চোখেরজলে নদিঃ

46

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ সেলফোনটা বেজে ওঠে। মাসুদুর রহমান সুজন নম্বরটা দেখে কেটে দেয়। অপরিচিত কোন কল ইদানীং সে ধরেনা। একবার – দুবার- তিন বারের বার বিরক্ত হয়েই কলটা রিসিভ করল। অন্য প্রান্তে অপরিচিত নারী কণ্ঠ “কেমন আছেন? আমি মিলি- রাসেদা বেগম মিলি। মনে পড়ে? বিস্ময়ের ঘোরে পড়ে যায় সুজন।
মিলি তুমি!! তুমি এখন কোথায়?
ঢাকায়।
তাতো বুঝলাম। ঢাকা কোথায়?
উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে।
তারপর?
তারপর আর কী। সাহেব মারা গেলেন ‘১৪ সালে। ছেলে-ছেলের বউ, নাতিদের সাথে এখন সিডনিতে থাকি। দেশে এসেছিলাম। এপ্রিলের ফাস্ট উইকে ওদেশে ফিরে যাবার কথা ছিল। করোনা বাধ সাধলো। আটকে গেলাম। বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছি। মাঝেমাঝে নাতির জন্য মনটা বড্ড উতলা হয়ে উঠে।
সিডনিতে আছো! কতদিন ধরে?
তা প্রায় পাঁচ বছর।
সুজন তাকে একদিন বাসায় আসতে বলে। মিলি- কী দরকার! যখন তোমার দুধাল গাভী ছিল, তখনি তুমি দুধ খাওয়াতে পারনি। এখন তুমি ছাগী কিনবে। সেই ছাগীর দুধ দোয়াবে– দুধ দিয়ে মিষ্টি বানাবে। সেই মিষ্টি— খাওয়াবে।
সুজন — আমার কী দোষ ছিল?
মিলি — আমি তোমাকে চিঠি পাঠিয়ে ছিলাম। তোমার ওচোখ বিশ্বাস করা যায়, ওচোখে ঝাপ দেয়া যায়। ভেবেছিলাম তুমি আসবে। আমার চোখের জল সেদিন নদি হয়ে সাগরে মিশেছে।

প্রথমে ঘোরের মধ্যে থাকলেও ঘোর কাটতে সময় লাগেনি। সেলুলয়েড এর পর্দার মত চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিলির কথা। পূর্ব ব্যারাকে বেলতলায় সাথিদের নিয়ে ছি- বুড়ি খেলতো। বেলা শেষে মাঠ পেরিয়ে- বেণী দুলিয়ে বাড়ির পথে ছুটে যেতো। যেন এক চঞ্চলা হরিণী।

সুজনের শিশুকাল কেটেছে পলাশীর পূর্ব ব্যারাকে। বিশাল এলাকা জুড়ে ব্যারাক। মাঝখানে বড় মাঠ। মাঠকে ঘিরে ছোট ছোট কোয়ার্টার। ব্রিটিশ ভারতে এখানে সেনা ছাউনি ছিল। ‘৫৬ সালের দিকে সেনা ছাউনি অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। পরে সরকারি কর্মচারীদের বাসাবাড়ি হিসেবে বরাদ্দ দেয় কর্তৃপক্ষ। সুজনের বাবা ডিসি অফিসের বড়বাবু। সেই সুবাদে ছয় নম্বর ব্যারাকের বাসিন্দা।

সুজন বাবার বড় ছেলে। দেখতে লিকলিকে তাল গাছের মত লম্বা। বাবুই পাখির বাসার মতো মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল। খেলার মাঠে সেই ছিল সেনাপতি। তাকে ঘিরেই অন্যরা মেতে থাকত। দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ফুটবল খেলা, গাছে উঠে চুরি করে আম পাড়া, পাখির বাসা ভাঙ্গা, মৌচাকে ঢিল ছোঁড়া – বরই পাড়া। সারা ব্যারাক মাথায় করে রাখা, দুষ্টের শিরোমণি সুজন। পাড়ার সব ছেলেদের মধ্যে দাঁড়ালে সবাইকে ছাড়িয়ে তার মাথা দেখা যেত। সেকারণে কোন অঘটন ঘটলে আঙ্গুল উঠতো তার দিকে। সবাই এক বাক্যে সাক্ষী দিত- বাবরী দোলানো ছেলেটাকেই শুধু তারা দেখেছে।

চৈত্র মাসে খাঁ খাঁ রোদ্দুর। সজনে গাছের তলায় একটি টিউবওয়েল ছিল। কী সুন্দর টলটলে পানি। ‘কপোতের আখির ন্যায় স্বচ্ছ যে জল।’ পাশে ছোট একটি চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চায় পানি ভরে চারি দিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লোকে গোসল করত। নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে আলাপ করতো। সুজন এসেই চৌবাচ্চার ভিতর নেমে কাকের মতো মাথা ডুবিয়ে,পানি ছিটাতো। এ নিয়েও কত অভিযোগ, কতকথা তার বাবা মাকে শুনতে হত।

সুজনের বাবা আব্দুল জলিল সাহেব একজন রাশভারী মানুষ। ব্যারাকের প্রতিবেশীরা প্রায়শই সুজনের নামে বিভিন্ন কমপ্লেইন নিয়ে তাঁর কাছে আসতো। “আপনার ছেলে বন্ধুদের নিয়ে আমার গাছের কাঁচা আম পেড়ে মরিচ লবন মেখে খেয়েছে। খাবে খাক তাতে দুঃখ নেই কিন্তু কলার পাতা, আমের ছোকলা, আমের আঠি ঘরের বারান্দায় ফেলে নোংরা করে রাখবে? আপনি এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করবেন মিয়াভাই।”

সুজন বাড়ি ফিরলে তার পিঠের উপর দিয়ে ধুলা উড়ে যেতো।

চাঁদতারা আমলের কথা। সুজনরা দু’ভাই তখন ৫ম শ্রেণির ছাত্র। ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। রেডক্রস সোসাইটি থেকে স্কুল গুলিকে “রেডক্রস’র মনোগ্রাম এবং পাকিস্তান জিন্দাবাদ” সম্বলিত স্টিকার দেয়া হতো। সাথে মুখে তালা লাগানো টিনের ছোট বাক্স। স্টিকার লাগিয়ে দিলে মানুষ সেচ্ছায় দু’চার আনা পয়সা বাক্সে ফেলে দিতো। এটা ছিল মূলত ছাত্রদের লিডারশীপ- সেচ্ছাসেবী হিসেবে গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ মাত্র। বিনিময়ে রেডক্রস সোসাইটি ছাত্রদের মাঝে রেডক্রস ব্যাজ, কোটপিনসহ বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী বিতরণ করত। কোটপিন ছিল বিশেষ মর্যাদা স্মারক। তাই ছাত্ররা অংশ গ্রহণের জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো।

সুজনরা দু’ভাই ভোরে স্কুলে আসে। হেড স্যারের কাছ থেকে স্টিকার- মগ নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। গুলিস্তান, ফুলবাড়ি এলাকায় ঘুরে ঘুরে স্টিকার বিতরণ করে। কাজ করতে গিয়ে তারা দারুণ মজা পায়। এক সময় দু’জন ফুলবাড়ি রেল ষ্টেশনে গিয়ে পৌছায়। উৎসাহের আতিশয্যে আগপাছ না ভেবে ট্রেনে উঠে বসে। নারায়ণগঞ্জ ষ্টেশন প্লাটফর্মে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে। হঠাৎ স্কুলে ফেরার কথা মনে পড়ে। দুপুর ২টার মধ্যে স্কুলে স্টিকার- বাক্স জমা দিয়ে টিফিনের প্যাকেট নিতে হবে।

৩টার আগে ফিরতি ট্রেন নেই। সুজনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। প্লাটফর্মের হেলনা বেঞ্চের উপর বসে পড়ে। ছোট ভাইটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ক্ষুধায় কাতর হয়ে আছে। পকেটে কোন পয়সা নেই, যাদিয়ে কিছু কিনে খাবে। দু’বার চাপ কলে গিয়ে পানি খেয়েছে। সুজন ছোট ভাইকে বসিয়ে রেখে এগিয়ে যায়।

প্লাটফর্মের পাশেই একটা পরিত্যক্ত ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। পেশাব করার উছিলায় তার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায় সুজন। এদিকওদিক তাকিয়ে দেখে নেয়। হাতে থাকা বাক্সটা রেল পাতের উপর রেখে ছোট্ট তালার উপর পাথর দিয়ে আঘাত করে। তালাটা খুলে যায়। খুশিতে চোখ চকচক করে উঠে। আটআনা পয়সা বের করে পকেটে ঢুকায়, আবার তালাটা কোনমতো লাগিয়ে রাখে।

দু’ভাই মিলে রাস্তার পাশে বসে তাওয়াতে ভাজা গরম রুটি সাথে ঝোলা গুড়- যেন অমৃতসম। খুব তৃপ্তি নিয়ে খায়। যখন স্কুলে ফিরে, তখন সন্ধ্যা প্রায়। স্কুলের সবাই চলে গেছে। গেট থেকে দেখা যাচ্ছে শুধু হেড স্যার আর দপ্তরি মধুদা তখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। মাথা নিচু করে স্যারের সামনে গিয়ে বাক্সটা জমা দেয়।

পরদিন স্কুলে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের মাঝে রেডক্রস’র উপহার সামগ্রী বিতরণ করে। কিন্তু তাতে সুজনদের দুভাইয়ের নাম নেই। মনখারাপ করে বাড়ি ফিরে বাপের কাছে দুভাই নালিশ দেয়। পরদিন তার বাবা দুজনকে সাথে নিয়ে স্কুলে গিয়ে হাজির হন। “মাস্টার সাহেব! জীবন বাঁচানো ফরজ। ক্ষুধার জ্বালায় নিরুপায় হয়ে ওরা এ কাজটা করেছে। এই নিন আটআনা পয়সা।” হেড স্যার বলেন, “স্টিকার বিতরনের সাথে এবার হিসাব মিলেছে। আটআনা পয়সা ঘাটতি ছিল।” সুজনের বাবা হেসে বিদায় নিলেন। অথচ দুই ঈদ ছাড়া বাবাকে তারা কখনও এমন করে হাসতে দেখেনি।

একদিন সন্ধ্যা বেলা ব্যারাকের মধ্য দিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিল সুজন। পিছন থেকে ছোট্ট একটি ঢিল এসে পড়ে। ফিছন ফিরে দেখে মিলি মিটিমিটি হাসছে। চোখাচোখি হতেই সে দৌড়ে বাসার ভিতর চলে যায়। কাগজে মোড়ান ঢিলটা সে তুলে নেয়। হাতে আঁকা ফুলের ছবি, নিচে ছোট্ট করে লেখা ‘তোমাকে ভালবাসি’।

দারুণ একটা ভালোলাগা নিয়ে সেদিন বাসায় ফেরে সুজন। পড়ার টেবিলে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজটা পড়ে- তোমাকে ভালবাসি। একবার দুবার বারবার পড়ে। এরপর গাড়ির চাকা দ্রুত ঘুরতে থাকে। চকলেট- আতরের শিশি- রুমাল আদান প্রদান হতে থাকে। চিঠি আদানপ্রদানে কবুতরও এসে জোটে। দু’জনের মনের ভিতর তখন বাকবাকম ডাক —

অকস্মাৎ মিলির ইমিডিয়েট বড় বোন মারা যায়। ওদের বাড়িতে তখন শোকের ছায়া নেমে আসে। একদিন মিলি এসে খবর দেয় তার মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। কিছুতেই প্রবোধ মানছে না। একদম ভেঙ্গে পড়েছে। বাবা চাইছে সবাই মিলে কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি যেতে। মায়ের মনটা যদি একটু পরিবর্তন হয়। সুজন ও তাতে সায় দেয়।

বেশ কিছুদিন পর মজিবর সাহেবের পরিবার পলাশীতে ফিরে আসে। একমাত্র মিলি আসেনি। সুজনের মন বড্ড আঁকুপাঁকু করে। ব্যাপারটা কী? কয়েক দিন ধরে কানাঘুষা চলে। এরপর চাউর হয়ে যায়, দুলাভাই এর সাথে মিলির বিয়ে হয়ে গেছে।-লেখকঃ একজন সমাজকর্মী।

৮ জুলাই, ২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, ঢাকা