ঘর পেতে দিতে হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকা

5

ডেস্ক রিপোর্ট : আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় সরকার গৃহহীনদের বিনামূল্যে ঘর দিলেও তা পেতে হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে সুনামগঞ্জের দরিদ্র মানুষদের। পরিবহন খরচ তো দিতেই হচ্ছে, সঙ্গে কিছু নির্মাণসামগ্রীর দামও নেওয়া হচ্ছে। মিস্ত্রির খরচও আদায় করা হচ্ছে অভাবী মানুষের কাছ থেকে। এভাবে প্রতিটি ঘরের জন্য তাদের ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। টাকা দিতে না পারায় অনেকেই ঘর বুঝে পাননি, কারও কারও ঘরের নির্মাণসামগ্রী অযত্নে ফেলে রেখেছেন সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা।

জেলার সদর, শাল্লা ও ধর্মপাশা উপজেলায় এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শাল্লার নারকিলা গ্রামের দুই গৃহহীন পরিবার পরিবহনের টাকা দিতে না পারায় তাদের ঘরের মালপত্র এখনও পথেই আটকা রয়েছে।

দিরাই-শাল্লায় পাঁচটি গ্রাম স্থানীয়ভাবে ‘চোরের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। এক সময় এই গ্রামগুলোর একাংশের বাসিন্দারা ভোটার তালিকায়ও পেশা ‘চৌর্যবৃত্তি’ উল্লেখ করতেন। সরকারের খাসজমি দখল করেই বহুকাল আগে এখানে বসতি গড়েছিলেন সেই চোরেরা। সম্প্রতি তাদের অনেকে মূলধারায় যুক্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ৩০টি ঘর পেয়েছেন চোরবস্তি নারকিলা গ্রামের গৃহহীনরা।

গ্রামের কবির মিয়া বললেন, ‘আমরা এখন চুরি ছারি দিসি ভাই, শেখ হাসিনায় আমরারে মায়া করছইন, তাইনরে যেন আল্লায় ভালা রাখইন, আমরা জানি শেখ হাসিনায় কইছইন ঘর পাইতে কেউ যেন এক টাকাও খরচ না করে, কিন্তু আমরার খরচ করা লাগছে।’ তিনি জানান, মালপত্র আনতে প্রত্যেকের কাছ থেকে পরিবহন খরচ বাবদ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কাঠমিস্ত্রিকে ১৫০০ টাকা, ২০ কেজি রডের দাম ১৬০০ টাকা, দলিলের জন্য প্রথম ১৩০০ টাকা এবং দলিল আনার সময় আরও ১১৭০ টাকা দিতে হয়েছে। কবির মিয়া জানান, তার ক’টা গরু ছিল, সেগুলো বিক্রি করে এই টাকার ব্যবস্থা করেছেন।

এই গ্রামের আলমগীর কবির, ইদু মিয়া ও ফিরোজ মিয়া একই কথা জানিয়ে বললেন, ‘ইউএনও সাব আর এলাইছ মেম্বারের কাছে আমরা ১৫ জন গেছলাম। আমরা কইছলাম আমরা গরিব মানুষ প্রধানমন্ত্রী দয়া কইরা ঘর দিছইন, আপনারাও একটু দয়া করঔকা। তারা ধমক দিয়া কইছইন টেকা না দিতে পারলে ঘর অন্যখানো দিলাইবা। আমরা পরে কষ্ট কইরা টেকার ব্যবস্থা করছি।’

ফিরোজ মিয়া জানান. ১০০০ টাকায় তিন মণ ধান দেওয়ার শর্তে একজনের কাছ থেকে টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। সব খরচ দিলেও শেষে দলিল আনতে ১১৭০ টাকা দিতে পারেননি বলে গ্রামের মঈনুদ্দিন, গণি মিয়া, আফাল উদ্দিন, কবির মিয়া এখনও জমির দলিল আনতে যাননি।

দরিদ্র গৃহহীনরা বললেন, গ্রামের জজ মিয়া একেবারেই দরিদ্র। তার ঘরের মালপত্র এখনও নদীর পাড়ে পড়ে আছে। কারণ তিনি পরিবহন খরচ দিতে পারেননি। গ্রামের আলামিনের ঘরেরও কিছু মাল এখনও পরিবহন খরচের জন্য আনতে পারেননি। গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান- মাল আনা, রড, স্টূ্ক্র কেনা এবং কাঠমিস্ত্রিকে দেওয়াসহ ১৬ হাজারের মতো টাকা লেগেছে তাদের। স্থানীয় ইউপি সদস্য এলাইছ মিয়া বলেছেন, টাকা খরচ করতে না পারলে ঘর অন্যদের দিয়ে দেবেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য এলাইছ মিয়ার কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বললেন, এর জবাব উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিতে পারবেন। এই গ্রামের গৃহনির্মাণ কাজ তদারককারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মামুনুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবহন বাবদ আমরা কোনো টাকা নিইনি। মালপত্র বাড়ির কাছে নদীরপাড়ে পৌঁছে দিয়ে বলা হয়েছে তারা যেন একটু কষ্ট করে নিজেরা নেন। কাঠমিস্ত্রির ৫০০০ টাকা আমরা দিয়েছি। তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে আমি দুই দিনের মধ্যে ফেরত দেব। পরিবহন খরচের টাকার জন্য বেশ কিছুদিন হলো জজ মিয়ার মাল নদীর পড়ে থাকার বিষয়টি সোমবারই আমি জেনেছি, কাল থেকে মালপত্র আমরাই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। আলামিনের ভিটেতে মাটি কাটা হচ্ছে, ওখানেও মালামাল পৌঁছে দেওয়া হবে। দলিলের জন্য কে বা কারা টাকা নিয়েছে আমি জানি না।’

শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর আহমদ বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় ঘরের মাল পৌঁছাতে খরচ বেশি হচ্ছে। এজন্য বলা হয়েছে, পারলে কষ্ট করে যেন তারা নিজেরাই মালপত্র নেয়। অন্য খরচের বিষয়ে তার জানা নেই।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা জানান, গৃহহীনদের জমির দলিল রেজিস্ট্রির টাকা তিনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের দিয়ে ব্যবস্থা করেছেন। নামজারি ও খতিয়ানের জন্য ১১৫০ টাকা তিনি তার অফিস থেকে ব্যবস্থা করেছেন। আশ্রয়হীনদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি।

এদিকে, ধর্মপাশায়ও অনেক এলাকায় আশ্রয়হীনদের দিতে হচ্ছে পরিবহন খরচ। এই উপজেলায় আশ্রয়হীনরাই নিজেদের ঘরের কাজে ব্যবহূত বালু সরবরাহ করেছেন। যারা প্রতিবাদী তারা বালুর টাকা পেয়েছেন। নিরীহরা এখনও টাকা পাননি।

ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান বলেন, গৃহহীনরা নিজেরা বালু সরবরাহ করলেও তাদের সবাইকে বালুর টাকা দেওয়া হয়েছে। উপজেলার ৩০০ ঘরের মাল পৌঁছে গেছে। কোথাও কোনো গৃহহীনকে পরিবহন খরচের টাকা দিতে হয়নি।

জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, কোথাও কেউ গৃহনির্মাণের জন্য পরিবহন খরচের টাকা নিতে পারবেন না। নিলে অপরাধ হবে।

জেলার ১১ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার ৩৯০৮ দরিদ্র পরিবার ঘর পাচ্ছে। প্রায় ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘরগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪০৭টি আশ্রয়হীন পরিবারের ঘরের কাজ শেষ হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব ঘরের চাবি ও দলিল বুঝিয়ে দিয়েছেন। এক লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে ২ শতক জমিতে দুটি বেডরুম, একটি রান্নাঘর, একটি বাথরুম এবং প্রতিঘরেই ছোট বারান্দা রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই নতুন ঘরগুলো অনেক গ্রামকে ইতোমধ্যে আলোকিত করেছে। প্রত্যেকটি ঘরে পল্লী বিদ্যুৎ বা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যুৎ লাইন থেকে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হচ্ছে। যেখানে বিদ্যুৎ দিতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।সমকাল