তিন কারণে শপথ নেননি ফখরুল

এনাম আবেদীনঃ সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েও তিন কারণে শপথ নেননি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, মূলত দলের সিনিয়র নেতাদের ‘চাপ’ এড়ানোর জন্যই ফখরুল শপথ নেননি।

দ্বিতীয়ত, দলের জন্য সার্বক্ষণিক সময় দেওয়ার কথাও তিনি চিন্তা করেছেন এবং সব শেষে রাজনৈতিক তথা নৈতিক হিসাব থেকে তিনি শপথ নিতে যাননি।
ফখরুলের রাজনৈতিক ও নৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আসলে দলগত ও জোটগতভাবে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যাওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ফলে দলের মহাসচিব এবং ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র হিসেবে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফখরুল এথিক্সের কথা চিন্তা করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘দল ইউ টার্ন নিলেও ফখরুল যোগদান না করায় ভালো হয়েছে। এতে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ এমপি হয়ে সংসদে যোগদান করার লোভ তাঁর নেই, এটি এ ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে।’

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ না নেওয়ায় গত ৩০ এপ্রিল সংবিধান অনুুযায়ী মির্জা ফখরুলের আসন (বগুড়া-৬) শূন্য ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু বিএনপির নির্বাচিত অন্য পাঁচ এমপি শপথ নিলেও শেষ মুহূর্তে কী কারণে ফখরুল শপথ নেনরি তা এখনো বিএনপির ভেতরে-বাইরে রহস্য হয়ে আছে। দলের বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ নেতার কাছেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বলে জানা গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতে, নিজের ভাবমূর্তি তথা দলের নেতাকর্মীদের মনোভাবের কথা জেনেই মির্জা ফখরুল শপথ নেননি। বিএনপির প্রবীণ এই নেতা বলেন, ‘ফখরুল শপথ নিলে দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হতো। দলে প্রতিক্রিয়াও হতো ব্যাপক। কিন্তু এখন ক্ষোভ কমে যাবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ফখরুলের ইমেজ আগেও ভালো ছিল। এখন সবাই আরো মনে করবে যে তার সংসদে যাওয়ার লোভ নেই। ফলে তাঁর জন্য এটা ভালোই হলো।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘মির্জা ফখরুল কেন শপথ নেননি সে বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। তবে রাইট অর রং যেভাবেই হোক বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফলে মহাসচিবের সংসদে যোগ দিলে ভালো হতো।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর তিন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফখরুল শপথ না নেওয়ায় দলে এখন কিছুটা উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেসব সিনিয়র নেতা প্রায় তিন মাস ধরে ভেতরে ও বাইরে ফখরুলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তাঁরাও এখন স্বীকার করেন, শপথ না নেওয়ায় ফখরুলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ভালো হয়েছে। অন্তত দলের নেতাকর্মীদের কাছে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। তিনি নির্লোভ এটাও প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে তাঁরা মনে করেন।

তা ছাড়া বিএনপিতে দুজন নেতা সার্বক্ষণিক রাজনীতি করেন বলে আলোচনা আছে। তাঁরা হলেন মির্জা ফখরুল ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। ফখরুল সংসদে গেলে দলের সাংগঠনিক ও অন্যান্য কাজের কিছুটা ক্ষতি হতো বলেও কেউ কেউ মনে করেন।

অথচ মির্জা ফখরুল নিজেই শপথ নেওয়ার পক্ষে ছিলেন এবং সরকারের সঙ্গে তিনিই যোগাযোগ করছিলেন বলে একটি গুঞ্জন গত তিন মাস ধরে বিএনপির ভেতর থেকেই ছড়ানো হয়েছে। অনেকের মতে, এর সঙ্গে দলটির সিনিয়র অধিকাংশ নেতা জড়িত ছিলেন। কারণ ফখরুল ছাড়া অপর কোনো সিনিয়র নেতা জয়লাভ করেননি। ফলে বেশির ভাগ নেতাই সংসদে যাওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। এ অবস্থায় ফখরুল সংসদে গেলে দলের ওই নেতাদের টার্গেট হতেন।

যদিও সংসদে না যাওয়ার যুক্তি হিসেবে রাজনীতির অন্য হিসাব-নিকাশও বিএনপি নেতাদের কাছে ছিল। কিন্তু ফখরুলকে নিয়েই দলের ভেতরে বেশি সমালোচনা হয়েছে যা তিনি জানতেন। এমনকি অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় কেউ কেউ তাঁকে ‘দালাল’ বলতেও ছাড়েননি। ফলে ফখরুল সংসদে গেলে নেতাদের চাপে দলে কোণঠাসা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আর ফখরুল এটাই সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় নেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো থেকে জানা জানা যায়।

তবে এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আসলে আমি দলের জন্য সময় দেওয়ার কথা চিন্তা করেছি। দ্বিতীয়ত, আমি বিএনপির মহাসচিব এবং ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র—এটিও চিন্তা করেছি। সব শেষে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলেছি। সবদিক বিশ্লেষণ করেই আমি শপথ নেইনি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত এমপিরা সংসদের ভেতরে কাজ করবেন। আর আমিসহ দলের সিনিয়র নেতারা সংসদের বাইরে কাজ করব।’ এটাই ‘রাজনৈতিক কৌশল’ বলে দাবি করেন ফখরুল।

এ বিষয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘কী কারণে ফখরুল শপথ নেননি তা না জানলেও ধারণা করতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘স্থায়ী কমিটিসহ বিএনপির সিনিয়র অধিকাংশ নেতা সংসদে যাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ আড়ালে ফখরুলের বিরুদ্ধে নানা কথা বলেছেন। ফলে ফখরুল সংসদে গেলে ওই নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে নানা কল্পকাহিনী ছড়াতেন। এঁদের হাত থেকে ফখরুল বেঁচে গেছেন।’-কালেরকন্ঠ