টকশো নামের ঠকশোর কথা! বলতে বলতে মুখে করে ব্যথা!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
উপরের শিরোনাম নিয়ে একটি কবিতা লেখার ইচ্ছে ছিল। ইচ্ছে পূরণ হয়নি। কবি না হলে যা হয় আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। কষ্ট করে কিছু একটা দাঁড় করালেও সেটা হবে ছড়া; ছেড়াবেড়া মার্কা ছড়া। পদ্য লেখা অনেক কঠিন কাজ। গদ্য লেখা তুলনামূলক সোজা। অবশ্য এই বিষয় নিয়ে অনেক গদ্য লিখেছি! অনেক বলেছি। ঘরোয়া আড্ডা কিংবা আলাপচারিতায়, সভা কিংবা সেমিনারে; কোথায়ও বাদ রাখিনি। যেখানেই যতটুক বলার সুযোগ পেয়েছি সেখানেই বলেছি। কোন কাজ হয়নি। কে শোনে কার কথা? আমি তো নস্যি। বড় বড় মানুষদের কথাই কেউ শোনে না! আমার কথা কে শোনবে! প্রিন্টমিডিয়া নিয়ে মিডিয়ার বাঘাবাঘারাই বলে কিন্তু কিছু করতে পারছে না। সে জায়গায় আমার কথায় কিছু একটা হয়ে যাবে সে আশাও করা উচিৎ নয়।
অনেকের মধ্যে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সরব বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত। তিনি তাঁর জনপ্রিয় ইত্যাদি অনুষ্ঠানে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে নিয়মিত উপস্থাপন করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকার কলামে মাঝেমধ্যেই টিভি চ্যানেলগুলোকে নিয়ে কঠিন কথা লিখে যাচ্ছেন। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন দিনে দিনে কোথায় নেমে যাচ্ছে টিভি অনুষ্ঠানের মান। বিশেষ করে টকশো নামের সবচেয়ে সস্তার অনুষ্ঠান দিনের পর দিন দর্শকদের মনের উপর কী ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলছে তা তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আমরাও তাঁর লেখা সুযোগ পেলেই আমাদের এই পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করছি।
আমি প্রথম লিখি “টক শো তে লবন কম” টাইটেলে। পরে লিখেছি “টকশোর জ্বালায়, দর্শক কেন চ্যানেল ছেড়ে পালায়?” আমাদের লেখায় কিছু যায় আসে না। দর্শক চ্যানেল ছেড়েছে, আমি লেখা ছেড়েছি; কিন্তু তারা টকশো ছাড়েনি। ছাড়বে কেন? সবচেয়ে কম বাজেটের লাভজনক প্রোগ্রাম। কোনরূপ পূর্ব প্রস্ততি লাগে না। পড়াশুনা কিংবা গবেষনা লাগে না। বিষয়বস্তু তো মুখস্তই। সরকার বিরোধী যে কোন নেতিবাচক বিষয় হলেই হলো। লাইট, ক্যামেরা অন; ব্যাস, টকশো গন। তারা প্রতিনিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার করতে যেয়ে প্রকারন্তরে দেশের বিরুদ্ধেই প্রচারনা চালাচ্ছে। নিরপেক্ষতার নামে মুষ্টিমেয় কিছু আতেলদের টকশোতে ডাকা হয় যারা চিহ্নিত দলবাজ। যে যে দলের চামচামী করে সে সে দলের বিরুদ্ধে যাবে এমন একটি কথাও বলবে না।তাদের লক্ষ্য কেবল একটি; কোন না কোনভাবে দল প্রধানের চোখে পড়া। ভাগ্যের চাকা ঘোরাবার জন্যে এরচেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর হয় কিসে? তাদের প্রধান যোগ্যতা হলো হাতে সময় থাকুক বা না থাকুক, অপর পক্ষ শুনুক বা না শুনুক এক নাগাড়ে কথা বলা। অন্যতম যোগ্যতা হলো একজন কথা বলার সময় নিজে কথা বলে, হৈ চৈ করে অন্যকে বাঁধা দেয়া। বিশেষ যোগ্যতা হলো প্রতিপক্ষকে গালাগালি দেয়া বা প্রয়োজনে মারামারি করা। ইদানিং রাগ করে প্রোগ্রামের মাঝপথে উঠে চলে যাওয়াটাও একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। আগে জানলে আসতাম না বলে চলে যায়। কিছুদিন পরে একই টকশোতে আবার তাকে দেখা যায়। আসলে লাইট, ক্যামেরা, এ্যাকশান আর লাইভ অনুষ্ঠানের কথা শুনলে তারা “না” বলতে পারেন না। না বলবেন কেন? প্রোগ্রামে এসে কোনদিন তো তারা নিজেরা ঠকেন না; ঠকে দর্শক। যাবার সময় মজুরীর চেকখানা ঠিকই নিয়ে যান। তাই আমি এই টকশোর নাম দিয়েছি ঠকশো।
দর্শকদের সারারাত জাগিয়ে রাখার জন্যে তারা ঠকশো মার্কা টিভি অনুষ্ঠানমালা সাজায়। রাত যত গভীর হয় তাদের অনুষ্ঠান তত আকর্ষনীয় হয়। ঠিক আকর্ষনীয় নয়, তথাকথিত আকর্ষনীয় হয়। কেউ টকশো চালায়, কেউ চালায় গানের লাইভ। যত ধরনের জনপ্রিয় গান আছে তা তারা সারারাত শোনায়। সাংঘাতিক রকমের তাদের প্রচেষ্টা যেন দর্শক ঘুমাতে না পারে। রাতভর জাগিয়ে রাখার গুরত্বভার নিয়েই যেন তারা মিডিয়ার লাইসেন্স পেয়েছেন। সরকার তথা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নেগেটিভ প্রচারনা চালানো, জাতিকে রাতভর জাগিয়ে রেখে দিনভর ঘুম পাড়িয়ে কর্মবিমুখ করা ছাড়া বর্তমান মিডিয়া আর কোন সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে বলে আমার মনে হয় না।
জাতিকে রাতভর জাগিয়ে রাখার কাজটি মিডিয়ার পাশাপাশি মোবাইল অপারেটররাও করে। মোবাইল অপারেটরদের ব্যবসায়িক নোংরামী নিয়ে বিস্তর লেখা আবশ্যক। কলচার্জ নির্ধারনের ক্ষেত্রেএরা যা করে কিংবা মানুষদের যেভাবে নানা ধরনের প্যাকেজের মধ্যে ফেলে ইঁদুর বিড়াল খেলা খেলে তা সুস্থ ব্যবসার পরিচয় বহন করে না। সবচেয়ে জঘন্য কাজটি করে গভীর রাতে কলচার্জ পানির দরে নামিয়ে এনে। সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে এই সময়ে জাগিয়ে রেখে ফোনে কথা বলাতে। জঘন্য এই টকটাইমের ফাঁদের কারনে দেশপ্রেমিক জাতি এখন প্রেমপ্রেমিক জাতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। গভীর রাতের অগভীর প্রেমিক জাতি।
আবার রাতভর প্রেমালাপ জাতির একটি অংশকে দিনভর ঘুম পাড়িয়ে রাখে। বিশেষ করে যুবা শ্রেণী এখন দিনে চোখ খুলতে পারে না। দেশের উৎপাদন এতে করে কমে যাচ্ছে। সাথে আছে ফেসবুক। দেশের মানুষ লাইক পাবার জন্যে কতটা লালায়িত তা ফেসবুক না দেখলে বোঝা যাবে না। আজকাল এখানে সবার মাতামাতি দেখলে মনে হয় দেশের মানুষ আগেকার দিনে সোস্যাল বা সামাজিক ছিল না। এখন সামাজিক হয়েছে। সোস্যাল নেটওয়ার্কিং ফেসবুকে এসে রাতভর সোস্যাল ওয়ার্ক করছে। মিনিটে মিনিটে মানুষ এখানে তাদের ষ্ট্যাটাস দেয়। ষ্ট্যাটাসের ধরনও অদ্ভুত; আমি এখন ষ্টেশনে, রাস্তায় রিক্সা খুঁজছি, শুয়ে আছি ঘুম আসেনা, মন ভাল নেই, টয়লেট চেঁপেছে মার্কা ষ্ট্যাটাস দেখে ফেসবুক নিজেই ত্যাক্ত এবং বিরক্ত।
বিরক্তিকর আরেক প্রোগ্রামের নাম সিরিয়াল। বাংলাদেশের প্রতিটি চ্যানেলের প্রতিটি সিরিয়ালের বিষয়বস্তু হলো প্রেম বিষয়ক চেংরামো। কমেডির নামে মানুষকে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসাবার প্রানান্তকর চেষ্টা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিক ভাষা কিংবা শহুরে মানুষদের ঘরোয়া ভাষা ছাড়া এসব সিরিয়াল অচল। এই কাজের পথিকৃত একজন নাট্যকার। তার নেতৃত্বে একটি গ্রুপে আরো ক’জন আছেন। তারাই এই প্রচলন চালু করেছেন। তাদের প্রকৃত দায়িত্ব হলো নাটকের মাধ্যমে পুরো জাতিকে এক সুতোয় বেঁধে শিক্ষিত করা; প্রমিত ভাষা, কৃষ্টি এবং কালচারে অভ্যস্ত করে আধুনিক বাঙালী জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।সে সব ভুলে পুরো জাতিকে নিয়ে তারা মরণ খেলায় নেমেছেন। তথাকথিত বাস্তব এবং জীবনমুখী নাটক করতে যেয়ে জীবনের যত নোংরামী আছে কেবল সেটাই তুলে ধরছেন। তাদের নাটকের প্রভাবে পুরো সমাজ উছলে যাচ্ছে। ভয় হয় কোন্দিন না টয়লেটে বসে মানুষ কী করে সেটারও চিত্রায়ন করে তাদের নাটককে আরো জীবনধর্মী করে বসেন!
এসব প্রচার করেও টিভি মিডিয়া বেশ দাপটের সাথেই সমাজ এবং রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। ঘটা করে শ’খানেক কেক কেটে তাদের টিভির জন্মদিন পালন করছেন। অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেলেই ভিআইপিদের ঢল নামে টিভি ষ্টেশনে। কারণ ভিআইপিরা টিভি পর্দায় মুখ দেখাতে পছন্দ করে। নিজেকে পরিচিত করতে চায়। কী সাধারণ, কী অসাধারণ মানুষ; সবাই ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চায়। জনমভর জানতাম রাত ১২টায় কেবল শহীদ মিনারে মানুষ ফুল নিয়ে যায়। এখন দেখছি টিভির জন্মদিনেও রাত বারোটায় ফুল নিয়ে যায়; কেক কাটে। আর এ দাওয়াতে শামিল হয় আবালবৃদ্ধবনিতা। সুন্দরী রমনীর দল, অভিনেতা অভিনেত্রীর ঢল, লেখক, সাংবাদিক কেউই বাদ যায় না। সবচেয়ে বেশী চোখে পড়ে ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের। তাঁরা পোষাকও পড়েন ফিনফিনে চকচকা। বয়সের দিকে তাকান না। নেতা যত বুড়ো হয়, তাঁদের পাঞ্জাবীর রঙও তত রঙিন হয়। রঙে রঙে পুরো অনুষ্ঠানে একটি রঙের দুনিয়া তৈরী করেন।
হাসি হাসি মুখে দলবেঁধে তারা লাইভ সাক্ষাতকার দেন। মোটামুটি সবার কথার ধরন, শব্দের চয়ন একই রকমের থাকে। মূল লক্ষ্য থাকে টিভি কর্তৃপক্ষকে ইচ্ছেমত পাম দেয়া। যেন জন্মদিনের কেক খেতে নয়, পাম দিতেই এসেছেন। সাজানো গোছানো কথা বলার চেষ্টা করেন আর মিটি মিটি চোখে ক্যামেরার দিকে তাকান। প্রথমে বলেন, সৌভাগ্য আমার ঐতিহাসিক এই মুহুর্তে এখানে থাকতে পেরে; আমি ধন্য। এভাবে কিছুক্ষন চালান। মিটিমিটি চোখে এদিক ওদিক তাকান। পরে মুখ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে বলেন, দেশে অনেক চ্যানেল আছে; কিন্তু এই চ্যানেলটি একেবারেই আলাদা, অন্যরকম। এর অনুষ্ঠানগুলোর ধরনই আলাদা। বাংলাদেশের সমাজ এবং সংস্কৃতিতে চ্যানেলটি বিশাল ভূমিকা রাখছে। কেবল বলেন না, চ্যানেলটি জাতিকে কিভাবে বাঁশ দিচ্ছে। বলবেন কিভাবে? বাঁশের ভয় তো তাদেরও আছে!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।