ঘুমের দেশে ঘুমিয়ে আছো, শান্তিমাখা ঘুম! জন্মদাতা বাবা আমার, লক্ষ কোটি চুম!!

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ বাইশটি বছর! একটি দুটি নয়, গুণে গুণে বাইশটি বছর! একেবারে কম সময় হয়ত নয়! তবুও কেন জানি না, আমার কাছে মোটেই তেমন মনে হয় না! বছর তো ভালো, বাইশটি দিনও মনে হয় না! মনে হয় এই তো সেদিন; সবকিছু এলোমেলো করে, কাউকে কিছু না বলে, কোন সময় না দিয়ে, বাবা আমার চলে গেলেন! দূর অচীনপুরে চলে গেলেন! অনেকটা অকালেই চির জীবনের জন্যে চলে গেলেন!!
বাবা! আমার জন্মদাতা বাবা!! তবে কখনো তাঁকে বাবা বলে ডাকিনি; আব্বুও বলিনি। ডাকতাম আব্বা বলে। মাকে মা ডাকতাম, আম্মাও ডাকতাম। তবে মাকে তুমি করে সম্মোধন করলেও আব্বাকে আপনি বলতাম। জন্মলগ্ন থেকেই বলতাম। আমাদের সময়ে আশেপাশের সবাইকে দেখতাম বাবাকে আপনি করেই সম্মোধন করে। ভাবতাম এটাই বোধ হয় রেওয়াজ। পরবর্তীতে নিজে বাবা হয়ে রেওয়াজটা ভেঙে ফেললাম। সন্তানের সাথে দুরত্ব কমানোর জন্যে বিষয়টি জরুরী মনে করেছিলাম। অবশ্য এই জমানায় কেবল আমি নই, “আপনি” শোনার রেওয়াজ সব বাবারাই ভাঙছে। হয়ত সবাই বিষয়টিকে জরুরী মনে করছে।
জরুরী বিষয়কে জরুরী মনে করাও জরুরী। আমার আব্বার চিকিৎসাটাও খুব জরুরী ছিল। তবে তেমনভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি আমরা। হার্টের চিকিৎসা ঢাকাতে তেমনভাবে তখনও শুরু হয়নি। হয়ত দেশী বিদেশী সামান্য কিছু ঔষধ ছিল। কিন্তু ইসিজি মেশিন আর পালস্ মনিটর ছাড়া আর তেমন কোন কিছুই ছিলনা। আব্বা ছিলেন হার্টের রোগী। সাথে ডায়বেটিসও ছিল। তাই কাবু হয়েছিলেন বেশী। হাঁটতে কিংবা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে কষ্ট হতো। বেশী সমস্যা ছিল বুকে। ভারী হয়ে থাকতো বুক; ব্যথা করতো। বুকে ব্যথা করলেই জিহ্বার নীচে ‘এনজিস্ট’ স্প্রে করতাম। এতে তৎক্ষনাৎ ব্যথা কমতো, তবে রোগের মাত্রা কমতো না।
আব্বা প্রথম রোগে পড়েন অর্থাৎ স্ট্রোক করে ১৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৭ সালে। রিটায়ারমেন্টে যাবার ঠিক দশদিন আগে। চল্লিশ বছরের সরকারী চাকুরী জীবনে শেষবারের মত অডিট অফিসার হিসেবে সেদিন গাজীপুর ট্রেজারীতে গিয়েছিলেন। মনে হয় এই কষ্টটাই সহ্য করতে পারেন নাই। একেবারে সিনেমার মত। কষ্ট পেলেন, আর বুক চেপে ধরলেন। বুকের বাম পাশে চিন চিন ব্যথা। সেই ব্যথা নিয়ে সেই যে বাসায় এসে বিছানায় পড়লেন আর তেমনভাবে পুরোপুরি সুস্থ্য হলেন না। আর কোনদিন অফিসের চেয়ারটায়ও বসতে পারলেন না!তবে তাঁর কষ্টের বড় কারন ছিলাম আমরা; আমাদের সংসার। রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে এল, কিন্তু সংসারের কিনারা তখনো হলো না। তখনো কেউ হাল ধরার মত পাশে নেই। অথচ সংসারে আমরা তিন সন্তান আব্বার উপরেই আছি। আমাদের পড়াশুনা শেষ হতে তখনো বাকী। এমনি অবস্থায় তিনি অবসরে গেলে কিভাবে সংসার চলবে, কিভাবে আমরা পড়াশুনা করবো, এই চিন্তায় মনে খুব টেনশান ছিল। এভাবেই সংসারের ঘানি নামক টেনশানের কারনেই নিজের জীবনটাকেও শেষ পর্যন্ত কিভাবে শেষ করে দিলেন, তা হয়ত তিনি নিজেও টের পাননি!
আসলে কোন বাবারাই কখনো টের পান না। আমার বাবাও পাননি। সবার সুখের ব্যবস্থা করতে করতে নিজেই অসুখে পড়লেন। কিন্তু নিজের অসুখটাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বড় করে দেখেননি; বরং লুকিয়েছেন। বুকে ব্যথা হলে বাম হাত দিয়ে হালকা করে চেপে ধরে মুখে হাসি হাসি ভাব রাখতেন। নিজে গোপনে সব কষ্টই করেছেন যাতে করে তাঁর কষ্টটা আমাদের কষ্টের কারণ না হয়। জীবনভর চেষ্টা করেছেন আমাদেরকে সবকিছুতেই ভাল রাখতে। খাওয়া দাওয়া, চলাফেরা কিংবা পোষাক পরিচ্ছদে।
একটা  সময় পর্যন্ত পোষাকে কিংবা চলাফেরায় আব্বাও খুবই স্মার্ট ছিলেন। বিয়ের আগে কিংবা তার সংসার যখন ছোট ছিল তখন বাবা আমার অনেক সুখ ভোগ করেছেন। কিন্তু আমরাও বড় হওয়া শুরু করলাম, সংসারও বড় হতে লাগলো, আর আব্বাও সুখ ভোগ ছাড়তে লাগলেন। সব সময় স্যুট-টাই পড়া মানুষটি দুটো পায়জামা পাঞ্জাবী ছাড়া আর কিছুই রাখলেন না। ঘুরে ফিরে ধুয়ে পরিষ্কার করে এই দিয়েই চালাতেন। পুরানো হলেও চালিয়ে নিতেন। আব্বাকে নতুন লুঙ্গী  কখনোই পড়তে দেখিনি। আমাদেরকে নতুনটা কিনে দিয়ে আমাদেরই পুরানোটা পড়তেন। যেন এটাই পার্থিব রীতি। সবচেয়ে হিসেব করতেন একা একা বাইরে কিছু খাবার সময়। কী সকাল, কী দূপুর! ক্ষুধা সামলাতেন রেস্টুরেন্টে বসে টাকায় চার খানা পুড়ি খেয়ে। সবচেয়ে ছোট পুড়ি। সাথে এককাপ চা। খুব মজা করেই খেতেন। খাওয়া দাওয়া আব্বার খুব প্রিয় ছিল। অনেক কিছুই খেতে মন চাইতো নিশ্চয়ই। কিন্তু খেতেন না। খেতে পারতেন না। মাথায় যাঁর বড় সংসারের ঘানি, অনেক কিছুই খেতে পারেন না তিনি!
আব্বার প্রথম জীবনটা এমন  ছিল না। সংসারের ঘানি টানার জীবন ছিল না। ব্রিটিশ আমলে দাদা এবং আব্বা দুজনেই সরকারী চাকুরী করতেন কোলকাতায়। অথচ সংসারে দাদু আর চাচাসহ মোটে চারজন মানুষ। দুজনের সরকারী আয়ে ৪ জনের সংসার। খুবই স্বচ্ছল ছিলেন। আয় বেশী, খরচ কম। আয়ের বড় অংশই থেকে যেত। আর তাই সংসার জীবনের শুরুতেই (আমার জন্মের আগেই) ঢাকা এবং এর আশে পাশে বেশ কিছু সম্পদ করতে পেরেছিলেন। যা পরবর্তীতে অনেক মূল্যবান সম্পত্তিতে পরিনত হয়েছে এবং আমাদের পরিবারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। পরবর্তীতে সংসারের টানাপোড়ানোর সময় নিজে কষ্ট করলেও সেসব সম্পদে আব্বা হাত দেননি কোনদিন। সব সম্পদ রেখে দিয়েছেন এই আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই।  আমাদের সুখের জন্যই।
আজ অকৃতজ্ঞের মত সেই সব সম্পদ আমরা খুবই স্বচ্ছলতার সাথে মহা আনন্দে ভোগ করছি। অথচ এই আমাদেরই কেউ কেউ সেই সম্পদ থেকে বাবার জন্যে সামান্য খরচ করতেও মহা কৃপণ। বাবার বিদেহী আত্মার শান্তির জন্যে দুটো টাকা ব্যয় করতেও আমাদের কলিজায় বাঁধে। কত নিষ্ঠুর আর নির্মমতা এই পৃথিবীর বুকে! আর কত বিশ্রী রকমের খারাপ আমরা এই সন্তানেরা। বাবার মৃত্যুর দিনটাও মনে রাখতে পারি না। অথচ এদের জন্যেই বাবাদের জনমভর আত্মত্যাগ। জানিনা বাবাদের কী লাভ এমন সন্তান জন্ম দিয়ে; তাদের জন্যে পুরো জীবনটাকে স্যাক্রিফাইজ করে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার!
হৃদরোগে পর্যুদস্তু আমার বাবা চতুর্থবারের স্ট্রোকে আর টিকতে পারেননি। চিরবিদায় নেন! সময়টা ২১ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫। আমার বড় কষ্ট আমি পাশে থাকতে পারিনি। আর সবচেয়ে বড় কষ্ট আব্বার জন্যে এই জীবনে আমি কিছুই করতে পরিনি। কেবল তার কাছ থেকে নিয়েছি, দিতে পারিনি কিছুই। আমার কর্মজীবন শুরু হবার আগেই আব্বা ইন্তেকাল করেন। আজকে আমার শোনিমকে পাশে বসিয়ে খাওয়ার সময় আব্বার কথা খুব মনে হয়। প্রতিবার মনে হয়। মনে হয়, পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে আমার দুটো বাবা খাবার খাচ্ছেন। মুখ চুক চুক করে ঠোঁট নাড়িয়ে নাড়িয়ে খুব মজা করে খাচ্ছেন!
আমি জানি, এভাবে দাদাভাইকে পাশে বসিয়ে শোনিমের কোনদিনই খাওয়া হবে না! আর আমারও সেই দৃশ্য দেখা হবে না। সবই আমার কষ্টমাখা স্বপ্নের ঘোর। শোনিমের জন্মের অনেক আগেই তার চির প্রস্থান হয়। তাই শোনিমকে দেখেননি আব্বা। কিন্তু সারাটিক্ষন শোনিমের চোখেমুখে আমি তাঁকে দেখি, আমার জন্মদাতা বাবাকে দেখি! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি! দেখাদেখির এই কাজটি হয়ত জীবনভর চলবে। যদিও জানি, সত্যি সত্যি তিনি নেই! অনন্ত অসীমের যাত্রায় তিনি অদৃশ্যমান। আসমান জমিনের কোথায়ও আর তাঁকে দেখতে পাবো না!! জনম জনমভর খুঁজলেও পাবো না!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা