জনমনে উদ্বেগ, অস্বস্তি

যুগবার্তা ডেস্কঃ ডেডলাইন ৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনীত একটি দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার কথা। খালেদা জিয়ার কি সাজা হবে? এ প্রশ্ন সকলের মধ্যে। অনেকে মনে করছেন, রায় ঘোষণার দিন পেছাতেও পারে। সবকিছু মিলিয়ে জনমনে রয়েছে উদ্বেগ, অস্বস্তি।

রায়ে সাজা হলে কী করবে বিএনপি? দলের চেয়ারপারসনের কারাবন্দির ঘটনার প্রতিবাদ কি শান্তিপূর্ণভাবে করবে, নাকি সহিংস ঘটনার মাধ্যমে? দলটির হাইকমান্ড ‘শান্তিপূর্ণ’ প্রতিবাদের কথা বলেও মঙ্গলবার পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় সে সম্ভাবনা কিছুটা ক্ষীণ হয়ে আসছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন কি-না, সে প্রশ্নও উঠেছে।

এদিকে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সতর্ক অবস্থানে থাকার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। রায়ের দিনের আগে-পরে রাজপথে নেতাকর্মীদের অবস্থান রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যে কোনো ধরনের সহিংসতা হলে ‘প্রতিহত’ করার কথাও জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। রায় ঘিরে কোনো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশও। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে। শুরু হয়েছে ধরপাকড়ও।

বড় ধরনের গোলযোগ হলে এসএসসি পরীক্ষা এবং বইমেলা নির্বিঘ্নে চালানো কষ্টসাধ্য হতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকরা পরীক্ষার সময় আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে না বলে আশা করছেন। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারাই হোন, এমন কিছু করবেন না, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতি হয়। আমরা আগেও এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নিতে পেরেছি। তবে অনেক কষ্ট হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কষ্ট হয়েছে।’

একই আশাবাদ ব্যক্ত করছেন বইমেলার উদ্যোক্তা, লেখক ও পাঠকরাও। অবশ্য বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বলেন, এর আগেও বইমেলা হরতাল-অবরোধের মধ্যে হয়েছে। তারপরও বইপ্রেমীরা এসেছেন বইমেলায়।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল রাজধানীতে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করেছে বিএনপি। প্রথম দিকে বেশ কয়েটি মিলনায়তন ভাড়া নিতে না পারলেও সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিমানবন্দর সড়কে হোটেল লা মেরিডিয়েনে দলের নির্বাহী কমিটির সভার কথা ঘোষণা করেছে দলটি।

সূত্র জানায়, দলের চেয়ারপারসনের মামলার দিন ঢাকাসহ সারাদেশের রাজপথে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে রাজধানীতে বিপুল নেতাকর্মীর জমায়েত ঘটাতে চায় তারা। রায়ে দলের চেয়ারপারসনের সাজা হলে ওই দিন ঢাকার রাজপথে কঠোর প্রতিবাদ করার পরিকল্পনা দলের হাইকমান্ডের। আবার রায়ে তিনি খালাস হলেও বিজয় আনন্দ করতে চায় তারা।

বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, আগামী নির্বাচন বানচাল হোক- এমন কোনো কর্মসূচি-পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করতে চান না। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা রয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে দলের চেয়ারপারসনের মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। মামলার রায়ের দিন প্রতিটি জেলায় নেতাকর্মীরা রাজপথে জমায়েত হবে। ঢাকার আশপাশের জেলার নেতারা ঢাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিশাল জমায়েত ঘটাতে চান।

অবশ্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারা সংঘাত-সহিংসতা চান না। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ষড়যন্ত্রমূলক মামলার ইস্যুসহ যে কোনো কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণভাবে করতে চান। কেউ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার শঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদও প্রায় একই কথা বললেন।

এদিকে আওয়ামী লীগ সূত্রগুলো জানিয়েছে, মূলত খালেদা জিয়ার রায় ঘোষণার আগের দিন থেকেই রাজপথে এমন সতর্ক অবস্থান নেবেন দলীয় নেতাকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে ৭ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ঢাকা মহানগরীর সব থানা ও ওয়ার্ডে নেতাকর্মীদের সতর্ক প্রহরায় রাখা হবে। ৮ ফেব্রুয়ারি দিনভরও নেতাকর্মীরা মাঠে একই রকম তৎপরতা দেখাবেন। যে কোনো ধরনের সহিংসতা হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে থেকে তা প্রতিরোধ করার নির্দেশনাও থাকবে নেতাকর্মীদের প্রতি।

সবকিছু চূড়ান্ত করতে দলীয় হাইকমান্ড ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতাদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি নগর উত্তর ও ৬ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে। ওই বর্ধিত সভা থেকেই থানা ও ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হবে। অবশ্য রাজপথে অবস্থান থাকলেও আপাতত বিএনপির পাল্টা কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করার পরিকল্পনা নেই দলের মধ্যে। কোনো অবস্থায় উস্কানি দেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা হবে না। এ ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান ও পরিস্থিতি দেখে ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ কথা জানিয়েছেন দলের কয়েকজন নেতা।

দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে কোনো নাশকতা হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। এরই মধ্যে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ গ্রেফতার করছে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, আওয়ামী লীগ রাজপথে সতর্ক অবস্থানে থাকবে। তবে নাশকতা ও সহিংসতার প্রচেষ্টা হলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে থেকে প্রতিহত করা হবে।

গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরে নবনিযুক্ত আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৮ ফেব্রুয়ারি কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, কাউকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। আইন সবার জন্য সমান। কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায়, তাহলে তা আইনের মধ্যে থেকেই শক্তভাবে মোকাবেলা করা হয়। -সমকাল