চারপাশে সারাক্ষণ অদেখা ভাইরাস দেখুন

2

ফারজানা রূপাঃকরোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮০৫। ‘ওয়ার্ল্ডোমিটার’ বা বিশ্বমাপকে এই সংখ্যা জ্বল জ্বল করছে যখন লেখাটির শুরু। সামনে ছুটি না বাড়ানোর ঘোষণা। ট্রেন, বাস, লঞ্চ নিয়ম মেনে চলাচলে সম্মতির খবর। অর্থাৎ, জীবন আবার গতি পেতে যাচ্ছে। তবে, অফিস খুললে বা বাস চললেই কিছু কি আগের মতো হবে?

হ্যান্ডশ্যাকের বদলে লেগ শ্যাক, বা কনুইয়ে কনুই ঘষা— শুরুর দিকে হাস্যরসের বিষয়টি যে জীবনের অংশ হয়ে যাবে, আর চাইলেও যে সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে মাকেও দশবার ভাবতে হবে আপদ বালাইয়ের কথা, তেমন ভাবনা কারো মাথাতেই বোধকরি ছিল না। এজন্যই যতো দিন গড়াচ্ছে ততো পরিবর্তনে অভ্যস্ত হওয়ার বদলে বাড়ছে হা-হুতাশ, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। স্পর্শপ্রিয় মানুষ অসুস্থ প্রিয়জনের কপালে হাত রেখে ‘কেমন আছো’ জানতে চাইতে না পারার হাহাকার কেমন করে সইবে? কিন্তু, শুরুর লকডাউন সারা বিশ্বে যখন আন লক হতে শুরু হয়েছে, তখন সামনে এসেছে ‘নিউ নরমাল লাইফ’ বা নতুন স্বাভাবিক জীবনের তত্ত্ব।

ভালো লাগুক বা নাই লাগুক— নতুন নিয়মেই যে খেলতে হবে জীবনের খেলা তা-ও পরিষ্কার। যদি না সব কিছুকে উড়িয়ে কেউ নিজের জীবন আগের মতো নিয়মে যাপনের তুড়ি বাজান। সেখানেও চর্চাটা খুব সহজ হওয়ার নয়। কারণ, হিসাবেটা হচ্ছে— এটা ব্যক্তিগত খেয়ালে ধূমপানের মতো অভ্যাসে জড়ানো নয়। কারণ, কিছু ইচ্ছা আপনার একার জন্য ঝুঁকির, আর সংক্রামক ভাইরাসের ক্ষেত্র ব্যক্তিগত খেয়ালের বৃত্তে স্বজন, কাছের মানুষ, বিশেষ করে কাছে থাকা সবচেয়ে ভঙ্গুর, দুর্বল, বৃদ্ধ, শিশু সদস্যটি। তাই নিউ নরমাল লাইফে নতুন নিয়মে খেলতেই হচ্ছে আমার মতো ছাপোষা মানুষদের। সেই নিয়মটাই বা কেমন, কি কি বদল আসছে আমাদের জীবনে?

গাড়ির চাবি, মোবাইল নিয়ে, বা দুই চাকার বাইসাইকেল বা দুটি পা সম্বল করেই বাইরে ছুটে বেরুনোর দিন আপাতত বিদায়। যখন খুশি ভিসা লাগিয়ে বিদেশে উড়াল, চায়ের কাপ হাতে টিএসসিতে উড়াধুরা আড্ডায় অসতর্ক হওয়ার মূল্য বহন করার সক্ষমতা কজনারইবা আছে? একটু প্রস্তুতি নিতেই হবে।

যারা ২৫ মার্চের পর থেকে সকল প্রয়োজন ঘরে থেকে মিটিয়েছেন, খুব একটা বাইরের দুনিয়ার চিত্র জানা নেই, তাদের জন্য পয়লা জুন ধাক্কা হতে পারে কিন্তু। সকালে আগের প্রস্তুতির সাথে যা যা যোগ করতে হবে আপনাকে: মনে রাখবেন, আপনি এবং আপনার পাশের টেবিলের সহকর্মী, দুজনেই যদি যথাযথভাবে মাস্ক পরেন, তবে সংক্রমণের ঝুঁকি নেমে যাবে ৫০ শতাংশের নিচে। যথাযথ বলতে, সার্জিক্যাল মাস্ক ( হালকা নীল রংয়ের, যা এতোদিন শুধু ডাক্তাররাই পরতেন) যদি পরেন, তবে কানের লতিতে ফিতা জড়ানোটা না পরে, টেনে পেছনে বাঁধা যায়, শক্ত করে তেমনটা পরবেন। আর যদি মনে হয়, আপনি যে জায়গায় যাচ্ছেন, সেখানে কেউ ভাইরাস আক্রান্ত কি না আপনার জানা নেই, বা যে কেউ যে কোনো সময় আপনার গায়ের উপর হাঁচি, কাশি দেওয়ার মতো হতে পারে পরিবেশ, তবে একটু ভারী মাস্ক পরুন। ওষুধের দোকানে গেলে তেমন মাস্কের খবর মিলবে। কথা বলার সময় পরস্পরের মুখ থেকে অদেখা যেসব পানির বিন্দু বাতাসে ছড়ায় এই মাস্ক তা থেকে আপনাকে রক্ষা করবে তিন ফুট পর্যন্ত। আর কেউ যদি হাঁচি-কাশি দেন তবে ছয়ফুট দূরে থেকে আপনার নিজেকে ভাইরাসের আওতা থেকে রক্ষা করতে হবে।

কখনও হাত দিয়ে বাইরে থাকা অবস্থায় হাত না ধুয়ে বা স্যানিটাইজার না মেখে মাস্কে হাত দিবেন না। ফেসশিল্ড, এটাকেই এখন আপনার ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসাবে মানতে হচ্ছে। কারণ, এই শিল্ড আপনার মুখ ও মাস্ককেও বাড়তি আবরণ দিচ্ছে। যতোদিন দাগ পরে নষ্ট না হয়, ততোদিন এই শিল্ড ব্যবহার করা যায়। প্রতিবার খুলে স্যানিটাইজার দিয়ে মুছে, ঝুলিয়ে রাখবেন। মূলত, রক্ষা করতে হবে আপনার মুখটি। নাক, চোখ, মুখ। এর ত্রিসীমানায় হাত নেওয়া একেবারে বারণ।

অপ্রয়োজনে হাত দিয়ে কিছু ধরবেন না। ঘড়ি বা গয়নাগাঁটি, পারলে ভ্যানিটি ব্যাগের মতো বাহুল্য জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। পাতলা ব্যাগ রাখুন, কাগজের ব্যাগ হতে পারে। তাতে ভাঙতি টাকা গুছিয়ে রাখুন। অফিস-বাড়ি-বাজার যাতায়াতে রিকশা ভাড়ায় যে নোট ভাড়া দিতে লাগে, সেভাবে নোট গুছিয়ে রাখুন। আপনি দিবেন, কারো কাছ থেকে কিছু নিবেন না, যেনো খুচরা টাকার বিপদ আপনার পর্যন্ত না আসে। একান্ত প্রয়জনে ফিরতি টাকা নিতে আলাদা একটা প্যাকেট রাখুন। সেটা ফেরত দাতার সামনে ধরুন, যেনো তিনি তার ভেতর ওপর থেকে টাকাটা ছেড়ে দিতে পারেন। মনে রাখবেন, ভাইরাসের নিজের চলাচলের ক্ষমতা নেই। আপনি তাকে বহন করে বাজার, হাট, শপিং ব্যাগ, রসালো তরমুজ, ব্র্যান্ডের বাহারি ব্যাগ— এমন নানা মারফত ঘর পর্যন্ত টেনে আনছেন।

করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার সহজ একটি বটিকা; চারপাশে সারাক্ষণ অদেখা ভাইরাস দেখুন, মনে করবেন সবাই ভাইরাস আক্রান্ত। আপনা থেকেই আসবে সাবধানতা।

লেখক: সাংবাদিক, একাত্তর( সূত্র: সমকাল)