপন রেখে পুরুষের মতো আচরণ ও পোশাক পরে কাজ করতে বলা হয়। সে তাই করতে থাকে। কিন্তু পরে এক সহকর্মী টের পেয়ে গেলে তাকে নানাভাবে যৌন হয়রানির চেষ্টা চালায়। এরপর কতৃপক্ষকে অভিযোগ করলে তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে জয়াকে চাকরি ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন।

এরপর জয়া ওই কারখানার কাজ বাদ দিয়ে একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নেয়। পারিপার্শ্বিক চাপে মাত্র ছয়মাসের মধ্যে সেই কাজটি তার ছাড়তে হয়। তারপর থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন জয়া।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করেন রাণী। সেও একজন তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া। জানালেন, হিজড়া হওয়া সহপাঠীদের কাছ থেকে বিভিন্নসময় নানারকম তিরস্কার সহ্য করতে হয় তাকে।

রাণী অভিযোগ করে বলেন, হিজড়াদের সহযোগিতায় দেশে অনেক ধরনের কাজ হলেও তার সুফল পাচ্ছেন আর্থ-সামাজিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের হিজড়ারা। দরিদ্র ও প্রান্তিক হিজড়াদের অধিকাংশই সে সব সুবিধাবঞ্চিত।

হিজড়াদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক শাহ আহসান হাবীব বলেন, তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়ন না হওয়ার কারণ বিভিন্নরকম সামাজিক ও আইনগত বাধা। এছাড়া সরকার হিজড়াদের অগ্রগণ্য কোনো জনশক্তি মনে করে না। তাই সমস্যা সমাধানেও সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, দুঃখজনকভাবে সাধারণ মানুষ হিজড়াদের শান্তিপূর্ণ জনগোষ্ঠী মনে করে না। তাদের মনে হিজড়াদের নিয়ে এক ধরনের অপ্রকাশিত ভয় কাজ করে। তাই আইনের মাধ্যমে হিজড়ারা স্বীকৃতি পেলেও সাধারণ মানুষ মন থেকে তাদের কতটা মেনে নিয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আহসান হাবীব বলেন, মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হওয়ায় মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তোলার সংস্কৃতিতে হিজড়ারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অনেক সময় টাকা আদায়ের জন্য সাধারণ মানুষকে বলপ্রয়োগ ও দুর্ব্যবহার করে হিজড়ারা। যার ফলে তাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে হিজড়াদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়।

হিজড়াদের এই ভিক্ষাবৃত্তিকে বাণিজ্য হিসেবে না দেখে তাদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে করেন শাহ আহসান হাবীব।

তবে পূর্বের চেয়ে সাধারণ মানুষের মনে হিজড়াদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব কম বলে মনে করেন রাণী। এছাড়া ভিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রে হিজড়ারা সাধারণত বলপ্রয়োগ বা দুর্ব্যবহার করার পক্ষপাতী না বলে জানান তিনি।-আমাদের সময়.কম