ডাঃ জামিল হত্যার নেপথ্যের কিছু কথা

38

কাজী আব্দুল মোতালেব জুয়েলঃ ৩১ মে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদ-মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের বিপরীতে “বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র” চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের বুকে ১৯৮৮ সালে আজকের দিনে নতুন করে মরণ কামড় বসায় একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতাকারী যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত-শিবিরচক্র। তাদের প্রশিক্ষিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে মেইন হোস্টেলের সামনে ৩০-৩৫ জন শিক্ষকের সম্মুখে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র ডাঃ জামিল আকতার রতনকে।

কি হয়েছিল সেদিন হয়েছিল সেদিন ক্যাম্পাসে?
ঘটনার সূত্রপাত ৩০ মে ১৯৮৮ সাল, রাতে। শিবির মিছিল করে মহড়া দিচ্ছে। তখন মেডিকেল কলেজে সব মিলিয়ে কয়েক’শো ছাত্র থাকে। শিক্ষার্থীরা মারাত্মক কিছু আশংকা করছিল, ভীত ছিল। যদিও সে সময়ের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক রেষারেষি থাকলেও, কিন্তু সেটা খুন পর্যন্ত গড়ানো একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল। প্রধান ছাত্রাবাসের (বর্তমানে শহীদ কাজী নুরুন্নবী ছাত্রাবাস) সাধারণ শিক্ষার্থী, অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি ডাক্তার জামিল আকতার রতন সহ সকলেই শিবিরের গতিবিধি লক্ষ্য রাখছিলেন। সে সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে শিবির সমর্থন করতো সব মিলিয়ে বড়জোর ৩০-৪০ জন ছাত্র। হঠাৎ শিবিরের সেই মিছিলে এসে জুটলো বহিরাগত শতাধিক শিবির ক্যাডার, সবার হাতেই দেশীয় অস্ত্র। সেই অস্ত্র নিয়ে তারা সারারাত চালালো মধ্যযুগীয় মহড়া এবং তারা সকলেই প্রধান ছাত্রাবাসের পশ্চিম-উত্তর ব্লকে অবস্থান নেয়। ৩১ মে আনুমানিক সকাল ১১টায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিছিল নিয়ে অধ্যক্ষের কাছে স্মারক লিপি দিয়ে অবগত করে যে- উক্ত ছাত্রাবাসের কোলাপসিবল গেট বন্ধ করে অস্ত্রসহ শিবিরের অনেক বহিরাগত অবস্থান করছে। এতে করে সাধারণ ছাত্ররা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আর পুরো ছাত্রাবাসে থমথম ভূতুরে পরিবেশ বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে মেডিকেল কলেজ প্রশাসনের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
ততক্ষণে একাডেমিক কাউন্সিল এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য নিয়ে একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় বসে গেছেন। ছাত্রদের কথা শুনে একাডেমিক কাউন্সিল সরেজমিনে গিয়ে সত্যতা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মিটিং থেকেই অধ্যক্ষসহ একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য অন্যান্য শিক্ষকের একটি প্রতিনিধি দল ছাত্রাবাসে যান। শিক্ষকদের সাথে ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ডাক্তার জামিল সহ আরো কয়েকজন ছাত্রও সেখানে উপস্থিত ছিল। শিক্ষকরা দুইটি ব্লক দেখে যখন পশ্চিম-উত্তর ব্লকে ঢুকতে যান, তখনই বাধা আসে সেখানে অবস্থানরত শিবিরের ক্যাডারদের কাছে থেকে। শিবিরের ক্যাডারদের মধ্য থেকে কয়েকজন শিক্ষকদের সাথে উদ্ধতপূর্ণ আচারন করলে পঞ্চম বর্ষের ছাত্র ডাক্তার জামিল আকতার রতন উদ্ধতপূর্ণ আচারণের তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ করেন। হঠাৎ এক অপার্থিব তীব্র হুইসেলের শব্দ বাজিয়ে “নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার” স্লোগানে দিয়ে শিবিরের শতাধিক অস্ত্রধারী গু-া শিক্ষকদের সামনেই কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র জামিলকে ধাওয়া করে এলোপাতাড়িভাবে কোপাতে থাকে। এসময় তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় আলবদর কায়দায়। জামিলের মৃত্যু নিশ্চিত করে শিবিরের ক্যাডাররা পরস্পরের সাথে আলিঙ্গন করে, পরস্পরকে চুম্বন করে উল্লাস প্রকাশ করে। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলে সেখানেই তিনি মারা যান। পরবর্তীতে মেডিকেল কলেজ প্রশাসনের পাঠানো বিবৃতিতে সম্পূর্ণ ঘটনা উঠে আসে। বিবৃতির মাধ্যমে জানা যায়, ডাঃ জামিলকে হত্যাকালে বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর ও বোমা বিস্ফোরন করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা।

কেন জামিলকে হত্যা করা হয়েছিল?
’৭৫ পরবর্তী অবৈধভাবে সামরিক ও স্বৈরশাসকের শোষণ-শাসন এবং তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিসংগ্রামের চেতনা পরিপন্থী পাকিস্তানী ভাবাদর্শে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল। ত্রিশ লক্ষাধিক প্রাণ ও তিন লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে নতুন করে জায়গা করে নেয় একাত্তরের পরাজিত শক্তি। দেশে সামাজিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় সম্প্রীতির বদলে সম্প্রসারিত হতে থাকে অমানবিক সামরিক শাসন-শোষণ ও তারই পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদী-সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক তৎপরতা। কমিউনিষ্ট আদর্শে দীক্ষিত বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখার তৎকালীন সভাপতি ডাঃ জামিল আকতার রতন সচেতনভাবেই অবৈধ সামরিক শাসন-শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদী-সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক তৎপরতার লাগাম টেনে ধরতে বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানমুখী ও একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এরশাদ শাহীর স্বৈরশাসনের অবসান, বিতর্কিত ‘রাষ্ট্রধর্ম বিল’ বাতিল, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলেছিলেন আপোষহীন কণ্ঠে। তার কণ্ঠকে থামিয়ে দিতে এরশাদ প্রশাসন শিবিরকে সুচারুভাবে ব্যবহার করেছিল। আর সেই কুটকৌশলগত কারণে অগ্রগামী প্রগতিশীল ছাত্রনেতা জামিলের হত্যাকান্ডের আগে ও পরে এরশাদের পুলিশ প্রশাসন রাজশাহীতে সেসময় নীরব ভূমিকা পালন করে। যা পুলিশ, সেনাবাহিনী করতে পারিনি তা শিবিরকে দিয়েই যেন তা করানো হয়েছিল। এ যেন ঠান্ডা মাথার খুন। এরশাদ গং ভেবেছিল শিবির কর্তৃক জামিল হত্যার অনুকূল পরিবেশ দিলে জামিলের সাথে সাথে আর ক্ষমতাও স্থায়ী হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। জামিলের মৃত্যু স্বৈরশাসন ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনে আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাবাংলায়। আন্দোলন আরো তীব্রতর হয়। অবশেষে ছাত্র-শিক্ষক-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। ৩১ মে, দিনটিকে প্রতিবছর দেশের সকল প্রগতিশীল সংগঠন সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আজকের দিন পার হলেই শহীদ জামিলের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। একজন সম্ভাবনাময় চিকিৎসকের আত্মত্যাগকে নিছক একটি দিবস পালনেই সীমাবদ্ধ না রেখে খুনিদের স্বরূপ ও তার মৃত্যুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আজকের প্রজন্মের কাছে উম্মোচিত করার কাজটিই প্রাধান্যতা পাওয়ার দাবি রাখে।

ছাত্র শিবির মানুষ খুনের শক্তি ও সাহসের উৎস কি?
আগেই বলেছি, ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিসংগ্রামের চেতনা পরিপন্থী পাকিস্তানী ভাবাদর্শে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। নেপথ্যে কাজ করেছে ধারাবাহিকভাবে খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জিয়াউর রহমান এবং সর্বশেষ স্বৈরশাসক এরশাদ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ অবৈধভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে এবং মেজর জেনারেল সাইফুল্লাহকে অপসারন করে মেজর জিয়াকে ২৫ আগস্ট চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে নিযুক্ত করে। রাষ্ট্রপতির দ্বায়িত্ব¡ নেবার ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’। এই অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের রক্ষা করা। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে যে, “১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত কারো বিরুদ্ধে দেশের কোন আদালতে অভিযোগ পেশ করা যাবে না”। সে “জয় বাংলা” স্লোগানের পরিবর্তন করে এর স্থলে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগান চালু করেন। একই সময়ে সে “বাংলাদেশ বেতার” এই নাম পরিবর্তন করে রেডিও পাকিস্তানের আদলে “রেডিও বাংলাদেশ” করেন। তার ৮৩ দিনের শাসনামলেই ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মোঃ মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদের পতন ঘটলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দখল করে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং মেজর জিয়াকে অবসারন করে ঢাকা ক্যান্টমেন্টে অবরুদ্ধ করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহের মধ্যদিয়ে মেজর জিয়া পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর মেজর জিয়াকে পুনরায় চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে এবং এক বছরের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৭৫ এর ৩১ ডিসেম্বর মেজর জিয়া সামরিক অধ্যাদেশ জারী করে দালাল আইন বাতিল করে। থেমে যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম। শেখ মুজিবর রহমান সরকারের জারী করা আইনগুলো একের পর এক অধ্যাদেশ জারী মধ্যদিয়ে রহিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ‘ঝবপড়হফ ঢ়ৎড়পষধসধঃরড়হ ড়ৎফবৎ হড়. ২ ড়ভ ১৯৭৬’ জারী করে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাদি তুলে দেয়া হয়। ১৯৭৬ এর ১৮ জানুয়ারি নাগরিকত্ব ফিরে পাবার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন করতে বলা হয় সবচেয়ে আলোচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতাকারীর নাটের গুরু রাজাকার গোলাম আজমকে। এছাড়া ‘ঢ়ৎড়পষধসধঃরড়হ ড়ৎফবৎ হড়. ১ ড়ভ ১৯৭৭’ দ্বারা সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ তুলে দেয়া হয়। মার্শল ল’র আওতায় এসব অধ্যাদেশ জারী করে জেনারেল জিয়ার সরকার। এসব অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। বিচক্ষন মেজর জিয়া সেই ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য বাংলাদেশে পাকিস্তানী ভাবাদর্শের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-সন্ত্রাসবাদী তথা যুদ্ধাপরাধীগোষ্ঠীকে রাজনীতির করার সুযোগ করে দেয়। অর্থাৎ তার ইশারায় তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে রাজনীতিকে ধর্মীয় মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের এক রকমের লিজ দেওয়া হয়েছিল। দালাল আইনটি বাতিলের ফলে জেলে আটক থাকা প্রায় এগারো হাজার যুদ্ধাপরাধী মুক্তি পেলে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলাম ও ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতৃত্বস্থানীয়রা পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিদ্দিকবাজার কমিউনিটি সেন্টারে একটি সভায় মিলিত হয়। উদ্দেশ্য- পুনরায় রাজনীতির মাঠে প্রকাশ্যে নামার প্রস্তুতি হিসেবে একাত্তরের ঘাতক সংগঠন ইসলামি ছাত্রসংঘকে পুনর্গঠন এবং কৌশল নির্ধারণ করা এবং লক্ষ্য- পেয়ারা পাকিস্তানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এদের প্রত্যেকেই অবৈধভাবে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখল করে এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পাকিস্তানী ধর্মীয় মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। ফলে এসব নব্য রাজাকার ক্ষমতা গ্রহনের পর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে শক্তি ও সামর্থ্য যুগিয়ে গেছে জনগণকে বন্দুকের নলার মুখে জিম্মি করে। জিয়ার মৃত্যুর পরে সুকৌশলে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে নিজেই ক্ষমতার মসনদে আসীন হয় এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএফএম আহসানুদ্দিন চৌধুরীর নিকট হতে রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নেয়। ক্ষমতা গ্রহনের পর পূর্বে তিন জাতীয় বেঈমানের পথ অনুসরন করে এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করে। ইতিমধ্যে জামায়াত-শিবির সুসংগটিত দলে পরিনত হয়েছে। দেশে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। স্বৈরশাসক এরশাদ শাহী ১৯৮৮ সালের ১১ মে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে বিতর্কিত “রাষ্ট্রধর্ম বিল” উত্থাপন করে। দেশের সকল প্রগতিশীল সংগঠন, ছাত্র-শিক্ষক সহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার সাধারণ সচেতন মানুষ ফুসে উঠে। আন্দোলনের তোপে তড়িঘড়ি করে ৭ জুন সংশোধনীটি পাস করে এবং ৯ জুন নিজে স্বাক্ষর করে। খুব সাধারণভাবে বললে- খন্দকার মোশতাক আহমেদের হাত ধরেই অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ তার অভিভাবক হারায় এবং সাম্প্রদায়িক রূপটি বিকশিত হতে থাকে। জেনারেল জিয়া ও সায়েম সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহির—-রাহিম” যুক্ত করার মাধ্যমে মুক্তসংগ্রামের চেতনাকে উপড়ে ফেলার কাজ শুরু করে এবং পাকিস্তানী ভাবাদর্শের যুদ্ধাপরাধী, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেয়। পাকিস্তানে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে যেই দেশের স্বাধীনতাকে মরণ অবধি তারা কখনোই স্বীকারই করেনি। আর স্বৈরশাসক এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চার মূলনীতিকেই ছু^ড়ে ফেলে। ১৫ আগস্ট ’৭৫-র পর দেশে মোশতাক থেকে এরশাদ, ক্যু পাল্টা ক্যু মধ্যদিয়ে ঘনঘন ক্ষমতার পালাবদল ঘটতে থাকলেও মতাদর্শিক মিল থাকায় জামায়াত-শিবির চত্র সকল শাসকের সান্নিধ্যে থেকেছে। এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও হয় একজন যুদ্ধাপরাধী। সামরিক শাসনের অবসান ঘটলেও বিএনপির সাথে; এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সাথে সান্নিধ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। ২০০১-২০০৫ শাসনামলে বিএনপির সাথে জোট সরকার গঠন করে, সংসদীয় আসনের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অংশীদার হয়। এসময় অসংখ্য নেতাকর্মীকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে চাকরী দেয়। ফলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক যাত্রার শুরু থেকে ক্ষমতা, অর্থ ও অনেকাংশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থেকেই জামায়াত-শিবির তার সমস্ত অপকর্ম পরিচালনা করতে থাকে। আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে সফল হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের জামায়াত শিবিরের সংগঠন পুনর্গঠনের কৌশল কি ছিল?
নীতি নির্ধারকরা জানতো মুক্তিসংগ্রামে ইসলামী ছাত্র সংঘকে তার যুদ্ধাপরাধ তথা সকল নারকীয় খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরন, লুটপাট সহ যাবতীয় কুকর্মের কারণে এদেশের মানুষ কখনোই মেনে নিবে না। তাই তারা ছাত্রসংঘের ‘সংঘ’ শব্দটিকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান আমলে পরিচালিত জামাতের শিশু-কিশোর সংগঠন ‘শাহিন শিবির’ নামটি থেকে ‘শিবির’ শব্দটি যুক্ত করে। যুদ্ধাপরাধী সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ রাতারাতি ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’-এ পরিনত হয়। পতাকা, মনোগ্রাম, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, পাঠক্রম, এমনকি জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত নেতৃত্ব কাঠামো সবই থাকে অপরিবর্তিত। পুনর্গঠনের সাথে সাথেই নতুন করে গতি পায় সংগঠনটি। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের সামনে রাজনৈতিক টোটকা হিসেবে সামনে রাখে “ইসলাম” শব্দটিকে। আর পুনরায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে পেয়ারে পাকিস্তানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার এবং প্রকাশ্যে বাংলাদেশ বিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনা করতে থাকে সহিংসপন্থায়। নতুন কৌশল গ্রহনের একবছরের মধ্যেই তারা তাদের প্রথম অভিযান শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিসংগ্রামের ভাস্কর্র্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে পিছু হটতে হয়েছিল সেদিন। একইভাবে তারা জয়দেবপুরে মুক্তিসংগ্রামের ভাস্কর্র্য ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে সেখানেও ব্যর্থ হয়। এর মধ্যদিয়ে জামায়াতের নতুন করে সাংগঠনিক তৎপরতার পেছনের উদ্দেশ্য ছাত্র সমাজ সহ ঢাকার মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। ব্যর্থ হয় ঢাকার ছাত্রসমাজ ও জনসাধারণের কাছে জামায়াতের ‘ইসলাম’ টোটকাটি। রাজধানী ঢাকায় নানা কার্যক্রমে ব্যর্থ হয়ে জামাতের নীতি নির্ধারকরা শিবিরকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। ১৯৭৮ সালে জামাতের কার্যকরী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয় শিবিরকে ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার। তারা শিবিরকে শহরকেন্দ্রিক না রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মফস্বল আর গ্রামকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করে। তারপর জামাতের কার্যকরী পরিষদের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তানুযায়ী তারা ঢাকা ছেড়ে শিবিরকে সারাদেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করে। শুরু হয় টার্গেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সাংগঠনিক দুর্গ বানানোর কাজ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলের উদ্দেশ্যে প্রথমে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে মেস, টিউশন এমনকি আর্থিক সহায়তা করতে শুরু করে। সেই সাথে চলতে থাকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মগজ ধোলাইয়ের কাজ। পাশাপাশি সাংগঠনিক পরিকল্পনা মতো টার্গেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে বিয়ে করা, বাসা-বাড়ি নির্মান, মেস, মাদ্রাসা, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান খুলতে থাকে। এসবের আড়ালেই চলতে থাকে সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রস্তুতি। অতঃপর শুরু করে আলবদর-রাজাকার-আলশামস’র কায়দায় রগকাটা, খুনের রাজনীতি।

শিবিরের হত্যার রাজনীতির পোস্টমর্টেমঃ
ছাত্র সংঘকে পুনর্গঠনের পর থেকে বাংলাদেশে কি পরিমানে খুন, গুম, লুটপাট, ধর্ষণ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জেরে বাড়িঘর পোড়ানো নানাবিধ কুকর্ম সম্পাদন করেছে তার তথ্য একত্রিত করে লেখলে একটা গ্রন্থ রচিত হবে। তবে শিবির খুনের রাজনীতি শুরু ছাত্রনেতা তবারক হোসেনকে দিয়ে হত্যার মধ্যদিয়ে। বাংলাদেশে ছাত্র শিবিরের হাতে প্রথম খুন হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের নির্বাচিত এজিএস ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেন। ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে নাম পরিবর্তনের মাত্র তিন বছরের মাথায় শিবির ক্যাডাররা তবারক হোসেনকে কলেজ ক্যাম্পাসেই কিরিচ দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে, মৃতপ্রায় তোবারক হোসেন পানি খেতে চাইলে পেশাব করে দিয়ে তা খেতে বলে। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হলের ১৫ নম্বর কক্ষে শিবিরের কর্মীরা ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শাহাদাত হোসেনকে জবাই করে হত্যা করে। শাহাদাতের খুনি হারুন ও ইউসুফের সাজা হলেও দুই বছরের মাথায় উচ্চ আদালতের রায়ে জামিন পায় এবং পরবর্তীতে মামলা থেকে খালাস পায়। ১৯৯০ সালের ২৩ ডিসেম্বর, স্বৈরাচার এরশাদ পতন উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যোগে একটি আনন্দ মিছিল বের হয়। সেই মিছিলেই বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন সহসভাপতি ফারুকুজ্জামান ফারুককে গুলি করে শিবিরের ক্যাডাররা। ২৪ ডিসেম্বর ফারুক মারা যান। ১৯৯৭ সাল, ইতিমধ্যে সন্ত্রাস ও খুনের রাজনীতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম সরকারি মহসিন কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজ ইতিমধ্যে ছাত্র শিবিরের দখলে। চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদের ভিপি মোহাম্মদ জমির ও কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফরিদউদ্দিন আহমদকে গুলি করার পর পায়ের রগ কেটে হত্যা করে পলিটেকনিক দখলের উদ্দেশ্যে। ১৯৯৮ সালের ৬ মে, আমানত হলে হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হয় বরিশাল থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়া আইয়ুব আলী। একই বছর চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্রকে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এনামুল হকের ছেলে ও ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ মুছাকে শিবিরকমীরা নৃশংসভাবে হত্যা করে। ২০০০ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে শিবির ক্যাডাররা মাইক্রোবাসের মধ্যে থাকা ৮ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফতোয়াবাদের ছড়াকুল এলাকায় ব্রাশফায়ার করে খুন করে আলী মর্তুজা নামের ছাত্রলীগ নেতাকে। ২০১০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এএএম মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির।
একইভাবে সিলেটে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করার লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ২৪ মে শিবির ক্যাডাররা খুন করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ডা. সৌমিত্র বিশ্বাসকে। ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর খুন করে মদন মোহন কলেজের ছাত্রদল নেতা হামিদ খান দোয়েলকে। ২০০৪ সালের ৩১ আগস্ট শিবির ক্যাডাররা খুন করে সিলেট ভেটেরিনারি কলেজ (বর্তমান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)-এর ছাত্রদল নেতা রফিকুল হাসান সোহাগকে। এইসময়ে শিবিরের হামলায় আহত হন প্রায় শতাধিক ছাত্রনেতা। শিবির ক্যাডারদের হাতে ছাত্রদল নেতা দোয়েল খুন হওয়ার পর দোয়েলের লাশ দাফনের পূর্বেই আপোষ করে বসে বিএনপি ও জামায়াত নেতারা। প্রশাসনের মদদ পেয়ে ১৯৮৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেটে তান্ডব চালায় শিবির ক্যাডাররা। ৭ সেপ্টেম্বর সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ও আওয়ামী ছাত্রলীগ নেতা খসরুজ্জ্বামানের উপর হামলা চালায় শিবির ক্যাডাররা। সেদিন শিবির ক্যাডাররা খসরুজ্জামানকে ছাত্রী কমনরুমের বাথরুমের ভেতর আটকিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। একপর্যায়ে মৃত ভেবে খসরুজ্জামানকে ফেলে রেখে যায় ক্যাডাররা। এদিন শিবির ক্যাডাররা কলেজ শিক্ষিকা ও ছাত্রীদেরও লাঞ্ছিত করে। ১৯৮৮ সালে সিলেটে শিবির ক্যাডাররা মুনীর, জুয়েল ও তপনকে বর্বরভাবে হত্যা করে।
১৯৭৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারিতে আমতলা চত্বরে এক জনসভার মাধ্যমে ছাত্র শিবির রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসে। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপুটে ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রী ও জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ। মুক্তিসংগ্রামে জামায়াত, ছাত্র সংঘ তথা শিবিরের ভূমিকা, মতাদর্শিক বৈপরীত্যের কারণেই শিবিরের সামনে সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালনায় প্রধান বাঁধা হিসেবে সামনে আসে ছাত্র মৈত্রী ও জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ। কিন্তু হত্যা আর রগকাটার রাজনীতি শুরু করে শিবির সেই বাধাকেও তুচ্ছ করে ফেলে। একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর হাতে যেসব আলবদর রাজাকার নিহত হয় তাদের নামানুসারে বিভিন্ন সেল গঠন করে তারা তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে শুরু করে। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তারা একদিকে যেমন অস্ত্র ও অর্থভান্ডার গড়ে তুলে অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোনো স্মৃতি মুছে ফেলার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। আর এর সূচনা ঘটে চট্টগ্রাম আর রাজশাহীতে এবং পরবর্তীতে সিলেটে; তাদের দখলদারিত্বমূলক রাজনৈতিক অপকৌশলের মাধ্যমে। এদেশে আবার নতুন করে শুরু হয় আলবদর রাজাকার স্টাইলে তাদের খুনের রাজনীতি। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩ বাস বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে শিবির ক্যাডাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। ১৯৮৮ সালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ মেইন হোস্টেলের সামনে, কলেজের প্রিন্সিপাল ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ ও শত শত শিক্ষার্থীদের সামনে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আকতার রতনকে কুপিয়ে ও হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা। ১৯৮৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে তার নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৮৮ সালে বহিরাগত শিবির ক্যাডারদের হামলায় রাবির সৈয়দ আমির আলী হল ছাত্র সংসদের জিএস ও জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্সসহ ২০-২৫ জন আহত হয়। ১৯৮৮ সালে ভোর সাড়ে চারটার দিকে এস এম হলে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা হামলা চালায় এবং জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ূব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। আগস্ট, ১৯৮৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের বাসভবনে ছাত্র শিবির বোমা হামলা করে। এতে অধ্যাপক ইউনুস বেঁচে গেলেও তার বাড়ির কর্মচারী আহত হয়। রমজান মাস, ১৯৮৯ সালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফাকে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ¦বতী চকপাড়ায় ইফতারের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়ে হাতের রগ কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা। নভেম্বর, ১৯৮৯ সালে নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে সন্ধ্যায় জাসদ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ওপর শিবিরের বোমা হামলায় বাবু, রফিকসহ ১০ জন আহত হয়। ১৭ মার্চ, ১৯৯২ সালে পবিত্র রমজান মাসে চট্টগ্রামের কুখ্যাত সিরাজুস-সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক হাজার সশস্ত্র বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসী রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেলা ১১টার সময় অতর্কিত হামলা চালালে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসীর আরাফাত পিটু নিহত এবং জাসদ ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাজেশ সহ দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা এসএম হল, আমির আলী হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিল। লতিফ হলের অনেক কক্ষ এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই হামলার তীব্রতা এতই ছিল যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা রাত ৩টায় বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। ১৯৯২ সালের মে মাসে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা রাজশাহী কলেজ শাখার নেত্রী মুনীরা বোমা বহন করার সময় বিস্ফোরণে মারা যায় এবং তার সহযাত্রী-সহকর্মী আপন খালা এবং ঐ রিক্সাওয়ালা আহত হয়। ১৯ জুন, ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হরতাল কর্মসূচী সফল করার লক্ষ্যে জাসদের মিছিল চলাকালে শিবিরের সশস্ত্র হামলায় সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে জাসদ নেতা মুকিম মারাত্মক আহত হন এবং ২৪ জুন তিনি মারা যান। আগস্ট, ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শবর্তী নতুন বুথপাড়ায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বোমা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবরসহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরও তিন জন নিহত হয়। বিস্ফোরণে পুরো ঘর মাটির সাথে মিশে যায় এবং টিনের চাল কয়েক শ’ গজ দূরে গাছের ডালে ঝুলতে দেখা যায়। পরবর্তীতে পুলিশ মহলার একটি ডোবা থেকে অনেক গুলো খন্ডিত হাত-পা উদ্ধার করে। যদিও শিবির আজিবর ছাড়া আর কারও মৃত্যুর কথা স্বীকার করেনি। পুলিশ বাদী হয়ে মতিহার থানায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলকে প্রধান আসামি করে বিস্ফোরক ও হত্যা মামলা দায়ের করে। প্রায় ৫ বছর পলাতক থাকার পর মামলা ম্যানেজ করে মোজাম্মেল এলাকায় ফিরে আসে এবং জামাতের রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালালে ছাত্রদল ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, সাধারণ ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপনসহ ৫ জন ছাত্র নিহত হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩ সালে বহিরাগত সশস্ত্র শিবির কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়েদ চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৯৯৪ সালে পরীক্ষা দিতে আসার পথে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের রাস্তায় ছাত্রমৈত্রী নেতা প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর হাতের কব্জি কেটে নেয় শিবির কর্মীরা। ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫ সালে শিবির কমীরা বিশ^বিদ্যালয় পার্শ্ববতী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল-সন্ধ্যা বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে বাসের মধ্যে যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার আগে বর্বর শিবির ক্যাডাররা তার হাত ও পায়ের রগ কেটে নেয়। জুলাই, ১৯৯৫ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র শিবির কর্মীরা হামলা করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাত্রনেতা ফরহাদের হাতের কব্জি কেটে নেয়। এ হামলায় প্রায় ২৫ জন ছাত্রদল নেতা-কর্মীর হাত-পায়ের রগ কেটে নেয় শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল খালেকসহ প্রায় বিশ জন শিক্ষকের বাসায় বোমা হামলা ও অগ্নি সংযোগ করে ছাত্র শিবির। ১৯৯৭ সালে গভীর রাতে রাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আহত হয়। রাবি জিমনেসিয়াম পুলিশ ক্যাম্পেও বোমা হামলা করে শিবির। ১৯৯৮ সালে শিক্ষক সমিতির মিটিং থেকে ফেরার পথে রাবি শহীদ মিনারের সামনে অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্র শিবির। ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধে অধ্যাপক ইউনুস প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মক আহত হন তিনি। ১৯৯৯ সালে রাবিতে অবস্থিত ’৭১ এর গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য স্থাপিত ভিত্তি প্রস্তর রাতের আঁধারে ছাত্রশিবির ভাঙতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী বাধা দেন। ফলে শিবির ক্যাডাররা তাকে কুপিয়ে আহত করে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ, ২০০১ সালে রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে ছাত্র শিবির কর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা টের পাওয়ার ফলে তাদের হস্তক্ষেপে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ২০০২ সালে রাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নেতা সুশান্ত সিনহাকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয় শিবির কর্মীরা। ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জের আগরপুর ইউনিয়নের ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি শামীম আহমেদকে শিবির ক্যাডাররা হত্যা করে। ২০০৪ সালে অধ্যাপক মোঃ ইউনুসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় কুপিয়ে হত্যা করে শিবির, যদিও এই হত্যা মামলায় জেএমবির দুইজন সদস্যকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। তারপরও এলাকাবাসী অনেকেরই মতামত হচ্ছে ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররাই তাকে হত্যা করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্রশিবির তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। ১০ ডিসেম্বর, ২০০৫ সালে সন্ধ্যায় জুবেরী ভবনের সামনে রাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এস এম চন্দনের ওপর হামলা চালিয়ে তার রগ কেটে নেয়ার চেষ্টা চালায় শিবির ক্যাডাররা। ২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং রাবি ছাত্রশিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীনসহ আরও দুইজন শিবির ক্যাডার মিলে একযোগে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে রাবির ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে। ২১ আগস্ট, ২০০৬ সালে রাবিতে অনুষ্ঠিত ‘সেকুলারিজম ও শিক্ষা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেয়ার অপরাধে অধ্যাপক হাসান আজিজুল হককে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে শিবির। প্রকাশ্য সমাবেশে তারা অধ্যাপক হাসান আজিজুল হকের গলা কেটে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়। ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে হত্যা করে ম্যানহোলের মধ্যে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা।
এভাবে খুন, নারী নিপীড়ন, অস্ত্রের মহড়ায় দেশব্যাপী ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে যুদ্ধাপরাধী ছাত্র সংগঠনটি। উপরের সকল হত্যাকা- অত্যন্ত পরিকল্পিত। শুধু এতটুকুই নয়, ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে পরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও তান্ডবলীলার কথা জাতি কোনদিনও ভুলতে পারবে না। বিভিন্ন সময়ে স্লিপার সেল গঠনের মাধ্যমে গুপ্ত হত্যা, বোমা বিস্ফোরণের মত ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড তারা খুবই নিখুত পরিকল্পনা মাফিক করে থাকে। একেকটা জামায়াত-শিবির যেন এক একটা ব্যালাস্টিক মিসাইল, যাদের মগজ ধোলাই করা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষ খুনের জন্য, বাংলাদেশকে নব্য পাকিস্তান বানানোর জন্য। স্বৈরাচারী শাসনকালের শেষ দিকে যেন শিবিরকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিরুদ্ধে, তাই স্বৈরাচার আর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াই হয়ে উঠেছিল সমার্থক। জামিলের সেই আত্মদান আজকের প্রজন্মের কাছে এক অবিস্মরণীয় প্রেরণা হতে পারে।

নিছক ব্যক্তিগত মন্তব্য:
আমরা; আমাদের প্রজন্ম ’৬৯ গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০ এর দশকের আগুনঝরা দিনগু, স্বৈরাচার আর সাম্প্রদায়িকতাকে রুখে দেয়ার অদম্য সাহস দেখিনি। দেখছি ছাত্র সমাজের নষ্ট, কলুষিত, পচে যাওয়া সময়। কিন্তু শহীদ ডাঃ জামিলের এই আত্মত্যাগ ততদিন যথাযথ মর্যদা পাবে না যতদিন আজকের প্রজন্ম তার অতীত ইতহাস জানবে, বিশ্লেষণ করতে শিখবে। শহীদ ডাঃ জামিল সহ সকল শহীদের আত্মত্যাগ ততদিন যথাযথ মর্যদা পাবে না যতদিন যারা প্রিয় মাতৃভূমিকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মোড়কে মোড়াতে চেয়েছে বা আজো চাইছে তাদের চরিত্র-কৌশলকে পর্যবেক্ষণ করে পাল্টা রণকৌশল নিয়ে তাদের প্রতিহত করতে না পারবো। অকাতরে যারা দিয়ে গেল প্রাণ তাদের অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারলেই তাদের অসীম আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যদা দেয়া সম্ভবপর হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, শহীদ জামিলের খুনিরা আমাদের সমাজেই স্বাধীনভাবে বিচরন করছে। পরিতাপের বিষয়, হাইকোর্ট ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পরবর্তী মোশতাক থেকে এরশাদের শাসনামল, সকল আইন, অধ্যাদেশ অবৈধ বলে রায় দিলেও “বিসমিল্লাহির—-রাহীম” বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে সংবিধানের চার মূলনীতি পরিপন্থী “রাষ্ট্রধর্ম: ইসলাম” সংবিধানে স্থান পেল। আজো জামায়াত-শিবিরের মত সাম্প্রদায়িক দলগুলো নিষিদ্ধ তো হলোই না উল্টো ক্ষমতার অংশীদার করা হয়েছে ভিন্ন ব্রান্ডের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে। পরিশেষে, সম্প্রতি শহীদ জামিলের হত্যার ৪ নম্বর আসামী রাবি’র আইন বিভাগের শিক্ষক এনামুল জহির রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ছাত্রীর সাথে অশ্লীল আচারণ করলে আলোচনায় উঠে আসে। জানা যায়, বিভিন্ন অপকর্মের পরেও বহাল তবিয়তে রাবিতে শিক্ষকতা করছে এই নরপিশাচ। এদের অবস্থান ও সামাজিক ভিত্তির অনুসন্ধান করে সমাজ থেকে সমূলে উপড়ে ফেলা অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী জনগণের আদর্শিক দায়িত্ব।-লেখকঃ
সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।