জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলবেন প্রধানমন্ত্রী

যুগবার্তা ডেস্কঃ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭২তম অধিবেশনে যোগ দিতে গতকাল শনিবার নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বছর এমন এক সময়ে বিশ্বনেতারা জাতিসংঘ অধিবেশনে মিলিত হচ্ছেন, যখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের ‘মূল কারণগুলো’ দেখিয়ে তা নিরসনে বাংলাদেশের প্রস্তাব জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন।

প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট গতকাল দুপুর ২টা ১০ মিনিটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাজধানী আবুধাবির উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে ।

জাতীয় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, তিন বাহিনীর প্রধানরা, কূটনৈতিক কোরের ডিন এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান। কয়েক যুগ ধরে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা নির্যাতনের মুখে গত কয়েক দিনে কক্সবাজার ও আশপাশের জেলায় আরো প্রবেশ করেছে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা। রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংখ্যা ১০ লাখে ঠেকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গাদের এই মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও মিয়ানমার তাদের অবস্থানে অনড়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শরণার্থী সংকট এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুতর আকার ধারণ করেছে। ‘লাখ লাখ অসহায় রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা দিতে এবং তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ আজ এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি।

’ তিনি জানান, এই সংকটের মুহূর্তে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরবেন। পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের সুস্পষ্ট প্রস্তাব তিনি জাতিসংঘে উপস্থাপন করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র নজরুল ইসলাম গতকাল এএফপিকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরবেন। তিনি রাখাইনে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানাবেন, তিনি যাতে রাখাইনে সহিংসতার তদন্তে দল পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিরও আহ্বান জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। ’

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ফ্লাইটটি গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে আবুধাবি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। আবুধাবিতে যাত্রাবিরতির পর শেখ হাসিনা আজ সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ইত্তিহাদ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে করে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেবেন। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে তিনি নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম জিয়াউদ্দিন ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থান করবেন।

শেখ হাসিনা ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। একই দিন তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।

শেখ হাসিনা ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত জাতিসংঘের সংস্কার বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘প্রিভেনশন অব সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন অ্যান্ড অ্যাবিউজ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী অপরাহ্নে কনবেনি কনফারেন্স সেন্টারে ‘গ্লোবাল ডিল ফর ডিসেন্ট ওয়ার্ক অ্যান্ড ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের এক ফলোআপ বৈঠকে যোগ দেবেন। এর আগে শেখ হাসিনা ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টবগের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।

১৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন। এর আগে তিনি ‘উইমেন্স ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট ফর লিভিং নো ওয়ান বিহাইন্ড’-এর ওপর জাতিসংঘ মহাসচিবের উচ্চপর্যায়ের প্যানেলের সঙ্গে এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেবেন।

প্রধানমন্ত্রী অপরাহ্নে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ওআইসি কন্টাক্ট গ্রুপের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেবেন। পরে মৌরিসাসের প্রধানমন্ত্রী প্রভিন্দ কুমার জুগনাউথের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।

সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ও কমনওয়েলথের বর্তমান চেয়ার-ইন অফিস মাল্টার প্রধানমন্ত্রী ড. জোসেফ মাসকেট আয়োজিত কমনওয়েলথ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

শেখ হাসিনা সন্ধ্যায় ম্যাডিসন এভিনিউয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত শুভেচ্ছা সংবর্ধনায় অংশ নেবেন। পরে তিনি নিউ ইয়র্কের ম্যারিয়ট স্কয়ারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেবেন।

২০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ইউএনএইচকিউতে পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের ওপর চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন।

পরে ইউএনএইচকিউতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট মিজ কেরস্তি কালজুলাইদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে।

পাশাপাশি শেখ হাসিনা ‘এসডিজি ইমপ্লিমেন্টেশন, ফিন্যান্সিং অ্যান্ড মনিটরিং : শেয়ারিং ইনোভেশনস থ্রু সাউথ-সাউথ এবং ট্রায়াঙ্গুলার কো-অপারেশন’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ইউএনএইচকিউতে সাউথ-সাউথ কো-অপারেশনের ওপর ইউএনডিপি এবং ইউএন অফিসের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে।

পরে প্রধানমন্ত্রী ‘ক্রিয়েটিং এ পলিসি ভিশন ফর এসডিজি ফাইন্যান্স : ফ্যাসিলিট্যাটিং প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট ইন দ্য এসডিজিস’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ইউএনএইচকিউতে ইউএনডিপির সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশ ও কানাডা অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বিজনেস কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং (বিসিআইইউ) আয়োজিত একটি গোলটেবিল মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।

পরে শেখ হাসিনা উন্নয়নের জন্য সার্বিক অর্থায়ন বিষয়ক জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমার সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ইস্যুতে ইথিওপিয়া প্রতিনিধিদল আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের উন্মুক্ত আলোচনায় যোগ দেবেন।

শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান প্রফেসর ক্লাউস স্কোওয়াব এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সদানন্দ ধুমির সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর হোটেলে ভার্জিনিয়ার আইবিএমের প্রেসিডেন্ট মেরি রোমেটি সাক্ষাৎ করবেন।

এরপর কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাসগিম থাচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

পরে প্রধানমন্ত্রী ইউএনএইচকিউয়ে পানিবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেলের চতুর্থ বৈঠকে যোগ দেবেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে তাঁর এই জাতিসংঘ সফরের ওপর সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন।

শেখ হাসিনা ২২ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক থেকে সড়কপথে ভার্জিনিয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন। ভার্জিনিয়ায় এক সপ্তাহ অবস্থানের পর তিনি ২৯ সেপ্টেম্বর দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন।

প্রধানমন্ত্রী ২ অক্টোবর দেশে ফিরবেন।

ওয়াশিংটনে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করবেন শেখ হাসিনা

আমাদের নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করবেন। যদিও ওয়াশিংটনে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি স্থানীয় মেট্রো ওয়াশিংটন, ভার্জিনিয়া ও ম্যারিল্যান্ড স্টেট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ওয়াশিংটন ডিসির পার্শ্ববর্তী অঙ্গরাজ্য ভার্জিনিয়ায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও পালন করা হবে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ভার্জিনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাসায় ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে জন্মদিন পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালন উপলক্ষে গত বুধবার সন্ধ্যায় ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডের একটি রেস্তোরাঁয় স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের এক যৌথ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।-কালেরকন্ঠ