গণহত্যার ও মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী জবির গুচ্ছ ভাস্কর্য

অন্তু আহমেদ,জবি : জগন্নাথ বিশ্বদবিদ্যালয়ে (জবি) আছে দেশের একমাত্র ‘৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি’র ‘গুচ্ছ ভাস্কর্য’, যা নতুন প্রজন্মের কাছে সেই নারকীয় গণহত্যাকে তুলে ধরে চরম সত্য ও নিষ্ঠুরভাবে।

মুক্তিযুদ্ধের চারণভূমি তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ভেতরে সারিবদ্ধভাবে বাঙালিদের দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশের স্তূপ সাজিয়ে গণকবর দেওয়া হয়। সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মারক হিসেবে গণকবরের ওপর এ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।

ভাস্কর্যের প্রধান নির্মাতা ভাস্কর রাশার সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘১৯৮৮ সালে এ ভাস্কর্যের কাজ শুরু হয়, শেষ হয় ১৯৯১ সালে। ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়। ৩ বছরে কাজ শেষ হলেও এর উদ্বোধন হতে সময় নেয় ২০ বছর।’

ভাস্কর্যের তাৎপর্য নিয়ে ভাস্কর রাশা বলেন, এর মাধ্যমে গণমানুষের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর তৎকালীন প্রক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
ভাস্কর্যটি সামনে ও পেছনে দুটি অংশ ভাগ করা হয়েছে। এক পাশে একাত্তরের গণহত্যা, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ভাস্কর্যে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও বেদনার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৫ মার্চের কালো রাতকে। এ অংশে দেখানো হয়েছে এই রাতে ইয়াহিয়া খান মাতাল অবস্থায় আছেন। পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। গর্ভবতী মাকে অত্যাচার করে হত্যা করা হচ্ছে। লাশ ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। ভাস্কর্যের অংশ হিসেবে রয়েছে একটি পাতাশূন্য বৃক্ষ। এখানে সে সময়ের বাংলাদেশকে তুলে ধরা হয়েছে।

ভাস্কর্যটির অপর অংশে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা যার যা কিছু আছে এরই প্রতিফলন। তাই দা, বটি, খুন্তি, কোচ, বর্শা, সবকিছু নিয়ে যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন তারা। পরের অংশে সবাই আধুনিক অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। যুদ্ধে নামার পর যখন যোদ্ধারা বুঝতে পারেন- পুরনো পদ্ধতি দিয়ে তাদের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব নয়, তখন সবাই প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। যেখানে রয়েছেন সব বয়সী নারী-পুরুষ। পরিপূর্ণ যুদ্ধের জন্য গেরিলা কৌশল, মাঝারি আকারের অস্ত্রের ব্যবহার শিখছেন তারা। ভাস্কর্যের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন প্রশিক্ষণ নেওয়া সাহসী এক কৃষকের ছেলে। তার চোখে যুদ্ধজয়ের নেশা। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সবার চোখে প্রতিশোধ স্পৃহার ছাপ রয়েছে। ভাস্কর্যে সবার মাথা একটু সোজা, মুখ লাল বর্ণের। এর কারণ রাগ হলে কালো মানুষের চেহারাও লাল বর্ণ ধারণ করে। আবার অন্যদিকে গণহত্যার দৃশ্যের রঙ ধূসর, কারণ এটি আমাদের বেদনাদায়ক স্মৃতি।

ভাস্কর্যের নিচে রয়েছে পানি, এটি দিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশ বোঝানো হয়েছে। পানির ভেতরে রয়েছে বাংলা বর্ণমালা, এটি দিয়ে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সফলতায় বাংলার মানুষের মাঝে স্বাধীনতার ভাবনা আসা। বাংলার মাটি, মানুষ আর ভাষা একাকার হয়ে আছে এ ভাস্কর্যে।
বর্তমানে ভাস্কর্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শোভাবর্ধনের অদ্বিতীয় শিল্পকর্ম। এর চারদিকে আছে অপরূপ সৌন্দর্যময় পানির ফোয়ারা। ফোয়ারা ছাড়লে নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা হয় এবং রাতের বেলায় রঙিন বাতির আলোয় এর রূপ যেন আরো মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। তবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাসের নির্মম অধ্যায় তুলে ধরার এ ভাস্কর্যটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা অসম্পূর্ণ রয়েছে।

ভার্স্কর রাশা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পাঁচটি ভাগে প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম। তা হলো– একাত্তরের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, ঘাতক, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ এবং বিজয়। যার মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ভাস্কর্যে দুটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। ভাস্কর্যে এর দুটি তুলে ধরা হলেও বাকি আছে তিনটি অংশ। যা শেষ জীবনে ভাস্কর রাশা শেষ করে যেতে চান। এখনো বাকি তিনটি হলো- ঘাতক, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ এবং বিজয়।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্যটি আগামীতে আরো সম্প্রসারণ করা হবে। ক্যাম্পাসে জায়গার স্বল্পতা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে ভাস্কর্যটির জন্য যা যা প্রয়োজন তা করা হবে। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক, ঘাতকদের হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা সংবলিত প্লেট সংযোজন করা হবে।