তৃণমূলে আওয়ামী লীগের চিঠি: বাস্তবায়ন হয় না আদেশ

18

রেজাউল করিম প্লাবন ও হাসিবুল হাসানঃ কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত দলীয় নেতাদের তথ্য চেয়েও পায়নি আওয়ামী লীগ। ফলে দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের পরপরই নেয়া এই উদ্যোগ ঝিমিয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারীদের নাম চাওয়া হয়েছিল তৃণমূলের কাছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও তা কেন্দ্রে জমা হয়নি।

জেলা-উপজেলায় নিজস্ব কার্যালয় নির্মাণে দলের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি আজও। দলে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কেন্দ্রের নির্দেশও উপেক্ষিত দীর্ঘদিন ধরে। ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরিতে কেন্দ্রীয় নির্দেশ পালন করেনি তৃণমূল।

সব স্তরের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার চিঠি তৃণমূলে গেলেও গা করেনি অধিকাংশ সাংগঠনিক ইউনিট। দলের এসব আদেশ বিভিন্ন সময়ে চিঠি আকারে ডাকযোগে পাঠানো হলেও আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

আওয়ামী লীগের এসব আদেশ-নির্দেশ লঙ্ঘনকারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে দলটি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা-ও নয়। মৌখিক ঘোষণাতেই আটকে থাকছে। শোকজ নোটিশও দেয়া হয়নি।

ফলে প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর মধ্যে এক ধরনের ঢিলেঢালাভাব চলে এসেছে। কেউ আইন মানতে চান না। ফলে আদেশ বা নোটিশ দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, বিষয়টি খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, আমরা মিটিং করি, কথা বলি। কিন্তু আলটিমেটলি কারও কিছুই হয় না। যে যে অবস্থায় আছে, সে তেমনই থাকে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ বা আদেশ-নির্দেশই দেয়া হয়। এগুলো পালন না করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

কেন ব্যবস্থা নেয়া হয় না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারণ কেউ আইন মানতে চায় না।

এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির ঘোষণা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এক সাংবাদ সম্মেলনে দলীয় নেতাকর্মীদের তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, একটি অ্যাপের মাধ্যমে দেশের সব নেতাকর্মীকে আনতে এই ডাটাবেজ তৈরি হবে। আমি যখন অবসরে যাব, টুঙ্গিপাড়া বসে এ ডাটাবেজ থেকে সবার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারব।

ডাটাবেজ তৈরির কাজে সম্পৃক্ত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৬ সালে অক্টোবরে জাতীয় সম্মেলনের পরপরই একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে দলের নেতাকর্মীদের এই তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ শুরু করা হয়।

মহানগর, জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন, পৌর, ওয়ার্ড কমিটির সদস্যদের নাম-ঠিকানাসহ এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি কমিউনিটি পোর্টাল নিবন্ধন ফরম দ্রুত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জমা দিতে ওই সময় জেলা নেতাদের চিঠিও দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত আড়াই বছরে এই কাজের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। সবমিলে ১৬ হাজারের মতো নেতাকর্মীর তথ্য এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে। তৃণমূলে নেতাকর্মীদের অসহযোগিতা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের উদাসীনতার কারণেই এমনটি হচ্ছে বলেও তারা জানান।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, দলের ডিজিটাল ডাটাবেজে তথ্য দিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। সম্প্রতি ইস্যুকৃত ওই চিঠিতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, মহানগর ও জেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাঠাতে বলা হয়।

একই চিঠি এর আগে আরও কয়েকবার ইস্যু করা হয়। গণভবনে অনুষ্ঠিত দলের তৃণমূলের বর্ধিত সভায় এ সম্পর্কিত নির্দেশনা দেন দলীয় সভাপতি। এরপরও অধিকাংশ তৃণমূল সংগঠন কেন্দ্রে তালিকা পাঠায়নি।

তালিকা পাঠানোয় তৃণমূল নেতাদের গড়িমসির কারণ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েক নেতা জানান, অধিকাংশ ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দিয়েই চলছে অনেক কমিটি। আবার অনেক স্থানে দীর্ঘদিন থেকে সম্মেলন না হওয়ায় কমিটিও নেই।

তারা জানান, এসব এলাকার তৃণমূলের নেতারা কেন্দ্রে কমিটি পাঠাতে ভয় পান। যাচ্ছেতাই করে কমিটি পাঠালে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সবমিলে এ মুহূর্তে কমিটি নিয়ে নতুন ঝামেলায় জড়াতে চান না দায়িত্বশীলরা। ফলে কেন্দ্রের বারবার চাপেও কমিটির তালিকা পাঠাতে পিছুটান দিচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, তৃণমূলে পাঠানো কেন্দ্রীয় নির্দেশ নেতাকর্মীরা সঠিকভাবেই পালন করছে।

তিনি বলেন, দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। অনেক জেলা-উপজেলা থেকে তথ্য পেয়েছি। যেসব জেলা-উপজেলায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি, সেখানে দ্রুত কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে কেন্দ্রে পাঠাবে বলে আশা করি।

গত বছর সারা দেশে সদস্যপদ নবায়ন ও সদস্য সংগ্রহ অভিযান একযোগে শুরু হলেও শেষ করতে পারেনি তৃণমূল আওয়ামী লীগ। দ্রুত এই কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত চিঠি কোনো কাজে আসেনি। দলীয় সূত্রে জানা যায়, মহা ধুমধামে এ কর্মসূচি শুরু হলেও শেষ হয়নি আজও।

জানা যায়, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের আধুনিক কেন্দ্রীয় কার্যালয় নির্মাণ শুরু করার পরপরই জেলা-উপজেলাতেও নিজস্ব দলীয় কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। ২০তম জাতীয় সম্মেলনের পর এক মতবিনিময় সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উপস্থিতিতে জেলা, উপজেলা/পৌর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তথ্য চেয়ে একটি ফরম পূরণ করে দফতরে জমা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

১৯ জানুয়ারি আবারও কার্যালয় সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে দলের সব জেলা, উপজেলা, মহানগর, থানা ও পৌর কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী যেসব মহানগর, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নিজস্ব জমি রয়েছে কিন্তু কার্যালয় নেই, সেসব স্থানে দলীয় খরচে কার্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় দলের নিজস্ব জমি নেই, তাদের জমি কিনতেও বলা হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে দলের অস্থায়ী কার্যালয় থাকলে তার ঠিকানা ও ফোন নম্বর, অস্থায়ী কার্যালয় (ভাড়া নেয়া) থাকলে তার বিবরণসহ স্থায়ী-অস্থায়ী কার্যালয়ের কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, ফ্যাক্স ও টেলিফোন সম্পর্কিত তথ্যও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি অধিকাংশ তৃণমূল আওয়ামী লীগ।

এ বিষয়ে মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যালয় তৈরির অনেক অগ্রসর হয়েছে। অনেক স্থানে কার্যালয় তৈরি হয়েছে। অন্যান্য জেলা-উপজেলায়ও দ্রুত কার্যালয় নির্মাণ করা হবে।

সারা দেশের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ‘ত্যাগী-প্রবীণ ও অসুস্থ’ নেতাকর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে নির্দেশ দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সাংগঠনিকভাবে মূল্যায়নের জন্য তাদের নাম-ঠিকানা চেয়ে দলের জেলা, উপজেলা ও পৌর কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে তালিকা দলের সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই আদেশ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

এদিকে উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করা মন্ত্রী-এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের তালিকা প্রণয়নে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি দলের এক কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক ৮ বিভাগের দায়িত্বশীল সাংগঠনিক নেতাদের তৃণমূলে নৌকার বিরোধিতাকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে বলা হয়। তালিকা আকারে এসব বিরোধিতাকারীর নাম কেন্দ্রে পাঠাতে বলা হলেও প্রভাবশালীদের ভয়ে তা আজও পাঠাতে পারেননি তৃণমূলের নেতারা।

২০১৭ সালের ২০ মে দলের বর্ধিত সভায় অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে তৃণমূল নেতাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘কমিশন খাওয়ার লোভে অনেকেই দলে এসে ভিড়তে পারে।

এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী-নাশকতাকারীরা তাদের শাস্তি এড়াতেও নানা কায়দায় আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়তে পারে। এরা কখনোই দলের ভালো চায় না, তাই সবকিছু ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে কাউকে কাউকে দলে নিতে হবে।’

এরপর দলের অনুপ্রবেশকারীদের তথ্য সংগ্রহে কড়া অবস্থানের কথা ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর কয়েকদিন পর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কেন্দ্র থেকে চিঠি ইস্যু করা হয়।

এছাড়া একাদশ জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের আগে দলে ঐক্য অটুট রাখতে তৃণমূল নেতাদের বরাবর দলের সাধারণ সম্পাদক চিঠি পাঠান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের পরেই অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর কিছু উপজেলা বাকি রেখে পাঁচ ধাপে অধিকাংশ উপেজলা নির্বাচন শেষ করা হয়েছে। এ নির্বাচনগুলোয় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল।

অনেক স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল চোখে পড়ার মতো। এতে দলের আদেশ বাস্তবায়নকারী অনেক নেতাও জড়িয়ে পড়েন বিবাদে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ‘কড়া’ ভাষার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারিও দেয়া হয়েছিল।

নোটিশও দেয়া হয়েছিল দলীয় সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়নি দলটি।

দলের ডিজিটাল ডাটাবেজ, অনুপ্রবেশ ঠেকানোসহ বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্র থেকে নানা বিষয়ে চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাদেক কোরাইশী বলেন, ডাটাবেজের তথ্য আমরা ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা থেকে সংগ্রহ করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। অন্যান্য চিঠির সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি।-যুগান্তর