‘ছোট’রা কোথায় যাবে

5

ইন্দ্রজিৎ সরকারঃ ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক এলাকায় ঘুরে ঘুরে নানা রঙের বেলুন বিক্রি করত ছোট। ওর আসল নাম ইমন। তবে সেই নামে তাকে কেউ চেনে না। পথশিশুদের যে দলটির সঙ্গে সে ঘোরাফেরা করে, তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বলে তাকে ‘ছোট’ নামেই ডাকে সবাই। সেই ছোট বা ইমনের এখন একবেলা খাবার জোটে তো কোনোদিন না খেয়েই থাকতে হয়। কারণ এখন আর সড়কে আগের মতো মানুষ দেখা যায় না। যারা চলাফেরা করেন, তারাও করোনা সংক্রমণের ভয়ে বেলুন কিনতে চান না। ফলে ছোটর মতো অনেক পথশিশুর কাছে প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধটা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

ধানমন্ডি ও ফার্মগেট এলাকায় কয়েকজন পথশিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনাকালের শুরু থেকেই অন্য সবার মতো তারা বিপদে পড়েছে। সব স্বাভাবিক থাকলে বেলুন বা ফুল বিক্রি করে, প্লাস্টিকের বোতল বা কাগজ কুড়িয়ে তারা যৎসামান্য আয় করতে পারত। আবার আয় না থাকলেও হোটেলের উচ্ছিষ্ট বা দু-একজন মানুষের দয়ায় তাদের দিন চলে যেত। অবশ্য করোনার মধ্যেও প্রথমদিকে মানুষ টুকটাক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুকনো বা রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন কেউ কেউ। তবে যতই দীর্ঘ হচ্ছে দুঃসময়, ততই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। মাসখানেক ধরে সবাই যেন গুটিয়ে আছেন। এখন আর সেভাবে কোথাও খাবার পাওয়া যায় না।

ইমন ওরফে ছোট জানায়, তারা চার শিশু একসঙ্গে ঘোরাফেরা করে। অপর তিনজন হলো পরাগ, দয়াল ও সোহেল। তাদের কারও পরিবার আছে, আবার কেউ জানে না মা-বাবার পরিচয়। পরাগের মা গৃহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন বাসায় কাজ করতেন, আর বড় বোন পোশাক কারখানায়। বোনের চাকরি চলে গেছে, মাকেও কাজে নিচ্ছে না করোনা সংক্রমণের ভয়ে। ফলে কারও কোনো আয় নেই। ছোট্ট পরাগই বা কী করবে? এখন চাইলেও আর কেউ টাকা-পয়সা দিতে চায় না। কাজ তো নেই-ই। এদিকে দয়ালের তো মা-ই নেই। নিজে কিছু জোটাতে পারলে পেট ভরে, নইলে কেউ ফিরেও তাকাবে না। এই দলটিতে সবচেয়ে নিরীহ গোছের ছেলে সোহেল। কোনো বিষয়েই তার অভিযোগ নেই। শুধু কোথাও একটু খাবার পেলে ছুটে চলে যেতে চায়। তার বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করে বস্তির ঘরে শয্যাশায়ী, মায়ের হাতে কাজ নেই।

সোহেল ও দয়াল জানায়, বেলুন বা ফুল বিক্রি না হলে, কোনোভাবে খাবার না জুটলে তারা আগে ডাস্টবিনে চলে যেত। সেখানে ময়লার প্যাকেটে অনেক সময় উচ্ছিষ্ট খাবার মিলত। তবে এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। আগে একাংশ পচে যাওয়া ফল ফেলে দিতেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে আবার পথশিশুদের জন্য আলাদা করে রেখে দিতেন। এখন ফলের দোকানের আশপাশে ঘুরঘুর করেও কিছু মেলে না।

করোনাকালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন তরুণ উন্নয়নকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন। তিনি বলেন, ‘রমজান মাস এবং তার আগেও দীর্ঘদিন আমরা বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে প্রতিদিন কিছু মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। এতে পথশিশু, রিকশাচালক, নিরাপত্তাকর্মী, ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন এমন অনেকে উপকৃত হয়েছেন। ধানমন্ডি এলাকার পথশিশুদের কয়েকজন আগে এখানে একবেলা খাবার পেত। এখন তারা খুব সমস্যায় পড়েছে। সেদিন একজন এসে বলল, সারাদিনে মোটে চারটি বেলুন বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় দোকানি চারটি ডালপুরি দিয়েছিলেন, তা খেয়ে সারাদিন কেটেছে। রাতে একটি পাউরুটি ভাগাভাগি করে খাবে। এসব জানিয়ে তারা আমাকে আবারও খাওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে বলল। তবে আমার ও বন্ধুদের ব্যক্তিগত পর্যায়ের এ উদ্যোগ অর্থাভাবে আর চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সামর্থ্যবান কয়েকজন মানুষ এগিয়ে এলে আবার হয়তো এই নিরন্ন শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।’-সমকাল