জামিল আক্তার রতন,বিপ্লবী সরকার ও প্রাসংগিক কিছু ভাবনা

70

অনুপ কুণ্ডুঃ দেশের কোভিড-১৯ পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তখন সরকার জানিয়েছে সাধারণ ছুটি আর বাড়ানো হবে না।আপামর জনসাধারণকে জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে ফেলে চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে।কে আক্রান্ত হবে- কে হবে না,কে মারা যাবে- কে বেচে থাকবে।কারা কোভিডে মরবে আর কারা না খেয়ে মরবে সেটা আরেক দোলাচল!গভীর অনিশ্চয়তা আজ যাপিত জীবনের আস্টেপৃষ্টে ছায়ার মতো লেপ্টে আছে প্রতিটি মানুষের সত্ত্বাজুড়ে ।
গালভরা বুলিসর্বস্ব “করোনা যুদ্ধ”এর মধ্যেই চলছে দিনাতিপাত।এ যুদ্ধে কোভিড -১৯ ইতোমধ্যে জয়ী হয়ে বিজয়ের হাসি হাসছে। পুজিবাদী বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন ব্যর্থতা,অদক্ষতা,দায়িত্বহীনতার কারণে সারা বিশ্বের প্রায় সমগ্র জনগণ পরাজয় বরণ করেছে।দুই চারটি দেশ এবং ঐ দেশের জনগণ করোনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে তাদের শাসনকর্তাদের দক্ষতা ,যোগ্যতা এবং নিজ মানুষের প্রতি দায়বোধের কারণে।বাকী বিশ্ব পরাজিতের কাতারে। সামগ্রিকভাবে মানুষ পরাজিত হয় নি, হয়েছে শাসকেরা আর তাদের সিস্টেম। অর্থাৎ পুঁজিবাদী –সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী পরাজিত। সীমিত আকারে জয়লাভ করেছে যারা- তারা পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানবিক শক্তির আধারে পূর্ণ শাসকবৃন্দ। সংগতকারনেই এই মানবিক শক্তির আরাধ্য রাজনৈতিক শক্তির পক্ষকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। এই শক্তিই মানুষকে দিশা দিতে পারে। শক্তিশালীকরণের যুদ্ধই সত্যিকারের যুদ্ধ। যা হবে পুজিবাদী বর্বর শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন,শোষণ,বঞ্চণা,নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।অবশ্যই পুজিবাদ- সাম্রাজ্যবাদের প্রিয় সহযোগী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বৃহৎ পরিসরে সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধ। পুজিবাদ- সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন যুদ্ধে জয়ী হয়েই প্রতিষ্ঠা করতে হবে মানবিক শক্তির আধারে পরিপূষ্ট নতুন সমাজ কাঠামো,রাষ্ট্র কাঠামো ।

২)শহীদ জামিল আক্তার রতন ছিলেন আরাধ্য নতুন সমাজ ওরাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণের অগ্রণী যোদ্ধা। আজ এই লড়াকু যোদ্ধা ৩২ বছর ধরে স্বশরীরে আমাদের সাথে নেই।সামনা সামনি না থেকেও তিনি আছেন আমাদের সমগ্র সত্ত্বা জুড়ে, আছেন সমগ্র চৈতন্যে।নেপথ্যে থেকে তিনি আমাদের শক্তি যোগাচ্ছেন ,সাহস যোগাচ্ছেন আরো অগণিত শহীদের মতো । গত শতকের আটের দশকের লড়াকু যোদ্ধা আমাদের নেপথ্য নায়ক। আমরা যারা বর্তমানে সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধ লিপ্ত রয়েছি তাদের কাছে আরো অনেক অনুপস্থিত যোদ্ধারাই নায়ক,বীরযোদ্ধা। সেই ভগত সিং থেকে শুরু করে সূর্য্যসেন,প্রীতিলতা, চারু মজুমদার, সিরাজ সিকদার হয়ে আসাদ,জামিল আক্তার রতন, রিমু ,রুপম,তাজুল ,ডাঃমিলন প্রমূখজন বীর নায়ক আমাদের। সীমাবদ্ধতা মানুষের সহজাত। আমাদের নায়কেরাও সীমাবদ্ধ ছিলেন। সকল সীমাবদ্ধতাসহ এই নেপথ্যের অনুপ্রেরণাদাতা বীরেরা সমাজ পরিবর্তনের সুদীর্ঘ পথের এক একটি মাইলস্টোন। সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধকে তারা প্রত্যেকেই দিশা দেখিয়ে গেছেন।এই দিশাই যুদ্ধ জয়ের পাথেয়।রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারনের অন্যতম নিয়ামক।
কোভিড-১৯ মোকাবিলার হাওয়াই যুদ্ধের পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনের প্রকৃত যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করা জরুরী।সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী মহল কিন্তু হাওয়াই যুদ্ধের হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে বসে নেই।তারা নিত্য নতুন ছলাকলায় আগ্রাসন, নিপীড়ন শোষণের ধারা অব্যাহত রেখেছে। বিদ্যমান দুর্যোগ দুরাবস্থার মধ্যে বিলিয়নিয়াররা আরো সম্পদের মালিক হয়েছে।সামাজিক দূরত্বের বাধ্যবাধকতার কারনে আইটি বিজনেস টাইকুনরা ফুলে ফেপে উঠছে। কোন প্রকার ব্যবসায়িক ছাড় দিয়ে তারা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায় নাই।সাবান,স্যানিটাইজার,মাস্ক পিপিই বাণিজ্যের কুশীলবদের কাছে কোভিড ১৯ এসেছে আশীর্বাদ স্বরুপ। ওষুধসহ চিকিতসাসামগ্রী থেকে ভোগ্যপণ্য কোন কিছুরই অত্যাধিক মুনাফাকেন্দ্রীক বাণিজ্য থেমে নেই। স্বাভাবিক সময়ের মতো শোষণের ধারা অব্যাহত রেখেই মুনাফাবাজরা মুনাফার চাকা ছুটিয়ে চলছে দূরন্ত গতিতে।বৈষম্যের পাল্লা ভারী হচ্ছে ক্রমশ। আগামীদিনগুলোতে দুর্ভোগ, দুরাবস্থা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠবে এর ফলে। এদিকে সাম্রাজ্যবাদী ,পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর প্রিয় সহযোগী সাম্প্রদায়িক পাণ্ডারাও বসে নেই।তারাও নানা প্রকার ফন্দি ফিকির করে শোষণ ,বৈষম্যের পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে। চিন্তার জগতে তারা নানাধরনের গোজামিল পাকিয়ে মানুষজনকে বিভ্রান্ত করে।ভয় এবং লোভের মিশ্রনে ধোয়াশাচ্ছন্ন মেকি দুনিয়ার আবহ তৈরী করে সম্ভাবনাময় মানুষকে অকেজো প্রাণীতে রুপান্তরিত করে রাখে। সমাজ পরিবর্তনের প্রকৃত যোদ্ধাদের পিছন দিক দিয়ে ছুড়িকাঘাত করার জন্য সদা প্রস্তুত তারা। এভাবেই বর্বর শাসকগোষ্ঠীর সেবা করে এসেছে বরাবর সাম্প্রদায়িক পাণ্ডারা।
৩) গণতন্ত্রের আকুল আকাঙ্ক্ষায় বিগত আটের দশকের তরুণ ছাত্র –যুবকরা স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধরত তখন সাম্প্রদায়িক এই পাণ্ডাদের রাষ্ট্রীয় মদদ দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয় ।সাম্প্রদায়িক বিভাজনে জনগণকে বিভক্ত করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে স্বৈরাচার এরশাদ। সংবিধানে ৮ম সংশোধনী পয়দা করে ইসলামিক রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্তের অংশ হিসেবে হয় “রাষ্ট্র ধর্ম বিল” ।অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশের মানুষ এরশাদের অপ উদ্যেশ নস্যাৎ করে দিতে তুমুল আন্দোলন সংগঠিত করে। সেই আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় উস্কানি এবং মদদে হামলা করে আইয়ুব শাহীর সেবাদাস ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রেতাত্মা ইসলামি ছাত্র শিবির । ১৯৮৮ সালের ৩১ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেইন হোস্টের সামনে ভর দুপুরে অসংখ্য মানুষের উপ্সথিতিতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নৃসংশত্যা করে জামিল আক্তার রতনকে। এর আগে ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা শাহাদাত হোসেনকে নির্মমভাবে জবাই করে হত্যার রাজনীতির সূচণা করে ছাত্র শিবির। ১৯৮৮ সালেরই জুলাই মাসে জাসদ ছাত্র লীগের নেতা জিএস প্রিন্স,আইয়ূব আলী,আহসানুল কবির বাদল,ভিপি নওশাদ সিলেটের মুনির, জুয়েল, তপনের উপর হামলা করে পঙ্গু করে কিংবা হত্যা করে। ঘাতক শিবিরের হামলা ও হত্যা যজ্ঞের হাত থেকে রেহাই মেলেনি মুজিববাদী ছাত্র লীগ ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা কর্মীরাও।তবে ছাত্র মৈত্রী ও জাসদ ছাত্র লীগের নেতা কর্মীরা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাল্টা রক্তচক্ষু রাঙ্গিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে।হত্যা কিংবা হামলার শিকার তাদেরই বেশি হতে হয়েছে।প্রকৃত যোদ্ধারা হত্যা, হামলা, মামলায় পিছপা দেয় না কখনই। জামিল,রিমুরাও পিছপা দেয় নি। শত্রুর হামলায় জীবন বিসর্জন দিয়ে লড়াইয়ের ঝাণ্ডা তুলে দিয়ে গেছেন আমাদের হাতে।
৪)অতীত ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে ঘাতক শিবির আজ তাদের শ্রেণী সহযোগীর কাছে নাস্তানুবুদ। শক্তিহীন কাল নাগিনী। শাসকগোষ্ঠীর প্রয়োজনে তারা যেকোন সময়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে মরণ ছোবল মারতে পারে। সাবধান থাকতে হবে। শিবির দৃশ্যে অনুপস্থিত তাতে হাফ ছাড়ার সুযোগ নেই।অপরাপর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মজুত আছে।শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ হয়ে ছোবল মারার জন্য।আপাতত এরা নিরীহ, গোবেচারাভাব নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামিল থাকার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।অনেকেই বিভ্রান্ত হতে উদ্গ্রীব।প্রকৃত যোদ্ধাদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই।প্রকৃত যোদ্ধদের সামনে আছেন ভগত সিং,সূর্যসেন,আসাদ, জামিল আক্তারদের সমৃদ্ধ খেরোখাতা। বিভ্রান্ত হবেন সংস্কারবাদীরা অবধারিত। সংস্কারবাদীরা আপাত কিছু ভাল কাজ করে থাকলেও চূড়ান্ত অর্থে তারা শাসকগোষ্ঠীর এলোমেলো শাসন ব্যবস্থাকে সংযত করে দেয় শুধুমাত্র।শোষণ ,বৈষম্য নির্মূল করার কাজ তারা সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে।তারা যোদ্ধা নয়। বড় মাপের মানুষ হয়েও সংস্কারকূল শিরোমনি রামমোহন রায় ঔপনিবেশিক শোষকদের অন্যায় শাসনের বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করায় রাজা উপাধিতে ভূষিত হয়ে তৃপ্ত হন। এখনকার সংস্কারবাদীরা রামমোহনের তুলনায় অতি নগণ্য।
তবে পুজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দেশীয় তাবেদার লুটেরা শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক পাণ্ডাদের দিয়েই শুধু তাদের উদ্যেশ্য হাসিল করে না। তাদের শোষণ ,নিপীড়নমূলক বর্বর ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য আরো অনেক হাতিয়ার ব্যবহার করে। শিক্ষা,সংস্কৃতি,মতামত গঠনের যাবতীয় মাধ্যমকে তারা কলুষিত করে ধ্বংস করে রেখেছে।এসব এখন কঙ্কালে পরিণত হওয়ার উপক্রম।মেকী উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক অগ্রগতির অসাড় দর্শনে আমজনতাকে মোহাবিষ্ট করতে করতে নিজেরাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।শাসকদের তর্জন গর্জন এদের দর্শনের মতোই অসাড়,নিস্ফলা।সামান্য অনুজীব কোভিড ১৯ তাইতো এত সহজে নাস্তানুবুদ করতে পেরেছে।
৫)বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে জয়ী হয়ে মানবিক সমাজ তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থা পত্তনের উদোগ গ্রহন এখন সময়ের চাওয়া।লোকদেখানো দাবি আদায়ের আন্দোলন আর কত! রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে যুদ্ধের গতিমুখ নির্ধারণ করার কাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে।ক্যামোফ্লেজ তৈরীর আন্দোলন –সংগ্রামে সময়, শ্রম এবং সম্ভাবনারই নস্ট হয় শুধু।বিপ্লবী অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু রোধ করা। জামিল আক্তার রতনদের আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তা হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
লাল সালাম শহীদ জামিল আক্তার রতন।-লেখকঃ সাবেক সহ- সভাপতি, ছাত্র মৈত্রী।