চল ভেসে যাইঃ

41

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ ‘৭১ এর পহেলা মার্চ। তখনো সূর্য তাতিয়ে উঠেনি। সকাল সকাল নাস্তা খেয়ে বন্ধুদের সাথে স্টেডিয়ামের পথে রওনা হয় সুজন। মায়ের দেয়া রুটি- ডিম দু’পকেটে ভরেছে। পরনের প্যান্ট টাইট লাগছে। জোরকদমে এগিয়ে চলে।

পাকিস্তান একাদশ বনাম কমনওয়েলথ একাদশ’র খেলা। বাঙ্গালির গর্ব- ঢাকার ছেলে রকিবুল হাসান আজ টেস্ট ক্রিকেট খেলবে। বাঙ্গালির জাতীয় বোধ তখন জমে ক্ষীর হয়ে আছে। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ঢাকা স্টেডিয়ামের দিকে।

সূর্যের উত্তাপের সাথে পাল্লা দিয়ে দর্শক সমাগমও বাড়ছে। মাঠ কানায় কানায় ভর্তি। এমন সময় খবর আসে ইয়াহিয়া খান পার্লামেন্ট অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ যেন আগুনে ঘৃতাহুতি। গ্যালারি হতে শ্লোগানের আওয়াজ শোনা যায়। জয় বাংলা! জ্বাল জ্বাল আগুন জ্বাল! উত্তেজিত জনতা গ্যালারির চেয়ার ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। হুইসেল বাজিয়ে মাঠের মধ্যে পুলিশ ঢুকে পড়ে। পুলিশকে লক্ষ করে দর্শক- জনতা পানির বোতল, চেয়ার ছুড়ে মারতে থাকে। হাজার হাজার মানুষ স্টেডিয়াম থেকে মিছিল করে বেরিয়ে যেতে থাকে। খেলা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

সুজন মিছিলের সাথে মিশে যায়। সে এক অগ্নিঝরা দিন। মায়ের দেয়া ডিম- রুটি পকেটের মধ্যে কখন যে দলামলা হয়ে গেছে, সে তা বুঝতেই পারেনি। “যে নিমাই একবার ঘর থেকে বের হয়, সে নিমাই আর ঘরে ফিরেনা।” পলাশীর ব্যারাকে ফিরে সে বন্ধুদেরকে সংগঠিত করে। কদিন হলো ক্রিকেটের ব্যাট- প্যাড খাটের নিচে অবহেলায়, অনাদরে পড়ে আছে। ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

ব্যারাকের পড়শিরা জলিল সাহেবকে বলে ভাই সাহেব ছেলেকে সামলান। ছেলের জন্য আমরা যেন বিপদে না পড়ি। দেশের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছেনা। পশ্চিমারা কি এতো সহজে ছেড়ে দেবে? কখন যে কী হয়। প্রতি দিনই দুএকটা পরিবার পলাশী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শংকা-ভয় চারিদিকে। ঝড়ের পূর্বাভাস।

২৫ মার্চের ভয়াল কালো রাত্রি। কামানের গোলার আওয়াজ, আগুনের লেলিহান শিখা পলাশী থেকে দেখা যাচ্ছিল। গোলাগুলির আওয়াজ শুনে সুজনরা পরিবারের সবাই এক ঘরে জড়সড় হয়ে বসে আছে। ওর মা পোটলাপুটলী বাধে, বাবা সারা রাত ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন। সন্ধ্যা রাতে সুজন এবং তার বন্ধুরা মিলে রাস্তার উপর গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়েছে। সুজনের বিশ্বাস মিলিটারি এতো সহজে পলাশীতে ঢুকতে পারবেনা।
সূর্যোদয়ের আগে চুপিসারে জলিল সাহেবের পরিবার পলাশীর ব্যারাক ছেড়ে চলে যায়।

স্বাধীনতাত্তোর কালে সুজন তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। দেয়ালের ভাষা তাকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করে। “আমরা লড়ছি শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে।” ক্লাসের ফাঁকে সুযোগ পেলেই সে মিছিল মিটিং- এ অংশ নেয়। ঝাঁকড়া চুলে বাবরী দুলিয়ে যে হাতে একদিন আগুনের গোলার মত বল ছুড়ত। সে হাত এখন মুষ্ঠিবদ্ধ — প্রকম্পিত রাজপথ ঝাঁঝালো মিছিলে।

মিলি প্রশ্ন করে “এতো মিছিল মিটিং করে কী সুখ তুমি পাও? আমাকে যদি সত্যিকারের ভালোবাস তবে মিটিং মিছিল ছাড়তে হবে।”
সুজন নিভৃতে বসে ভাবে, মিলি! বড্ড পাগলি মেয়ে।

‘মিলির সাথে দেখা হলে বলে দেব
পোষাক পালটিয়ে এসো দেখা হবে মিছিলে।’

মিলি আবারও প্রশ্ন করে তোমার আমার– কূলকিনারা কবে হবে?
মোহনের ভাষায় —

‘সোনার নূপুর একটু সবুর আর কয়টা দিন বাকি
সমাজতন্ত্র হবেই হবে সেই আশাতেই থাকি।।’

মিলির অন্যত্র বিয়ের সংবাদ পেয়ে সুজন দারুণ ভাবে মুষড়ে পড়ে। ঘুঘুর বাসা থেকে বাচ্চা-ছা পেড়ে আনলে ঘুঘু যেমন শোকে কাতর হয়ে মগডালে বসে ঝিমায়। সুজন তেমনি নেশার ঘোরে ঝিমাতে থাকে। সোনারিল, সোনালজিন, ম্যানড্রেক্স– হয়ে দাঁড়ায় তার জীবন সাথি। নেশায় চুর হয়ে পড়ে থাকে। দিনের পর দিন ক্লাসে যায়না – প্রাক্টিক্যাল করেনা। এসএসসি-তে ফার্স্ট ডিভিশন ২/৩ সাবজেক্টে লেটারস মার্কস নিয়ে পাশ করা ছেলে, আইএসসি-তে এসে থার্ড ডিভিশন পায়।

মিলির অন্যত্র বিয়ে হওয়াতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় সুজনের মা। সুজনের মা মিলির মা পরস্পর বান্ধবী। সময় পেলেই দুজন গল্প করে, পান খায়। অথচ সে চায়নি তার ছেলে পাশের বাসায় তার বান্ধবীর মেয়ের সাথে প্রেম করুক। তিনি ডুব দিবেন তবে চুল ভিজাবেন না।

সুজনদের দু’তিন বাসা পরে স্মৃতিদের বাসা। সুজন স্মৃতি ওরা পাশাপাশি এক সাথে বড় হয়েছে। তুই তুই সম্পর্ক। দুজন দুজনের ভাল বন্ধু। মিলি- সুজনের সম্পর্কের মিডলম্যানও ছিল স্মৃতি। সে খুব ভাল গান গায়। দারুণ রবীন্দ্র ভক্ত ।

স্মৃতি কথা প্রসঙ্গে একদিন সুজনকে বলে, দেখ সুজন! এভাবে জীবনটাকে নষ্ট করে কী লাভ? নিজেকে কষ্ট দেয়ার কোন মানেই হয়না।
রাখ তো স্মৃতি তোর ওসব কথা। আমার এখন ভালো লাগছেনা। পারলে একটি গান শোনা।
গাইতে পারি এক শর্তে, তোকেও একটা গাইতে হবে
সুজন – সত্যি আমার গান শুনবি? শোন —

“আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম
এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না-রে এই জ্বালা আর প্রাণে সহেনা
বলেছিলি তুই যে আমায়, আমি নাকি ভুলে যাব
ভুলে আমি ঠিকিতো যেতাম।
পোড়ামন তোরি কথা বারে বারে বেজে ওঠে (২)
তাই তোকে আর ভোলা হলো না রে /তাই তোকে আর ভোলা হলোনা।।”

জানিস স্মৃতি, চৈত্রের খরায় পুকুরের কাদা মাটির মত অন্তরটা আমার ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনা। তাইতো আমি নেশা করে ভুলে থাকার চেষ্টা করি। সারা রাত আমার ঘুম আসেনা।

ইদানীং স্মৃতিদের বাসায় সুজনের যাতায়াত আগের চেয়ে বেড়ে যায়। স্মৃতির মা সুজনের ঘটনা শুনেছে স্মৃতির কাছে। “কী ভালো ছেলে ছিল। কী দিয়ে যে কী হয়ে গেল। দুঃখ লাগে।” স্মৃতি রবীন্দ্র সংগীত গায়। সুজন ধ্যানমগ্ন হয়ে শোনে। আবেগে কখনও কখনও সে কণ্ঠ মিলায়– ‘তোমরা যে বল ভালোবাসা ভালোবাসা, সখি ভালবাসা কারে কয়। সে যে কেবলি যাতনা ময়।’

একদিন বিকেলে সুজন স্মৃতিদের বাসার সামনে দিয়ে ফিরছিল। স্মৃতি তার হাতে এক খানা গীতবিতান ধরিয়ে দিয়ে বলে “দেখিস বই এর একটি পাতা মোড়ান আছে। সময় করে দেখিস।” সুজন বাড়িতে এসে গভীর আগ্রহ নিয়ে বই এর পাতা উল্টায়। ‘অনেক কথা যাওযে বলে কোন কথা না বলে/ তোমার ভাষা বোঝার আশায় দিয়েছি জলাঞ্জলি।’ স্মৃতির এই রসিকতা সুজনকে নাড়া দেয়।

সুজন লিখে পাঠায় ‘যদি জানতেম আমার কিসের ব্যাথা তোমায় জানাতাম।’ সে বুঝতে পারে টানেলের ওপারে মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে। পানির অভাবে টবে থাকা ফুল গাছ যেমন নুয়ে পড়ে–ঝিমিয়ে যায়। পানি দিলে আস্তে আস্তে আবারো তা সতেজ হয়ে ওঠে। সুজনও বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায়।

স্মৃতির আজানু লম্বা চুল সুজনকে দারুণ ভাবে মোহাবিষ্ট করে। স্মৃতি বলে সুজন! তুই যখন মৃতসঞ্জীবনী সুধা পান করে রাস্তা দিয়ে যাস– গন্ধ মৌ মৌ করে। মৃতসঞ্জীবনী আমার খুব ভালোলাগে।

মহল্লায় দুলাল নামে সুজনের এক বন্ধু ছিল। সে খুব ভালো বাঁশী বাজাতে পারতো। বিশেষ করে তার ভাওয়াইয়া- পল্লীগীতির সুর ছিল মন কাড়া। চাঁদনি রাতে মাঠে আসর বসে বাঁশী বাজে — সুজন বলে, ঐ গানটা বাজা ‘কুঁচ বরণ কন্যারে তার মেঘ বরণ কেশ /ঐনা কন্যার রূপের ছটায় পাগল হইল দেশ।’ স্মৃতি কান খাড়া রাখে- বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।

একদিনের কথা মনে হলে সুজন এখনো একাএকাই হাসে। সেটা ছিল মিলি-সুজন’র আমল। মিলি- সুজন স্মৃতিদের বাসায় আসে। ড্রইং রুমে বসে গল্প করছিল। এমন সময় স্মৃতির মা ড্রইং রুমে এসে ঢোকেন। দুজনই উঠে দাঁড়ায়। কী বলবে ভেবে পায়না। সুজন আমতা আমতা করে বলে, ‘খালাম্মা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ খালাম্মা এমন দোয়াই করলেন, তাঁর মেয়েই এখন আমার ঘাড়ে এসে চাপছে।

সুজন- ‘চল ভেসে যাই প্রেম সাগরে নাও ভাসায়ে দুজনে—‘
-লেখকঃ একজন সমাজকর্মী।
১০ জুলাই,২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, ঢাকা