তদন্ত শেষ কবে

যুগবার্তা ডেস্কঃ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত। এখনও উত্তর মেলেনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের। তাকে কোথায় হত্যা করা হয়, কে বা কারা এতে জড়িত, লাশ বাসার কাছের ঝোপে ফেলার ক্ষেত্রে কে বা কারা অংশ নেয়, আলামত হিসেবে দেখানো অন্তর্বাস সঠিক, না মেকি- এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। কারণ যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার, তাদের কেউ কেউ বিদেশে রয়েছেন। সিআইডি আরও বলেছে, আগে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, তারপর আসবে অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রসঙ্গ। ঘটনাস্থল কুমিল্লা হলেও স্পর্শকাতর মামলা হওয়ায় ঢাকাতেই চলছে এর তদন্তসহ সব কার্যক্রম।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল কাহহার আকন্দ গতকাল সোমবার বলেন, ‘খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে চলমান তদন্ত আরও জোরালো হবে।’

২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের ওলিপুরের পাওয়ার হাউস এলাকায় ঝোপ থেকে তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে ডিবি পুলিশ হয়ে বর্তমানে সিআইডি মামলাটির তদন্ত করছে।

সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী তনু লেখাপড়ার পাশাপাশি থিয়েটার, নাচ-গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। সেনানিবাস এলাকায় এসব কর্মকাণ্ডে তার ছিল সরব উপস্থিতি। ফলে ময়নামতি সেনানিবাসসহ আশপাশ এলাকায় পরিচিত মুখ ছিলেন তনু।

তনুর মা ও ভাইয়ের অভিযোগ, কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে তারা কঠোর নজরদারির মধ্যে আছেন। তাদের চলাফেরা, মোবাইল ফোনেও নজরদারি রয়েছে। তারা কার্যত জেলখানায় বাস করছেন।

শোকে কাতর তনুর বাবা তিন মাস ধরে অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। অসুস্থতা দীর্ঘায়িত হলে তিনি সেনানিবাস বোর্ডের মালীর চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন। মেয়ে হত্যার পর তিনি স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছেন। তনুর মা তদন্তের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশার কথা জানিয়েছেন। তনুর বাবা দাবি করে আসছিলেন, ‘যা ঘটেছে, কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরেই ঘটেছে।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি কুমিল্লা-নোয়াখালী বিভাগের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহমেদ জানান, বিদেশ থেকে ফেরার পর সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্নিষ্টদের আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া কবে চূড়ান্ত হবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।

এ পর্যন্ত সেনা কর্মকর্তা, সদস্য, তনুর বাবা-মাসহ পরিবার, সহপাঠী, প্রতিবেশীসহ শতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে ১০ বারেরও বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিআইডি কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রমাণ মিলছে না বলেই তদন্ত শেষ করা যাচ্ছে না। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো চাপ নেই। চুল কেটে ফেলার মতো ‘ক্ষোভে’র ঘটনায় এক বা একাধিক নারীর অংশগ্রহণ ছিল, এমন প্রাথমিক ধারণা রয়েছে। তনুর অন্তর্বাসে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া যায় ডিএনএ পরীক্ষায়। এতে ধারণা করা হয়, ধর্ষণের পর তনুকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তা দিয়ে এখনও আসামি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে তনুর মা আনোয়ারা বেগম শুরু থেকে দাবি করে আসছিলেন, ‘সার্জেন্ট জাহিদ ও সিপাহি জাহিদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সব বেরিয়ে আসবে।’ সিআইডি জানায়, ঢাকা ও কুমিল্লা সেনানিবাসে বহুবার তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের বাসায় গিয়ে সন্তানদের প্রাইভেট পড়াতেন তনু। ঘটনার দিনও তিনি পড়াতে গিয়েছিলেন বলে দাবি তনুর বাবার।

সিআইডি কুমিল্লা-নোয়াখালী বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার শাহরিয়ার রহমান সমকালকে জানান, সন্দেহের তালিকা থেকে এখনও আসামি চিহ্নিত করা যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষাও বাকি আছে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে নির্দিষ্ট করে বলার সময় আসেনি। কেউ গ্রেফতার নেই। তবে তদন্ত এগিয়ে চলেছে।

তনুর পোশাকে তিনজনের শুক্রাণু পাওয়ার পরপরই সিআইডি জানিয়েছিল, আসামি শনাক্তের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তারা। সন্দেহভাজনদের মধ্য থেকে ওই ডিএনএর মিল খুঁজে পেলেই রহস্যের জট খুলে যাবে।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম জানান, তার অসুস্থ স্বামী চাকরি ছেড়ে দিলে তারা গ্রামের বাড়ি মুরাদনগরে চলে যাবেন। তার বড় ছেলে নাজমুল হোসেন ও ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন ঢাকায় চাকরি করছেন। নিঃসঙ্গ ও অসহায়ভাবে তাদের দিন কাটছে। মেয়ে হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে তারা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। নজরদারি থাকায় দুই ছেলেই বাসায় কম আসেন।

গণজাগরণ মঞ্চের কুমিল্লার মুখপাত্র ও তনু হত্যার বিচার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক খায়রুল আলম রায়হান সমকালকে জানান, আদৌ সঠিক তদন্ত হবে কি-না, প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করা যাবে কি-না; এসব নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। প্রয়োজনে আবারও আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানান তিনি।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আয়শা বেগম শিরিন বলেন, তনু হত্যার সঠিক তদন্ত ও খুনিদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

তনুর মৃত্যুর পরদিন ২১ মার্চ প্রথমবার তার লাশের ময়নাতদন্ত হয়। ১৫ দিন পর দেওয়া ওই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ বলতে পারেননি চিকিৎসক। ধর্ষণের কথাও বলেননি তিনি। পরে আবারও লাশ তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ১২ জুন দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসক দলের প্রধান কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কেপি সাহা মৃত্যুর আগে তনুর ‘সেক্সচুয়াল ইন্টারকোর্স’-এর আলামত পাওয়ার কথা বলেন। তবে সেটি ধর্ষণ ছিল কি-না, তা স্পষ্ট করেননি। এই প্রতিবেদনেও মৃত্যুর কারণ বলতে পারেনি চিকিৎসক দল। তনুর মায়ের দাবি, তার মেয়ের নাক ও মাথার পেছনে থেঁতলানো এবং শরীরের ওপরের অংশ ও মুখমণ্ডলে রক্ত জমাটের দাগ ছিল।-সমকাল