টিসিবির সেই পেঁয়াজ এখন ‘গলার কাঁটা’

4

মুন্না রায়হান: স্বল্প আয়ের মানুষের সুবিধার্থে প্রায় দেড় বছর আগে সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবি যখন পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে তখন দেশের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল ২৫০ টাকার উপরে। কোথাও কোথাও তা ৩০০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। সেসময় অস্থির পেঁয়াজের বাজারে টিসিবির ৩৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ ছিল ক্রেতাদের কাছে রীতিমতো ‘সোনার হরিণ’। কিন্তু বহু কাঙ্ক্ষিত সেই পেঁয়াজ এখন টিসিবির কাছে ‘গলার কাঁটা’। না পারছে বিক্রি করতে, না পারছে পেঁয়াজ কেনার চুক্তি বাতিল করতে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ভারত তাদের মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও মধ্য প্রদেশসহ পেঁয়াজের বড় সরবরাহকারী রাজ্যগুলোতে বন্যা হওয়ার কারণে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলে অস্থির হয়ে উঠে দেশের পেঁয়াজের বাজার। লাগানহীনভাবে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়।

এ অবস্থায় মিয়ানমার, মিশর ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে বাজার স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। পেঁয়াজের আমদানি বাড়াতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে মার্জিনের হার ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি আমদানিতে অর্থায়নের সুদ হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেইসঙ্গে টিসিবিও স্বল্প আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে রাজধানীসহ সারা দেশে তা বিক্রি শুরু করে। সে সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ক্রেতারা টিসিবির পেঁয়াজ কিনে।

কিন্তু এখন দেশে পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হওয়ায় ও সরবরাহ বাড়ায় দেশি পেঁয়াজের কেজি নেমে এসেছে ২৫ টাকায়। আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়। ফলে এখন আর ক্রেতাদের আগ্রহ নেই টিসিবির পেঁয়াজে। ৩৫ টাকা কেজির সেই পেঁয়াজের দাম কমিয়ে এখন ১৫ টাকা করা হলেও পাওয়া যাচ্ছে না ক্রেতা।

টিসিবির হিসেবেই গত এক বছরের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম ৬৮ দশমিক ৪২ শতাংশ ও আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম ৮১ দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে। তবে দেড় বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমেছে ৩০০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত।

আটকে গেছে প্রায় ২০ হাজার টন পেঁয়াজ

অস্থির সেই পেঁয়াজের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে সে সময় টিসিবি নিজে ও বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি করে। ইতিমধ্যে চুক্তিকৃত ১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করে দেশের বাজারে ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করেছে সরকারের এই বিপণন সংস্থাটি। কিন্তু এখন দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায় তারা আর বাকি ২০ হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারছে না।

এদিকে পেঁয়াজ বিক্রি করতে না পারায় সংস্থাটি বাজারে তাদের বিক্রীত অন্য পণ্যগুলোর সরবরাহ বাড়াতে পারছে না। বিশেষ করে বর্তমানে ভোজ্য তেলের অস্থির বাজারে তারা সয়াবিনের সরবরাহ বাড়াতে পারছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পেঁয়াজের বিক্রি বাড়াতে টিসিবি তাদের সয়াবিন তেল, চিনি ও মসুর ডালের সঙ্গে পেঁয়াজের বিক্রি অঘোষিতভাবে বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু তাতেও ক্রেতাদের কাছে থেকে খুব বেশি সাড়া নেই। দিন শেষে অনেক ডিলারের কাছে অবিক্রীত অবস্থায় পেঁয়াজ থেকে যাচ্ছে।

টিসিবির ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জুয়েল আহমেদ বলেন, বাজারে নতুন দেশি পেঁয়াজ ওঠায় পণ্যটির চাহিদা কমে গেছে। দিন শেষে অনেক সময় অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে এসব পেঁয়াজ। ফলে আমরা অনেকটা বাধ্য হয়ে অবিক্রীত পেঁয়াজ নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করছি। কারণ, পেঁয়াজ রেখে দিলে নষ্ট হয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা রোধে সেসময় টিসিবি ১ লাখ ২০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি করেছিল। এর বেশির ভাগ পেঁয়াজ বিক্রি হয়ে গেছে। চুক্তির ১৮ থেকে ২০ হাজার টন পেঁয়াজ এখনো আছে। আশা করছি আগামী মার্চের মধ্যে এই পেঁয়াজ বিক্রি হয়ে যাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি একবার করলে তো আর ফেরত নেওয়ার সুযোগ নেই। টিসিবির এই মুখপাত্র বলেন, যদি তখন একসঙ্গে এত বেশি পেঁয়াজ না আনতাম তাহলে এবারও পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা হতো। তিনি বলেন, সামনে পবিত্র রমজান। এবার রমজানে আমরা আমাদের বিক্রীত পণ্যের সরবরাহ আগের তুলনায় আরো বাড়াব। সেভাবেই এখন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।ইত্তেফাক