ঘূর্ণিঝড় আম্পানে পিরোজপুরে ৩ জন নিহত: মৎস্য ঘের ও ফসলের ক্ষতি

8

হাসান মামুন,পিরোজপুরঃ সুপার সাইক্লোন আম্পানের প্রভাবে ৩ জন নিহত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের পিরোজপুরে সাত হাজার মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় পৌনে ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলার সাতটি উপজেলার অধিকাংশ মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়ে পানি। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কাঁচাপাকা ২৫ কিলোমিটার রাস্তা। কাঁচাপাকা মিলিয়ে ২ হাজার ৩৪৫ টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলার মঠবাড়িয়ায় ২ জন ও ইন্দুরকানীতে ১ জন নিহত হয়েছে। নিহতরা হলেন মঠবাড়িয়ায় দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের মৃত মজিদ মোল্লার ছেলে শাহজাহান মোল্লা (৫৫), একই উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের দুপাদী গ্রামের মৃত মুজাহার আলীর স্ত্রী গলেনুর বেগম (৭০)। এবং জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার উমিতপুর গ্রামে মৃত মতিউর রহমানের ছেলে শাহ আলম (৫৫)।
মঠবাড়িয়ায় ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে বৃষ্টিতে ভিজে নরম হওয়া দেয়ালে চাপা পড়ে বুধবার রাতে শাহজাহান মোল্লা নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি মঠবাড়িয়া সরকারি কলেজের পিছনে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। বুধবার রাতে ঝড়ের মধ্যে তিনি বাসায় যাওয়ার পথে দেয়াল ভেঙ্গে তার ওপর পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের দুপাদী গ্রামের মৃত মুজাহার আলীর স্ত্রী গলেনুর বেগম পানিতে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। বুধবার রাতে উপজেলা বিভিন্ন স্থানে পানিতে তলিয়ে গেলে উঁচু স্থানে যাওয়া জন্য গলেনুর বেগম রওনা দিলে পানির স্রোতে পড়ে গিয়ে সেখানেই তিনি মারা যান। অন্যদিকে জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার উমিতপুর গ্রামে মৃত মতিউর রহমানের ছেলে শাহ আলম ঘূর্ণিঝড়ের আম্পানের প্রভাবে জোয়ারের পানির স্রোত দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বুধবার রাতে তিনি তার ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার ঘরের খাটের চারপাশে পানিতে তলিয়ে যায়। এ ঘটনা দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে এবং জোয়ারের অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার মৎস্য ঘের, ধান ও শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মৎস্য ও কৃষির। জেলা মৎস্য অফিস ও কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগ ক্ষয়ক্ষতি হিসার নিরƒপন করা শরু করেছে। পিরোজপুরে বুধবার রাত থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
সুপার সাইক্লোন আম্পানের কারণে পিরোজপুরে বেশী ক্ষতি হয়েছে মৎস্য ক্ষেত্রের। নদ-নদীর পানির বৃদ্ধি পাওয়ার বিভিন্ন এলাকার মৎস্য ঘের ও পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলায় ঘূর্ণিঝড়ে নিহত তিন ব্যাক্তির পরিবারকে নগদ টাকা ও খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল বারী জানান, সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব ও জোয়ারে পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬ হাজার ৭৫৫ টি মাছের ঘের ও পুকুর পালিতে তলিয়ে গেছে। এতে ৫ হাজার ৫৭৫ জন মৎস্য চাষী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে পিরোজপুরে মৎস্য খাতে ৩৭৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার সদর উপজেলার ৬৫টি, নাজিরপুরে ৪ হাজার ৪৫০টি, মঠবাড়িয়ার ২৩৫টি, কাউখালীতে ২৮০টি, ভান্ডারিয়ায় ৩৫০টি, ইন্দুরকানী ৫২৫টি, নেছারাবাদ উপজেলায় ৭৫টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু হেনা মো. জাফর জানান, জেলায় ৩৫৭ হেক্টর জমির বোরো ধান মাঠে রয়েছে। আম্পানের প্রভাবে পানি বৃদ্ধির কারণে এ ধানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি, কলা, পান, পেঁপে, মুগ ডাল, চিনাবাদাম, মরিচের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির হিসেব নিরƒপণ করা হচ্ছে।
বলেশ্বর নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মঠবাড়িয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মাঝেরচরে পানি ঢুকে পড়ায় সেখানকার কিছু কাঁচা ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং খেটে খাওয়া দেড় হাজার মানুষ বিভিনśভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পিরোজপুরের আকাশে রোদ দেখা দেওয়ায় গ্রামের মানুষজনের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা লোকজন বাড়িতে ফিরে গেছেন।
পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন আরও জানান, সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে জেলার সর্বশেষ সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরƒপনে তিনি কাজ শুরু করেছেন। উপজেলা পর্যায় গঠিত ৫১টি মেডিকেল টিম আম্পান দুর্যোগ পরবর্তী মানুষদের প্রাথমিক চিকিৎসায় কাজ শুরু করেছেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন নিহত শাজাহান মোল্লার পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়ের সময় আতংক মারা যাওয়া গোলেনুর বেগম ও শাহ আলম নামের দুজনের পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকার পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে ঘর ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ জনকে দুই বান্ডিল করে ঢেউটিন ও ছয় হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। ২০ হাজার পানিবন্দ্রী মানুকে ১০ কেজি করে চালসহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে।