‘জনগণের জন্য, যা আসলেই জনগণের

16

শান্তনু দে: বলিভিয়ার অর্থনৈতিক ‘বিস্ময়ের’ অন্যতম স্থপতি তিনি। যিনি কখনও অস্বীকার করেন না তাঁর মার্কসবাদী শিক্ষার কথা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ভাষায় ‘যিনি কথা বলেন একজন মার্কসবাদীর মতো’, তিনি মোরালেসের মতো হতদরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান নন।
বলিভিয়ার নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি লুইজ আরসেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। রাজধানী লা পাজে বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। লা পাজের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ব্রিটেনে। বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছেন কলম্বিয়া, হার্ভার্ড থেকে পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিকাগো থেকে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যাপনা করেছেন দেশের একাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। নানা পদে, টানা ১৮ বছর কাজ করেছেন বলিভিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কে।
২০০৬-১৯, অভ্যুত্থানে মোরালেস অপসারিত হওয়ার সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন অর্থমন্ত্রী।
বেসরকারিকরণ থেকে যিনি হাইড্রোকার্বন ক্ষেত্রের জাতীয়করণ করেছেন। এবারে নির্বাচনী প্রচারে যিনি বলেছেন: সাদা সোনা ‘লিথিয়াম লুটের লক্ষ্যেই অভ্যুত্থান করানো হয়েছিল। যার মালিক আসলেই ছিলেন বলিভিয়া মানুষ, যা থাকবে বলিভিয়ার। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা কিছুতেই বহুজাতিকের হাতে তুলে দেব না। আমাদের মালিকানা আমরা সুনিশ্চিত করব। আমরা পুনরুদ্ধার করব আমাদের দেশকে, আমাদের গণতন্ত্রকে। যে সরকার হবে জনগণের সরকার।’
আমেরিকার মদতে সামরিক অভ্যুত্থানে অপসারিত মোরালেস এখন নির্বাসনে। আর্জেন্টিনায়। তিনি তাই
ছিলেন মোরালেসের দল মুভমেন্ট ফর সোস্যালিজমের (এমএএস) প্রার্থী।
আরসেইয়ের সময় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সঙ্কট সত্ত্বেও বলিভিয়ায় গড়পরতা বিকাশের হার ছিল ৫ শতাংশ। তেল ও গ্যাসের জাতীয়করণ এবং স্ট্র্যাটেজিক সংস্থগুলির পুনরুদ্ধারের কারণেই আসে এই সাফল্য। চরম দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়ায় প্রায় অর্ধেক। ২০০৫ সালে যেখানে ছিল ৩৮.২ শতাংশ, ২০১৮-তে কমে দাঁড়ায় ১৭.১ শতাংশ।
২০০৫, সেসময় বলিভিয়াতে ন্যূনতম মজুরি ছিল লাতিনের দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম। ৫৪ ডলার। ধনীশ্রেষ্ঠ ১০ শতাংশের সঙ্গে হতদরিদ্রের ব্যবধান ছিল ১২৮ গুণ। গড় আয়ু ছিল লাতিনের মধ্যে সবচেয়ে কম। ৬৩.৫ বছর। যেখানে প্যারাগুয়েতে ছিল ৭১.২ বছর।
নির্বাচনের দিন মেক্সিকোর লা জর্নাদা পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে এসব কথা জানিয়ে আরসেই বলেছেন: ২০১৯ সালে, বহু দেশকে ছাপিয়ে গিয়ে ন্যূনতম মজুরি পৌছয় ৩০৫ ডলারে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান নেমে এসেছে মাত্র ৪০-গুণে। গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭৩.৫ বছর।
সম্পদের পুনর্বণ্টন থেকেই এসেছে এই সাফল্য। যে কারণে মোরালেস বারংবার বলেছেন, ‘আরসেই এমন একজন প্রার্থী, যিনি অর্থনৈতিক বিকাশকে নিশ্চিত করবেন, সম্পদের পুনর্বণ্টন করবেন।’
আর জয়ের পর আরসেই বলেছেন, ‘সমগ্র বলিভিয়াবাসী এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমরা গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করছি, সবার উপরে, পুনরুদ্ধার করেছি আমাদের আশা-কে।’ মোরালেসকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘উনি সবসময়ই আমাদের মধ্যে আছেন, ওঁর কাজের জন্যই আজকে এই সাফল্য।’
নিজেকে বামপন্থী বলে ঘোষণা করলেও ‘গোঁড়া মার্কসবাদী’ হিসেবে বলতে নারাজ। তাঁর স্লোগান, ‘জনগণের জন্য, যা আসলেই জনগণের।’-লেখক: একজন সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, কলকাতা।